Home » বিধানসভা নির্বাচন : বারাসাতে জিতবে কে?

বিধানসভা নির্বাচন : বারাসাতে জিতবে কে?

পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা : বারাসাত বিধানসভা কেন্দ্রটি ২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটে সারা বঙ্গের অন্যতম নজর কাড়া আসন। এখানে চতুর্মুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলেও সম্মুখ সমরে রয়েছেন তৃণমূলের সব্যসাচী দত্ত ও বিজেপির শঙ্কর চ্যাটার্জী। এখানে লড়াই হাড্ডাহাড্ডি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সম্পূর্ণ নিশ্চিত নন এখানে কে জিতবেন, কোন দল জয়ী হবে? এই কেন্দ্রে কে জয়ী হতে পারেন  তার একটি তুল্যমূল্য আলোচনা সহ প্রতিবেদন।

উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার সদর শহর বারাসাত। বারাসাতের এবারের বিধানসভার ভোট অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং টানটান অবস্থায় রয়েছে। বারাসাত শহরের পুরসভা অঞ্চল এবং ছোট জাগুলিয়া-বামনগাছি গ্রামীণ এলাকা জুড়ে বারাসাত বিধানসভা ক্ষেত্র। এই বিধানসভা দীর্ঘদিন ধরেই ফরওয়ার্ড ব্লকের গড় হিসেবে পরিচিত ছিল। সাংসদ হিসেবে পরিচিত চিত্ত বসু বারাসাত থেকে একবার বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছিলেন। রাজ্যে বাম জমানা শুরু হওয়ার কিছু আগেই চিত্ত বসুর পরবর্তী সময়ে ফরওয়ার্ড ব্লকের অন্যতম নেতা হিসেবে আবির্ভাব ঘটে সরল দেবের। তিনি ১৯৬৯ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত ৬ বার বিধায়ক থেকেছেন। ১৯৯৬ সাল থেকে পট পরিবর্তন হতে শুরু করে। ১৯৯৬ সালে কংগ্রেসের হয়ে এবং ২০০১ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে জয়ী হন বারাসাত বিধানসভা কেন্দ্রে জয়ী হন অশোক মুখার্জি, যিনি বারাসাতের মানুষের কাছে গোপাল মুখার্জি নামেই পরিচিত। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত গোপাল মুখার্জির অবসান হতেই ফরওয়ার্ড ব্লক ২০০৬ সালে আবার আসনটি পুনরুদ্ধার করে। বিথীকা মণ্ডল বিধায়ক নির্বাচিত হন। ২০০৯ সাল থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন এলাকার মতোই বারাসাতে প্রবল ভাবে উত্থান ঘটে তৃণমূল কংগ্রেসের। বামেরা অস্তাচলে যায়। বারাসাত শহরে দু-একটি ওয়ার্ড ছাড়া ফরওয়ার্ড ব্লক বা সিপিএমের অস্তিত্ব সংকট দেখা দেয়। ২০১১ সালে বারাসাত বিধানসভা কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের তারকা প্রার্থী চিরঞ্জিত চক্রবর্তী ৫৮ শতাংশ ভোট পেয়ে বাম প্রার্থী ফরওয়ার্ড ব্লকের সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়কে ৪০ হাজারের বেশি ভোটে হারিয়ে বিধায়ক নির্বাচিত হন। ২০১৬ সাল থেকে এখানে ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে শুরু করে বিজেপি। প্রাক্তন বাম এমএলএ বীথিকা মন্ডল বিজেপিতে যোগদান করেন এবং বিজেপির হয়ে ২০১৬ সালের নির্বাচনে বারাসাত থেকে লড়ে ১১ শতাংশ ভোট টানেন। তবে আবার জয়ী হন চিরঞ্জিত। ২০১১ ও ২০১৬ সালে বামেদের ভোট ছিল ৩৫ ও ৩৬ শতাংশ। তবে ২০২১ সালে তা রাতারাতি কমে যায়। ২০২১ সালে সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় ১৬ শতাংশের কম ভোট পেয়ে তৃতীয় স্থানে চলে যান। বিজেপি প্রবল ভাবে বারাসাত বিধানসভা কেন্দ্রের নিজেদের শক্তি বৃদ্ধির প্রমান দেয়। বিজেপির শংকর চ্যাটার্জী প্রায় ৩৬ শতাংশ ভোট পান এই কেন্দ্র থেকে। চিরঞ্জিত চক্রবর্তীর ভোটের ব্যবধান কমে আসে। এবারও বিজেপির প্রার্থী শংকর চ্যাটার্জী এবং বিজেপির শক্তি ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের তুলনায় বারাসাত বিধানসভা অঞ্চলে কোনো অংশে কম নয়, বরং বেশি। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে মাত্র ১০ শতাংশ বেশি ভোট পেয়ে ২৩ হাজার ভোটে নিজের আসনটি ধরে রাখেন চিরঞ্জিত চক্রবর্তী। সৎ তকমা থাকলেও চিরঞ্জিত চক্রবর্তী এলাকায় কম আসেন, রাজনীতির মানুষ নন – এই ক্ষোভ তার বিরুদ্ধে ছিল। উন্নয়নের কাজে অধিকাংশ প্রকল্পের আর্থিক বিষয়ের দিকে তিনি নজর রাখতেন না এবং বারাসাতের দাপটে তৃণমূল নেতা অশনি মুখার্জী বকলমে বারাসাত বিধানসভা কেন্দ্রের কাজ চালাতেন বলে শোনা যায়। দীর্ঘদিন ধরেই চিরঞ্জিত চক্রবর্তীর রাজনৈতিক সন্ন্যাস নেওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করছিলেন। ২০২৬ সালে তৃণমূলের সব্যসাচী দত্তকে বারাসাত কেন্দ্রের প্রার্থী নির্বাচিত করে তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব। আপাতমস্তক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত সব্যসাচী দত্ত বারাসাত বিধানসভা কেন্দ্রের প্রার্থী হওয়ার আগে গুঞ্জন শোনা গিয়েছিল, সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারের পুত্র বৈদ্যনাথ ঘোষ দস্তিদার এই কেন্দ্রে প্রার্থী হতে পারেন। বারাসাতের ভূমিপুত্র হিসেবে পরিচিত বারাসাত পুরসভার সঙ্গে যুক্ত একাধিক নেতা বিধায়ক হতে ইচ্ছুক, এরকম কথাও ভাসতে থাকে। তথাপি, বারাসাত সংসদীয় ক্ষেত্রের দায়িত্বভার পাওয়ার মধ্যে দিয়ে সব্যসাচী দত্তের ক্ষমতায়নের ইঙ্গিত বারাসাতে শীর্ষ নেতৃত্ব অনেক দিন আগেই দিয়েছিল। সে কথা দেরিতে বোঝা তৃণমূলের নেতাদের একাংশ সব্যসাচী দত্তের প্রচারে যথেষ্ট মাত্রায় গা লাগাননি এরকম একটা ন্যারেটিভ বারাসাত বিধানসভা কেন্দ্রে চালু হয়ে যায়। বারাসাতের বেশ কিছু কাউন্সিলর ক্ষুব্ধ – একথাও শোনা যায়। অথচ বাস্তব হচ্ছে, ২০২৪ সালেই বিজেপি বারাসাত পুরসভা অঞ্চলে নিজেদের কর্তৃত্বের ইঙ্গিত রেখেছিল লোকসভা ভোটে। ২৮ টি ওয়ার্ডে লিড নিয়ে নেয় বিজেপি। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকা ছাড়া কেবলমাত্র দু-একটি ওয়ার্ডে কাকলি ঘোষ দস্তিদার এগিয়েছিলেন। সেবারও কিন্তু অন্তর্ঘাতের আশঙ্কা দেখেছিলেন স্বয়ং সাংসদ। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে বিজেপির স্বপন মজুমদারের চেয়ে ১ লক্ষ ১৪ হাজার বেশি ভোটে নির্বাচিত হওয়া কাকলি ঘোষ দস্তিদার বারাসাত বিধানসভা কেন্দ্রে মাত্র ৩১০০-র সামান্য বেশি ভোটে এগিয়ে ছিলেন। অথচ রাজনৈতিক দিক থেকে ধারে বা ভারে কাকলি ঘোষ দস্তিদারের ধারে কাছে স্বপন মজুমদারকে বিবেচনা করেনি রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। আজও করে না। তবুও স্বপন মজুমদার বারাসাত গ্রামীণ ভোটের জোরে বারাসাত বিধানসভা কেন্দ্রে কাকলি ঘোষ স্বস্তিদারকে প্রায় স্পর্শ করেছিলেন। আরও সুস্পষ্টভাবে বলা যাক, বারাসাতের ২৯৮ টি বুথের মধ্যে গ্রামীণ অঞ্চলের ৩৯ টি বুথ কাকলি ঘোষ দস্তিদারের সম্মান রক্ষা করে বারাসাত বিধানসভা অঞ্চল। এই ৩৯ টি বুথের মধ্যে ১৯ টি বুথ সংখ্যালঘু অধ্যুষিত। এই অঞ্চলে তৃণমূল মৌরসি পাট্টা কায়েম করে রেখেছে দীর্ঘদিন ধরে। এবারের ভোটেও সব্যসাচী দত্তের প্রধান শক্তির উৎস এই ১৯ টি বুথ। মাথায় রাখা দরকার, বারাসাতের শহরাঞ্চলে সংখ্যালঘু ভোটার ১১ থেকে ১২% হলেও গ্রামীণ অঞ্চলে এই ভোটার প্রায় ৪২%।

তৃণমূলের পক্ষে আরো আশার কথা যে অন্তত ১২ হাজার ভোটারের নাম বারাসাত বিধানসভা কেন্দ্রে বাদ পড়লেও বিজেপি বুক বাজিয়ে বলতে পারছে না এসআইআর এর পরে ধর্মভিত্তিক জনবিন্যাসের পরিবর্তন হয়েছে, যা বিজেপির কাছে লাভের কারণ হতে পারত। বরং বলা হয়, ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মতো সংখ্যালঘু এলাকায় প্রায় ১৪০০ ভোটারের নাম বাদ পড়ে গেলেও তার একটা বড় অংশ হিন্দু ভোটার। বিজেপির পক্ষে অভিযোগ, তৃণমূলের শহরের একাধিক নেতা সুকৌশলে এসআইআর-এর কাজে দক্ষ হাতে তৃণমূলের ভোট ব্যাঙ্ক অক্ষত রাখার চেষ্টা করে গিয়েছেন এবং অনেকাংশেই সফল। তবে তৃণমূলের বারাসাতের অনেক নেতার সঙ্গেই সব্যসাচী দত্তের যোগাযোগ কম এবং সব্যসাচী দত্ত অনেক নেতাকেই প্রচারে চাইছেন না বলেই সূত্রের খবর। ২০২৪ সালের মার্কশিট দেখে তিনি অনেক কাউন্সিলরকে নিজের নিজের ওয়ার্ডে সীমাবদ্ধ থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রাক্তন বিধায়ক এবং রাজনৈতিক জীবনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্বে থাকা সব্যসাচী দত্তের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার বর্ণময় হলেও বারাসাতে তার জন্য গোলাপ ফুল বিছিয়ে রাখা কার্পেট নেই। বিধাননগর থেকে বারাসাতে এসে