চুমকী সূত্রধর ও পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা, ৫ জুলাই : অভয়া থেকে বারুইপুর -কিছু কি পাল্টেছে? আরজি কর হাসপাতালে নির্যাতিতা হয়ে ঝরে পড়েছিল এক তরুণী চিকিৎসকের প্রাণ, বারুইপুরে ঝরে পড়ল কিশোরীর প্রাণ। সেদিনের বিরোধী ছিলেন শুভেন্দু অধিকারী, শাসক ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কালের গতিচক্রে এখন শাসক -বিরোধীর আসন পাল্টেছে। কিন্তু সত্যি কি পাল্টেছে কিছু? খন্ড দৃশ্য অনুযায়ী,মৃতা কিশোরীর বাবা উত্তেজিত জনতাকে বলছেন চুপ করতে, বলছেন মঙ্গলবার ভবানী ভবনে মুখ্যমন্ত্রী ডেকেছেন। “যেটাই বলবো,যা দাবি করব- করে দেবে বলেছে ,”বললেন শোকাহত দরিদ্র পিতা । মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও কালীঘাট সূত্রের খবর, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কে বারুইপুরে যেতে দেওয়া হয়নি। এই ছবি এবং দাবি দুটি তুলে ধরেছে রাজনৈতিক নির্যাস, মর্মান্তিক ঘটনার সূচনা এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে দিনভর হলটা কী?
উল্লেখ্য, অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি বারুইপুরে নাবালিকাকে ধর্ষণ করে খুনের অভিযোগ । নির্যাতিতার বাবাকে ফোন করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। আশ্বাস দিয়েছেন, তাঁর সব কথা শুনবেন তিনি। নির্যাতিতার বাবার সঙ্গে ফোনে কথা মুখ্যমন্ত্রীর।
ক্ষিপ্ত জনতার গণপ্রহারে মৃত্যু হল এক অভিযুক্তের। এই দুই ঘটনার জেরে রবিবার অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি তৈরি হল বারুইপুরে। পুকুর থেকে নিখোঁজ নাবালিকার দেহ উদ্ধার হতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দারা।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, কুলপি রোডে মৃতদেহ আটকে বিক্ষোভ, পুলিশ ক্যাম্পে হামলা এবং শিয়ালদহ দক্ষিণ শাখার নামখানা লাইনে ট্রেন অবরোধ করা হয়। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা বন্ধ থাকে সড়কও। পুলিশ প্রথমে গেলে তাদের ঢিল ছুড়ে মারার অভিযোগ ওঠে উন্মত্ত জনতার বিরুদ্ধে। তাতে কয়েক জন পুলিশকর্মী আহত হয়েছেন বলেও অভিযোগ। জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশকে লাঠিচার্জ করতে হয়।
খবর পেয়েই ঘটনাস্থলে পৌঁছোয় পুলিশ। মোতায়েন হয় বিশাল বাহিনী। শেষপর্যন্ত পুলিশ কিশোরীর দেহ উদ্ধার করে বারুইপুর মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যায়।
পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা গিয়েছে, ১১ বছরের নাবালিকা শনিবার বিকেল থেকেই নিখোঁজ ছিল। পরিবারের অভিযোগ, ৪-৫ জন যুবক তাকে জোর করে তুলে নিয়ে গিয়েছিল। রাতভর খোঁজাখুঁজির পর রবিবার সকালে এলাকারই একটি পুকুর থেকে তার নিথর দেহ উদ্ধার হয়। পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, নাবালিকাকে পাশবিক নির্যাতনের পর শ্বাসরোধ করে খুন করা হয়েছে। বিক্ষোভ চলাকালীন স্থানীয় এক যুবককে পিটিয়ে খুন করার অভিযোগ উঠেছে। জানা গিয়েছে, গণপিটুনিতে মৃত যুবকের নাম ইন্দ্রজিৎ তাঁতি। এলাকার মানুষজনের একাংশের অভিযোগ, নিহতকে সন্দেহভাজনদের সঙ্গে ঘুরতে দেখা গিয়েছে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, নাবালিকাকে নির্মমভাবে অত্যাচার ও খুনের ঘটনায় ইন্দ্রজিৎ সরাসরি জড়িত ছিল। রবিবার সকালে তাকে এলাকায় দেখতে পেয়েই ধরে ফেলেন উত্তেজিত জনতা। এর পর চলে গণধোলাই। গুরুতর জখম অবস্থায় পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা মৃত বলে ঘোষণা করেন। বিক্ষোভকারীদের দাবি, এই নৃশংস ঘটনায় ৪ থেকে ৫ জন জড়িত রয়েছে। তাদের মধ্যে একজনকে গ্রেফতার করে বারুইপুর থানায় নিয়ে গিয়েছে পুলিশ। কিন্তু বাকিদেরও অবিলম্বে গ্রেফতার ও ফাঁসির দাবিতে কুলপি রোডে নাবালিকার দেহ রেখে পথ অবরোধ শুরু হয়। পুলিশ অবরোধ তুলতে গেলে পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। বিক্ষোভকারীরা পুলিশের ওপর চড়াও হন এবং সূর্যপুর পুলিশ ক্যাম্পে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়। ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ে রেললাইনেও, যার জেরে শিয়ালদহ দক্ষিণ শাখার নামখানা লাইনে দীর্ঘক্ষণ ট্রেন চলাচল স্তব্ধ হয়ে যায়। স্থানীয়দের স্পষ্ট অভিযোগ, পুলিশের চরম গাফিলতির কারণেই এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ শনিবার রাতে সময় মতো তৎপর হলে মেয়েটিকে হয়তো বাঁচানো যেত।
শেষপর্যন্ত রবিবার দুপুর নাগাদ পুলিশের হস্তক্ষেপে সড়ক অবরোধ তুলে নেন বিক্ষোভকারীরা। স্টেশন থেকেও সরে যান বিক্ষোভকারীরা। ট্রেন চলাচল শুরু হয় নামখানা-শিয়ালদহ লাইনে। কিশোরীর দেহ উদ্ধার করে বারুইপুর মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পুলিশের তরফে মাইকিং করে বিক্ষোভকারীদের শান্ত হতে বলা হয়।
এলাকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি চরম রূপ নিতেই সরাসরি নির্যাতিতার বাবার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি শোকগ্রস্ত পরিবারটিকে সান্ত্বনা দেওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনের তরফ থেকে সব ধরনের কঠোর পদক্ষেপের আশ্বাস দেন। মঙ্গলবার নির্যাতিতার পরিবারকে কলকাতার ভবানী ভবনে ডেকে পাঠিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানিয়েছেন, সেদিন নবান্ন বা ভবানী ভবনে বসে পরিবারের সমস্ত দাবি শুনবেন এবং দোষীদের যাতে দৃষ্টান্তমূলক সাজা হয়, তা সুনিশ্চিত করা হবে।
মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ এবং আশ্বাসের পর ক্ষোভ কিছুটা প্রশমিত হয় গ্রামবাসীদের। তবে ঘটনার পর থমথমে বারুইপুরের বিস্তীর্ণ এলাকা। এলাকায় শান্তি বজায় রাখতে মোতায়েন রয়েছে বিশাল পুলিশ বাহিনী। বাকি অভিযুক্তদের খোঁজে চিরুনি তল্লাশি জারি রেখেছে পুলিশ।
গণপিটুনিতে একজনের মৃত্যু হয়েছে।পাল্টেছে কি কিছু? সময় বলবে সময়ের কথা।


More Stories
বাড়িতে ঢিল পড়তেই পদত্যাগ বারাসাতের দুই মহিলা কাউন্সিলরের
জাতীয় সড়কে টোটো চলাচল ‘বেআইনিভাবে ‘ বন্ধ করা চলবে না, বিক্ষোভ টোটো-চালকদের
দেবরাজের পরে এবার কে? পার্থ ভৌমিককে গ্রেফতারের ইঙ্গিত দিলেন কৌস্তভ