Home » আফস্পা প্রত্যাহারের শাহি ঘোষণায় খুশির হাওয়া উত্তর-পূর্বাঞ্চলে

আফস্পা প্রত্যাহারের শাহি ঘোষণায় খুশির হাওয়া উত্তর-পূর্বাঞ্চলে

চুমকী সূত্রধর, সময় কলকাতা :আফস্পা বা সেনার বিশেষ আইন নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই ব্রিটিশের তৈরি এই আইন বলবৎ হয়েছিল উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলিতে। বছরের পর বছর এই আইনের অপপ্রয়োগের অভিযোগ তুলে আন্দোলন দেখেছে গোটা বিশ্ব। তবে, সেই আইনই প্রত্যাহারের আশ্বাস দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর মুখে।

বিশিষ্ট স্বতন্ত্রবাদী নেতা তথা লেখক মিনু মাসানি ষাটের দশকে জওহরলাল নেহেরুকে বলেছিলেন, ‘গেরিলা বাহিনী শুধুমাত্র অনুকূল রাজনৈতিক আবহাওয়ায় কাজ করতে পারে। যতক্ষণ গ্রামের লোকেরা খাদ্য সরবরাহ করে এবং গেরিলাদের আশ্রয় দেয়, ততক্ষণ তাদের সঙ্গে লড়াই করা অত্যন্ত কঠিন। ভিয়েত কং-এর সঙ্গে এমনই অভিজ্ঞতা হয়েছে, আজ দক্ষিণ ভিয়েতনামেও সেই অভিজ্ঞতা। তাই এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, গ্রামের সাধারণ মানুষ, যারা এদিক-ওদিক নয়, তাদের মন জয় করা। জোর করে জাতিসত্তা চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। আপনাকে তাদের হৃদয় ও মন জয় করতে হবে। সেই কথা এখনও প্রযোজ্য। রবিবারই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষের জন্য বার্তা দিয়েছেন, দ্রুত সেনার বিশেষ ক্ষমতা আইনের আফস্পা বা আর্ম ফোর্সেস স্পেশ্যাল পাওয়ার অ্যাক্ট প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে।