প্রার্থী হওয়ার পরে তাঁর বিরুদ্ধে তিনটি প্রধান অভিযোগ রয়েছে যার কয়েকটিকে সুচারুভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে প্রধান প্রতিপক্ষ বিজেপি। প্রথমত, কাউন্সিলররা সঠিকভাবে সব্যসাচী দত্তের হয়ে কাজ করছেন না। এর ফলে নাকি বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়তে পারে। তথাপি এই ধরনের অভিযোগের সারবত্তা পাওয়া যায় না। তৃণমূলের অধিকাংশ কাউন্সিলরের জনসংযোগ যথেষ্ট কম বা তাদের জনপ্রিয়তার গ্রাফ নিম্নগামী। হাতেগোনা কাউন্সিলর ছাড়া তৃণমূলের অধিকাংশ কাউন্সিলর রাজনৈতিক প্রভাব ফেলার ক্ষমতা রাখেন না বলেই রাজনৈতিক মহলের ধারণা। স্বাভাবিকভাবেই দীর্ঘদিনের পোড় খাওয়া রাজনৈতিক নেতা ও বারাসাতের প্রার্থী সব্যসাচী দত্ত এই প্রভাবহীন কাউন্সিলরদের চিহ্নিত করে ফেলেছেন। সুতরাং সব্যসাচীর দত্তের বিরুদ্ধে এই অভিযোগে তৃণমূলের কোনো ক্ষতি হবে বলে রাজনৈতিক মহল মনে করে না। তবে, পরবর্তী দুটি অভিযোগ সব্যসাচীর দত্তের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে। একটি অভিযোগ রয়েছে আশঙ্কার স্তরে। বিজেপি থেকে সুকৌশলে প্রচার করা হয়েছে যে সব্যসাচী দত্ত আগেও ছিলেন বিজেপিতে ভোটে জিতলে আবার যে বিজেপিতে ফিরে যাবেন না তার কোনও গ্যারান্টি নেই। শুধু তাই নয় সব্যসাচী দত্ত কার্যত বিরোধীদের হয়ে একাধিকবার স্থানীয় পুলিশ-প্রশাসনকে এবং স্থানীয় আইন ব্যবস্থায় ও খারাপ স্বাস্থ্যপরিসেবার উল্লেখ করে গাফিলতির অভিযোগ এনেছেন। বারাসাত বিধানসভা ক্ষেত্রের প্রধান তিনটি সমস্যার জায়গা যানজট, স্বাস্থ্য এবং ভ্যাট তথা আবর্জনা নিয়ন্ত্রণ – যা নিয়ে প্রতিটি নাগরিক ক্ষুব্ধ। বারাসাতের যানজট বা হাসপাতালের অব্যবস্থার কথা উল্লেখ করে তিনি সাধারণ মানুষের মন জয় করার চেষ্টা করছেন একথা মেনে নিলেও আশ্চর্যজনকভাবে তিনি এও বলছেন বিজেপির প্রার্থী শংকর চ্যাটার্জি তারই লোক। পাল্টা বিজেপি দাবি করছে এবং ভোট প্রচারের অস্ত্র হিসাবে বলছে, সব্যসাচী দত্ত নিজেই তলায় তলায় বিজেপির সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলছেন এবং তিনি আদতে বিজেপির লোক এবং ভোটে হেরে বিজেপিতেই ফিরে আসবেন। সব্যসাচী দত্তের বিরুদ্ধে তৃতীয় অভিযোগ যে বারাসাতে সিন্ডিকেট রাজের অবাধ প্রচলন ঘটাবেন। বিজেপির শঙ্কর চ্যাটার্জি বারংবার দাবি করছেন, তিনি ভূমিপুত্র এবং তাকে সবসময় কাছে পাওয়া যাবে। বারাসাতবাসীর তিনবারের বিধায়ক চিরঞ্জিত চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে প্রধান ক্ষোভ ছিল, বিধায়ককে এলাকায় পাওয়া যায় না। অথচ দল বারাসাতে যাকে প্রার্থীপদ দিয়েছে তিনিও কিন্তু বহিরাগত। আর এইরকম বহুবিধ অস্ত্রে শান দিয়ে প্রচারে গতি আনছেন শংকর চ্যাটার্জী।
