সময় কলকাতা ডেস্ক:- কাশ্মীর নিয়ে ভারত পাকিস্তান সংঘাত চলছে প্রায় ৬০ বছর ধরে। ১৯৪৭, ১৯৬৫, ১৯৭১ সালে তিনটি যুদ্ধের পর ১৯৯৯ সালে কারগিল যুদ্ধে পরাজয়ের পরেও, পাকিস্তান কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে মেঘের আড়াল থেকে কলকাঠি নাড়িয়ে চলেছে। আন্তর্জাতিক মহলে ক্রমশ পিছিয়ে পড়লেও পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদকে প্রশ্রয় ও মদত থেকে পিছিয়ে আসেনি। সুতরাং, মঙ্গলবার কাশ্মীরের পাহালগামে জঙ্গি হানায় ২৭ জনের প্রাণ যাওয়ার পর কি হতে পারে? এ প্রশ্ন শুধু ভারত নয়, এ প্রশ্ন উঠছে আন্তর্জাতিক মহলেও।
প্রসঙ্গত, ৩৭০ ধারা বিলোপের পর কিছুটা হলেও শান্ত হয়েছিল কাশ্মীর। ঠিক যেমনটা ২০০৮ সালে ২৬-২৮ শে নভেম্বর মুম্বাই হামলার পর ভারত আর পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা বেড়ে গেলেও সাময়িকভাবে কাশ্মীরে পাকিস্তানী ইসলামপন্থী জঙ্গিদের প্রভাব কিছুটা কমেছিল। ৩৭০ ধারা বিলোপের পর পাকিস্তান সমর্থিত ইসলাম পন্থী জঙ্গি সংগঠনগুলোর প্রভাব অনেকটাই কমেছে মনে করা হয়েছিল। তাহলে আচমকাই কেন এই এত বড় নাশকতামূলক কার্য ঘটালো জঙ্গিরা। এর পিছনে রয়েছে বহু কারণ।
তার আগে একটু নজর দেওয়া যাক অতীতের পরিস্থিতির দিকে। ১৯৯০ সালে যখন ভারত কাশ্মীরে সরকারি শাসন চালু করে, তার আগে থেকেই পাকিস্তানি মদত পুষ্ট জঙ্গি সংগঠনগুলি সক্রিয় হয়ে উঠেছিল কাশ্মীরের বুকে। ১৯৮৯ সালে প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী থাকাকালীন ১৪ সেপ্টেম্বর ও ৪ নভেম্বর এ্যান্টি পন্ডিত মিলিটারি গ্রুপ দুইবার হামলা চালিয়েছিল, যে হামলায় মারা গিয়েছিলেন এক বিজেপি নেতা এবং একজন অবসরপ্রাপ্ত জর্জ । তারপরে প্রধানমন্ত্রী ভিপি সিং এর জামানা। তখন, ১৯৯০ সালে চারটি বড় আক্রমণ শানিয়ে ছিল হিজবুল মুজাহিদ্দিন এবং জম্বু-কাশ্মীর লিবারেশন ফোর্স।
১৯৯০-৯১ সালে চন্দ্রশেখর এবং নরশিমা রাও-এর সময়ে জঙ্গি আক্রমণ হয়েছিল। ১৯৯৪ এবং ১৯৯৫ এ নরশিমা রাও প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন ২০ জুলাই এবং ২৬ জানুয়ারি ২ টি নাশকতার ঘটনা ঘটে। যে ঘটনায় প্রাণ যায় প্রায় ২৪ জনের। ১৯৯৬ সাল প্রধানমন্ত্রী ইন্দ্র কুমার গুজরাল, ২৬ জানুয়ারি, ১৭ এপ্রিল, ২১ এপ্রিল, ১৯ জুন, ৩ আগস্ট, ৭ সেপ্টেম্বর, ৩ নভেম্বর, 24 ডিসেম্বর লাগাতার জঙ্গি আক্রমণ ঘটেছে কাশ্মীরের বুক জুড়ে। লস্কর-ই-তৈবার নেতৃত্বে ইসলামপন্থী জিহাদী জঙ্গিরা রক্তাক্ত করে তুলেছিল ভূস্বর্গ কাশ্মীরকে।
২০০০ সালে প্রায় ১২ টি জঙ্গি আক্রমণ ঘটেছে কাশ্মীরে, যার দায়ভার স্বীকার করেছিল আল উমার মুজাহিদ্দিন লস্কর-ই-তৈবা। অটল বিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বে তখন চলছে সরকার, সেই সরকারের আমলে অর্থাৎ ১৯৯৮ সালের শেষ থেকে শুরু করে প্রায় ২০০৫ সাল পর্যন্ত প্রায় সাতটি জঙ্গি আক্রমণ সংগঠিত হয়েছে কাশ্মীরের বুক জুড়ে।
মনমোহন সিংয়ের জামানাতেও একাধিক জঙ্গি আক্রমণ সংঘটিত হয়েছে। কাশ্মীরের বুক জুড়ে তখন একাধিক জঙ্গি সংগঠন সক্রিয় যার মধ্যে অন্যতম লস্কর-ই-তৈবা, জৈস-ই-মোহাম্মদ, হিজবুল মুজাহিদ্দিন, ইসলামিক ফ্রন্ট, আল-ওমার মুজাহিদ্দিন, দ্য-রেজ়িস্ট্যান্স-ফ্রন্ট, পিপলস-অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট-ফ্রন্ট সহ বহু ছোটখাটো সংগঠন।
নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর একাধিক নাশকতামূলক জঙ্গি আক্রমণ ঘটেছে কাশ্মীরজুড়ে কিন্তু ২০১৯ এর ১৪ই ফেব্রুয়ারি পুলওমার ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছিল ভারতবর্ষ। ৪১ জন জওয়ানের প্রাণ কার্যত ভারতকে এক সুরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে বাধ্য করেছিল। একদা যারা পাকিস্তানের পতাকা নিয়ে ভারতের বুকে জিহাদের স্বপ্ন দেখতো তারা পর্যন্ত বলতে বাধ্য হয়েছিল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। ভারত সরকারের তথ্য অনুযায়ী এখনও পর্যন্ত ৪৪৭২৯ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে এই কাশ্মীরের বুকে, যার মধ্যে সাধারণ নাগরিক ১৪৯৩০ জন এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ৬৪১৩ জন, আর জঙ্গি সংগঠনগুলির প্রায় ২৩৩৮৬ জন প্রাণ হারিয়েছে একাধিক সংঘাতে।
এখানে প্রশ্ন উঠতেই পারে এত মানুষের প্রাণহানি তারপরেও কেন শান্ত হচ্ছে না কাশ্মীর? কাশ্মীরের দুটি অংশ পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে আর তিনটি অংশ বরাবরই ভারতের নিয়ন্ত্রণে। পাকিস্তান ভারতীয় কাশ্মীরকেও চায় নিজেদের দখলে নিতে। ফলত হিংসা। হিসাব করে দেখা গেলে কাশ্মীর মুসলিম অধ্যুষিত, অন্যদিকে লাদাখ এবং জম্মুতে মুসলিম সংখ্যালঘু। উপনিবেশিক কারণ এবং দীর্ঘ ৬০ বছর ধরে একাধিক কার্যকরণ সম্পর্কের কারণেই কাশ্মীরের কিছু মানুষ ছিল ভারত বিরোধী। আর সেই ভারত বিরোধিতাকেই বরাবরই কাজে লাগিয়ে এসেছে পাকিস্তান।
পাকিস্তানে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক তারা প্রথমেই চায় কাশ্মীর ইস্যুকে সামনে রেখে সরকারের ভীত শক্ত করতে। আর এই সুযোগটাকে কাজে লাগায় জঙ্গি সংগঠনগুলি। আদতে জিহাদের নামে জঙ্গি সংগঠনগুলি তাঁদের ব্যবসা-বাণিজ্য তাঁদের প্রতিপত্তি বাড়ানোর চেষ্টা করে। কাশ্মীর ইস্যু যদি না থাকে সেক্ষেত্রে জঙ্গিদের এই জিহাদের দোকান বন্ধ হয়ে যাবে। পাকিস্তানের সরকারের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি। আর সেই দুর্নীতির থেকে নজর ঘোরানোর জন্যই কাশ্মীর ইস্যু পাকিস্তান সরকারের এবং আধিকারিকদের অন্যতম হাতিয়ার।
বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর সন্ত্রাসবাদি গোষ্ঠীগুলির জন্মই পাকিস্তানে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বের প্রায় ২০০ টি জঙ্গি সংগঠনের অধিকাংশেরই জন্ম পাকিস্তানে। বিশ্বের অন্যতম জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদার জন্ম পাকিস্তানেই। পাশাপাশি জইশ-ই-মহম্মদ, লস্কর-ই-তৈবা, ইসলামিক-স্টেট-ইন-হিন্দ-প্রভিন্স, গাজওয়াতুল-হিন্দ, হিজবুল মুজাহিদ্দিন, তেহরিক-ই-তালিবান-পাকিস্তান, সিপাহ-এ-সাহাবা-পাকিস্তান, হাক্কানী নেটওয়ার্ক সহ একাধিক জঙ্গিগোষ্ঠী দীর্ঘ যুগ ধরেই লালিত পালিত হচ্ছে পাকিস্তানের মাটিতে। ভারতবর্ষে অধিকাংশ সন্ত্রাসবাদী হামলার নেতৃত্ব দিয়েছে সৈয়দ সালাউদ্দিন ও আজাহার মাসুদ। একসময় ওসামা বিন লাদেনকেও আশ্রয় দিয়েছিল এই সন্ত্রাসবাদীদের আঁতুড় ঘর পাকিস্তান। ফলে একথা বলাই যায় জঙ্গিদের দেশ পাকিস্তান।
