পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা : প্রেতলোক ও ভূত কি আছে – প্রশ্ন চিরকাল ছিল ও আছে। কেউ মানেন, কেউ মানেন না।উল্লেখযোগ্যভাবে,বহু বিখ্যাত মানুষ প্রেতচর্চায় আগ্রহী ও ভৌতিক এবং অলৌকিকে বিশ্বাস করতেন, বিশ্বাস করতেন মানুষের ও আত্মার মৃত্যু পরবর্তী অস্তিত্বকে। এই মহামানবদের অন্যতম ছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরলোকের প্রতি আস্থা ও পরলোক চর্চার কাহিনী নিয়ে আলোচনা হয়েছে একাধিক গ্রন্থে। এরমধ্যে অমিতাভ চৌধুরীর ‘রবীন্দ্রনাথের পরলোকচৰ্চা’ গ্রন্থ স্মরণীয়। জানা যায়, কবিবন্ধু মোহিতচন্দ্র সেনের কন্যা উমা একসময়ে ছিলেন রবীন্দ্রনাথের প্ল্যানচেটের মিডিয়াম।উল্লেখ্য,মিডিয়ামের মাধ্যমেই আত্মাকে ডেকে আনা হত। উমাকে বুলা নামে ডাকতেন কবিগুরু।১৯২৯ সালে রানী মহালনবীশকে গুরুদেব জানান, বুলা তাঁকে জানিয়েছে তার ওপরে প্রেতাত্মা ভর করে। সে বছর শান্তিনিকেতনের উদয়ন আর জোড়াসাঁকোয় টানা দুমাস রবিঠাকুর বন্ধু ও আত্মীয় পরিজনকে ডেকে আনেন বলে কথিত। এসময় তাঁর সাথে অবন ঠাকুর, প্রশান্ত মহালনবীশ বা অজিত কুমার চক্রবর্তী থাকতেন। অজিত কুমার চক্রবর্তীর কথা বিশেষ উল্লেখযোগ্য এজন্যই যে মৃত্যুর পূর্বে আত্মা তাঁর আগাম মৃত্যুর কথা ঘোষণা করেছিল অবন ঠাকুরের জামাই মনিলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের আসরে।প্রমথনাথ বিশীকে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, প্রেতচক্রের আসরে তাঁর সাথে মাইকেল মধুসূদনের আলাপ হয়েছিল।প্রেতচক্রের আসরে নতুন বৌঠান কাদম্বরী দেবীর ছাড়াও এসেছিলেন সুকুমার রায়। সুকুমার রায়ের প্রেআত্মার অনুরোধে রবীন্দ্রনাথ ‘তরী আমার হঠাৎ ডুবে যায় ‘ গান গেয়েছিলেন বলে জানা যায়।
বলাবাহুল্য,একাধিকবার প্রেতচক্রের বা প্ল্যানচেটে আয়োজন করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সেই প্ল্যানচেটে নিকটবর্তী অনেক মৃত আত্মীয় নাকি সাড়া দিয়েছিল। আত্মাদের সঙ্গে কবির কথোপকথনকেও কাগজ বন্দী করেছিলেন রবীন্দ্রনাথের সচিব কবি অমিয় চক্রবর্তী এবং অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৌহিত্র মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায়। শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্র সদনে এখনো পর্যন্ত আটটি খাতা সংরক্ষণ করে রাখা আছে। যেখানে সেই মৃত মানুষদের আলাপ সংরক্ষিত আছে।ওই সংরক্ষণ গুলিতে দাবি করা হয়েছে, সেই প্রেতচক্রে সাড়া দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের প্রিয়জনেরা, স্ত্রী মৃণালিনী দেবী, নতুন বৌঠান কাদম্বরী দেবী, বড় মেয়ে মাধুরীলতা, দুই দাদা সত্যেন্দ্রনাথ ও জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, প্রিয় ভ্রাতুষ্পুত্র বলেন্দ্রনাথ ও তাঁর স্ত্রী সাহানা প্রমুখ, সেই সময়ে যাঁরা সকলেই মৃত ছিলেন, যা শুনলে শিহরণ জাগে বৈকি!
১৮৪১ সালে জন্মেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। যখন রাজ্য ও দেশে তাঁর ১৬৬তম জন্মদিন পালিত হচ্ছে অর্থাৎ জন্মের ১৬৫ বছর পরেও যিনি আমাদের মননে মহাপুরুষ, তাঁর পরলোকভাবনা আমাদেরও কি কোথাও ভাবায় না? কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের জীবনে একের পর এক নিকটজনের মৃত্যুই কি একমাত্র তাঁর পরলোক চর্চার মূল কথা? কবিগুরু নিজেই তো বলেছেন, ” বিপদে মোরে রক্ষা করো, এ নহে মোর প্রার্থনা “।কবিতার মধ্যে দিয়ে জীবনের বিভিন্ন আঙ্গিক -কে ফুটিয়ে তোলা রবীন্দ্রনাথ মরণের পরপারে কী আছে তাও কি প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধি করেছিলেন? তাঁর পরলোকচর্চা ও প্রেতচর্চার নেপথ্যে কি রয়েছে এরকমই এক আশ্চর্য অলৌকিক উপলব্ধি? আজও রবীন্দ্রনাথের পরলোক চেতনা এক আশ্চর্য অনুভব।।


More Stories
রবীন্দ্র জন্মদিন : মোদি ও মমতার কবিগুরু স্মরণ
ভিনগ্রহী তত্ত্ব প্রমাণে ১৬২টি নতুন ফাইল প্রকাশিত
অভিনেতাদের কাছে সেরা-টুকু নেওয়ার মাস্টার আর্ট ছিল সত্যজিৎ রায়ের জানা