বাইটঃ শঙ্কর চ্যাটার্জি, বিজেপি প্রার্থী, বারাসাত
ভিও — শঙ্কর চ্যাটার্জির একটি বাড়তি প্লাস পয়েন্ট, প্রাথমিকভাবে দলে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠা তাপস মিত্র শেষ পর্যন্ত বিজেপিতে ফিরে এসেছেন। বিজেপির অন্তর্দ্বন্দ্ব বাহ্যিকভাবে প্রকাশ পাচ্ছে না। শঙ্কর চ্যাটার্জির পাশাপাশি এই কেন্দ্রে ফরোয়ার্ড ব্লক প্রার্থী হেমন্ত দাস, যিনি আবার দাবি করেন, ২০১১ সালের পুরনো ভোট ব্যাংক ফিরে আসবে বামেদের দিকে। তিনি বামেদের পায়ের তলায় মাটি পুনরুদ্ধার করবেন। যদিও রাজনৈতিক মহল মনে করে, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের বিগত নির্বাচনে ৩৪ হাজার ভোট বাঁচানোটাই হেমন্ত দাসের কাছে চ্যালেঞ্জ। যদি বামেদের ভোট কমে, তা স্বাভাবিকভাবেই আকর্ষণের উৎস হয়ে উঠতে পারে বিজেপির কাছে। বামেদের শীর্ষ নেতৃত্ব বিজেপির বিরুদ্ধে যতই মরিয়া প্রচার করুন, বারাসাত বিধানসভা কেন্দ্রের বাম ভোটাররা কখনোই সব্যসাচী দত্তকে ভোট দিতে উৎসাহী হবেন না বলে মনে করে এই কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত থাকা রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। রইলেন বাকি কংগ্রেসের তারক মুখোপাধ্যায়। সুভদ্র ও রাজনৈতিক মানুষ হিসেবে পরিচিত হলেও বারাসাত বিধানসভা কেন্দ্রে কংগ্রেস এই মুহূর্তে বিলুপ্তপ্রায়। তারক মুখার্জিও তাতে কতটা অক্সিজেন জোগাতে পারবেন সন্দেহ রয়েছে। ফলে লড়াই সরাসরি দ্বিমুখী। বাংলাদেশ থেকে বিগত ১০ থেকে ২০ বছরে বহু মানুষ বারাসাতে এসে স্থায়ী হয়েছেন, রয়েছে প্রথম প্রজন্মের ভোটার। এদের একটা বিরাট অংশ প্রতিষ্ঠান বিরোধী বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। তাছাড়াও বারাসাত শহরের বুকে অন্য যে কোনও নির্বাচনের চেয়েও একটা চাপা রাজনৈতিক আবহ তৈরি হয়েছে, যা শাসকদলের কাছে শুভ ইঙ্গিত নাও হয়ে উঠতে পারে। এত সব কিছু কাটিয়ে সব্যসাচী দত্তের জয়ের একমাত্র লাইফ লাইন সংখ্যালঘু ভোট। তাকে বাঁচালে বাঁচাবে গ্রামীণ অঞ্চলের ভোট এবং শহরের সংখ্যালঘু ওয়ার্ড গুলির ভোট। নবপল্লী এলাকার ৩ নম্বর ওয়ার্ড, ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মতো একাধিক জায়গায় বিজেপি হাজারের বেশি ভোটের লিড আশা করছে। এখন পুরসভার ৩৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে ২৮ টি ওয়ার্ডে বিজেপি এগিয়ে ছিল। সেই ২৮ টি ওয়ার্ডের মধ্যে ২০ টি ওয়ার্ডে বিজেপি লিড নিতে পারলেই শহরকেন্দ্রিক ভোটে অন্ততপক্ষে ১০ হাজার ভোটের লিড নিয়ে নিতে পারবে বলে মনে করে বিজেপি। সেক্ষেত্রে গ্রামীণ ভোট অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠবে। গ্রামীণ ৩৯ টি বুথের সিংহভাগ তৃণমূল নিজেদের দখলে