মঙ্গলবার কাশ্মীরের পাহালগামের ঘটনার পর সারা ভারত জুড়ে সামাজিক প্রচার মাধ্যমে আওয়াজ উঠেছে আবার একটা সার্জিক্যাল স্ট্রাইক চাই, এই জঙ্গি হামলার বদলা নিতে। ২০২২ সালে পাকিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় চরম অর্থনৈতিক সংকটের সম্মুখীন হয়েছিল পাকিস্তান। নিম্ন থেকে মধ্য আয়ের তথা উন্নতশীল দেশে দুর্বল শাসনব্যবস্থা এবং মাথাপিছু কম উৎপাদনশীলতা, অর্থ প্রদানে ভারসাম্য সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ফলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে অক্ষম হয়েছিল পাকিস্তান। কিন্তু ২০২৫ সাল নাগাদ কিছুটা হলেও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখা দিয়েছিল পাকিস্তানে। কিন্তু কাশ্মীরের এই জঙ্গি হানা আবার কিছুটা হলেও ব্যাকফুটে নিয়ে যাবে পাকিস্তানকে। এই হামলার পরে পাকিস্তানের অর্থনীতি অনেকটাই বিপদজনক পরিস্থিতিতে চলে যেতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের মত।
ইতিমধ্যেই, ফিনান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্সের ধূসর তালিকায় নাম রয়েছে পাকিস্তানের। এই হামলার পরে ইসরাইল এবং ইউরোপীয় দেশগুলো আরো চাপ সৃষ্টি করবে পাকিস্তানের উপর। সংযুক্ত আরব আমিরাত, নেপাল এবং তিনটি দেশের পর্যটকদের মৃত্যুর ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে পাকিস্তানকে আরও কোণঠাসা করে তুলবে। এর ফলে ফিনান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্সের কালো তালিকায় নাম চলে যেতে পারে পাকিস্তানের। সেক্ষেত্রে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তর থেকে ঋণ নিতে সমস্যা হবে পাকিস্তানের।
দ্য রেজ়িস্ট্যান্স ফ্রন্ট জঙ্গি সংগঠনটি পাহালগাম হামলার দায় স্বীকার করেছে। এর সঙ্গে পাকিস্তানের যোগাযোগ অতীতেও প্রমাণিত। শেখ সাজ্জাদ গুল এই সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, আর এই সংগঠনে বর্তমানে কোনও মাথা নেই, পাকিস্তান থেকেই এই সংগঠনটি পরিচালিত হয়। অনেকের মতে এই টি-আর-এ আসলে লস্কর-ই-তৈবার-এর একটি শাখা সংগঠন। ফলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে টি-আর-এফ-এর সঙ্গে পাকিস্তানের যোগ প্রমাণ করা খুব একটা কষ্টসাধ্য বিষয় হবে না। ইতিমধ্যেই এই জঙ্গি সংগঠনের ৩ জঙ্গির নাম এবং স্কেচ ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে কাশ্মীরের বিভিন্ন অঞ্চলে। আসিফ ফৌজি, সুলেমান শাহ, আবু তালহা নামের এই তিন জঙ্গির খোঁজে শুরু হয়েছে চিরুনি তল্লাশি।
এই হামলার দায় থেকে হাত ধুয়ে ফেলতে চাইছে পাকিস্তান। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী খোয়াজা আসিফ এই ঘটনাকে বৃহত্তর বিদ্রোহের অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে, এটি পাকিস্তানের একটা নিরলস প্রচেষ্টা, পাকিস্তান যতই হাত ধুয়ে ফেলার চেষ্টা করুক সমগ্র ভারতবাসী কিন্তু এই ঘটনার পরে চাইছে আবার একটা সার্জিক্যাল স্ট্রাইক। এখন দেখা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা অজিত দোভাল, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কি পদক্ষেপ নেন?


More Stories
বিক্ষোভ দেখাতে গিয়ে গ্রেফতার অসিত মজুমদার
সোনারপুরে অভিষেককে মারধর, মেরে জামা ছিঁড়ে দেওয়া হল অভিষেকের
সই বিতর্কে বিজেপিকে তোপ চন্দ্রনাথের