শাহি এই ঘোষণায় স্বাভাবিকভাবেই খুশি উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষজন । খুশির কারণও রয়েছে। কারণ, এরকমটাই যদি ঘটে, তবে তা হবে দীর্ঘ প্রতিক্ষার ফল। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর বিজয়। কারণ, দীর্ঘদিন ধরেই এই আইনের বলেই সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচারের অভিযোগ ছিল। কিন্তু, এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, কি এই আফস্পা ? উল্লেখ্য, উপদ্রুত এলাকায় শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে, ভারতের উত্তর-পূর্বের ৭ রাজ্য—অরুণাচল, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, মণিপুর, মেঘালয়, অসম ও ত্রিপুরার বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন দমন করতে, নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা তুলে দেওয়ার জন্য এই আইন বলবৎ হয় ১৯৫৮ সালে। তবে, প্রথম এই আইন প্রয়োগ করা হয় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে, মণিপুর ও অসমে। পরে খলিস্তান আন্দোলন তুঙ্গে ওঠার পরে পঞ্জাবে ’৮০-র দশক থেকে আফস্পা প্রয়োগ করা হয়। জম্মু-কাশ্মীরেও ’৯০ সাল থেকে রয়েছে আফস্পা। কি কি নিয়মাবলী রয়েছে এই আইনে ? এই আইন অনুযায়ী, সেনাবাহিনী যে কোন সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গুলি করতে পারবে। বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেফতার করতে পারবে। বিনা ওয়ারেন্টে যে কোন জায়গায়, যে কারও বাড়িতে তল্লাশি চালাতে পারবে। কোথাও জঙ্গিদের ঘাঁটি রয়েছে বলে সন্দেহ হলে, তা নির্দ্বিধায় উড়িয়ে দিতে পারবে। রাস্তায় কোনও যানবাহনের সন্দেহজনক গতিবিধি লক্ষ করলে, তা থামিয়ে তৎক্ষণাৎ তল্লাশি চালানো যাবে। সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এবিষয়ে সেনা আধিকারিকদের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না। সব থেকে তাত্পর্যপূর্ণ বিষয় হল, আফস্পা প্রয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের রাজ্যপালের সুপারিশ বা কেন্দ্রের সুপারিশই গ্রহণযোগ্য হয়। রাজ্য সরকারের বড় একটা ভূমিকা থাকে না। আফস্পার সুফল যেমন রয়েছে, তেমনই কিন্তু, বহু বিতর্কিত ঘটনা দেশবাসীকে স্তম্ভিত করে। ২০০০ সালে এই আইনের অপপ্রয়োগ ঘটিয়ে মণিপুরে ১০০ জন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করেছিল অসম রাইফেলসের সেনাবাহিনী। প্রতিবাদে মণিপুরের বিখ্যাত সমাজসেবী ইরম শর্মিলা চানু দীর্ঘ ১৬ বছর অনশন চালিয়ে গিয়েছিলেন। ২০০৪-এর ১৫ জুলাই মণিপুরে, কাংলা দুর্গের সামনে সম্পূর্ণ নগ্ন বেশকয়েকজন মহিলা অসম রাইফেলসের জওয়ানদের হাতে থাংজাম মনোরমার ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। কার্যত গোটা বিশ্বে আলোড়ন পড়েছিল সেই দৃশ্যে। অসম রাইফেলসের তৎকালীন সদর দফতরের সামনে ফেস্টুন তুলে সেই মহিলারা চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘ভারতীয় সেনা, এসো, আমাদের ধর্ষণ কর’। গত বছর নাগাল্যান্ডের মন জেলায় আসাম রাইফেলসের গুলিতে খনি শ্রমিকদের নিহত হওয়ার ঘটনার পর আফস্পা নিয়ে ফের উত্তপ্ত হয়ে ওঠে উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলি। বলতেই হয় গণহত্যা। সেই হত্যায় রাষ্ট্রের সম্মতি বলা চলে কি? কারণ রাষ্ট্র এই সেনাবাহিনীকে সুরক্ষাকবচ দেয়। এটা কি একচ্ছত্র কায়েম করার অনুমোদন নয় ? আসল সমস্যাটা কোথায় ? সমস্যা কি সেনার ভূমিকা নিয়ে রাষ্ট্রের ভাবনায় ? নাকি অন্য কোথাও ? নাগরিক আন্দোলনের ধীরে ধীরে আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে কতটা ধার কমেছে, তা নিয়ে বহু প্রশ্নই রয়েছে। কিন্তু, এই মুহূর্তে, অসমের ৬০ শতাংশ এলাকাতেই আফস্পা লাগু নেই। মণিপুরের রাজধানী ইম্ফল বাদে রাজ্যের মোট পনেরোটি থানা এলাকায় মাত্র এই আইন লাগু রয়েছে। অরুণাচল ও নাগাল্যান্ডের একাংশও এই আইনের আওতায় আছে। ত্রিপুরা বহু আগে থেকেই আফস্পা মুক্ত। এবার গোটা উত্তর পূর্ব থেকে এই আইন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।


আচমকা সিদ্ধান্তের কারণ কি? রাজনৈতিক মহলের মতে, ২০২৩ এর শুরুতেই ত্রিপুরা, মেঘালয় এবং নাগাল্যান্ডে বিধানসভা ভোট রয়েছে। চব্বিশের লোকসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির এটা প্রেস্টিজ ফাইট হতে চলেছে। ত্রিপুরায় আগে থেকে ক্ষমতায় থাকলেও সে রাজ্য যে গোষ্ঠীদন্দ্বে জর্জরিত, তা বলাই বাহুল্য। সামনে রয়েছে মেঘালয়। এককভাবে মেঘালয়ের সরকার গড়ার লক্ষ্যে এগোচ্ছে পদ্মশিবির। নাগাল্যান্ডের ক্ষেত্রেও একই সমীকরণ। রবিবার মেঘালয়ে দাঁড়িয়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে উন্নয়নের নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একের পর বক্তব্য বিজেপিকে সুযোগ করে দেওয়ারই ইঙ্গিত দিয়েছে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও বিশ্লেষকদের মতে,বিচ্ছিন্নতাবাদীদের রুখতে আইন লাগু সদর্থক ভূমিকা। তবে, সাধারণ নাগরিকদের অভিযোগ ছিল, আইনের অপপ্রয়োগ করা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই  স্বস্তির সুবাতাস উত্তর পূর্বাঞ্চলে।।

About Post Author