রাখবে, একথা বিজেপিও খুব ভালো করে জানে। সেক্ষেত্রে শহরে ১০ হাজার ভোটের লিড শংকর চ্যাটার্জির কাছে মোটেই স্বস্তির কারণ নয়। অন্যদিকে, বারাসাত বিধানসভার শহরাঞ্চলে প্রতিষ্ঠানবিরোধী যে হাওয়া বইছে বলে রাজনৈতিক মহল মনে করছে, তা যদি ভোটবাক্সে প্রতিফলিত হয়, তাহলে সব্যসাচী দত্তের সমূহ বিপদ। সেক্ষেত্রে শহরাঞ্চলে বিজেপির লিড বাড়তে পারে। তবে এ নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই বারাসাত পুরসভা অঞ্চলে বিজেপি নিজেদের প্রাধান্য যদি কায়েম না রাখতে পারে তাহলে মুশকিল। সব্যসাচী দত্ত একদা যতই বিজেপিতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল বিরোধী প্রচার করুন না কেন, একথা মাথায় রাখতেই হবে সব্যসাচী দত্তের নিজস্ব ভোট মেশিনারি রয়েছে, যা বারাসাত সাংগঠনিক জেলার মূলকেন্দ্র বারাসাত বিজেপিতে অদৃশ্য। ভোট করানোর লোক নেই বিজেপির তবে বিজেপি এবার ২৯৮ টি বুথেই নিজেদের এজেন্ট বসাবে যাদের শংকর চ্যাটার্জি অত্যন্ত বিশ্বস্ত বলে দাবি করে চলেছেন। জনসমর্থন যদি ভোটবাক্সে প্রতিফলিত হয়, সেক্ষেত্রে বিজেপির যথেষ্ট মাত্রায় জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। শংকর চ্যাটার্জি ব্যক্তিগতভাবে রাউডি নন, তাছাড়া বিজেপির নিজস্ব ভোটব্যাঙ্ক বারাসাতে যথেষ্ট মাত্রায় রয়েছে। বারাসাতে জনসমর্থন তৃণমূলের দিক থেকে কিছুটা মুখ ফিরিয়েছে এই ইঙ্গিত মিলেছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বারাসাতের জনসভায়, যেখানে লোকসমাগম আশ্চর্যজনকভাবেই কম ছিল যাকে রাজনৈতিক মহল অত্যন্ত ইঙ্গিতপূর্ণ মনে করছে। প্রচারে থাকা বিজেপির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা মনে করছেন, শহরের লিড দিয়ে শংকর চ্যাটার্জী ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার ভোটে হলেও জয়ী হবেন। শহর তৃণমূলের প্রবীণ নেতারা আবার মনে করছেন, শহরাঞ্চলে লোকসভার চেয়ে ভালো ফল করবে তৃণমূল এবং গতবারের চেয়ে মার্জিন কমলেও বারাসাতের আসনটি ধরে রাখতে সক্ষম হবে। বিজেপির অস্বস্তির জায়গা এসআইআর, বারাসাত অন্তত এর ব্যতিক্রম নয়। বারাসাত বিধানসভা আসনটি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল মনে করছেন, বারাসাত বিধানসভা কেন্দ্রে সব্যসাচী দত্তের নিখুঁত পর্যবেক্ষণে থাকার কারণে ভোট মেশিনারি তে এগিয়ে তৃণমূল, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার ঢেউ এবার বিধানসভা ভোটে বারাসাতে আছড়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকায়, জনসমর্থনে এগিয়ে বিজেপি। যেই জিতুক -জয় পরাজয় যে ক্লোস মার্জিনে হবে তা এককথায় নিশ্চিত। সেয়ানে-সেয়ানে কোলাকুলি, হাড্ডাহাড্ডি লড়াই বারাসাতে।।

About Post Author