সময় কলকাতা ডেস্ক : কনডম শব্দটা এখনও আমাদের আধুনিক সমাজে কিছুটা হলেও লজ্জাজনক শব্দ। সর্বসমক্ষে কনডম শব্দ উচ্চারণ করতে অনেকেই লজ্জা পান। বিভিন্ন কন্ট্রাসেপটিভ পিল এর পাশাপাশি কনডম জন্মনিরোধক হিসেবে অত্যন্ত জনপ্রিয়।
কনডমের বিভিন্ন প্রকারভেদ রয়েছে। নরমাল কনডম ,ডটেড কনডম, সেন্টেড কনডম ,কালার কনডম, ছাড়াও আরো বহু ধরনের কনডম বাজারে প্রচলিত। কিন্তু কনডমের ইতিহাস বড়ই আজব। কয়েক শতাব্দী আগেই কনডমের ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। অর্থাৎ এটা বলা যেতে পারে কনডম এর ইতিহাস কয়েক শতাব্দী প্রাচীন। প্রাচীনকালে কনডমের ব্যবহার হত জন্মনিয়ন্ত্রণ পাশাপাশি সিফিলিস ,গনোরিয়া, ক্ল্যামাইডিয়া রোগ প্রতিরোধে ব্যবহৃত হতো যদিও সেই সময় এই সমস্ত রোগ অন্য নামে পরিচিত ছিল। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যত উন্নতি হয়েছে, কনডম তৈরির উপকরণেও পরিবর্তন হয়েছে প্রতিনিয়ত। উনিশ শতকের আগে রাসায়নিকভাবে লিলেন এবং প্রাণীর টিস্যুতন্ত্র এবং মূত্রাশয়ের টিস্যু নিয়ে তৈরি করা হতো কনডম। উনিশ শতকের মাঝামাঝি এসে রাবার কনডম জনপ্রিয়তা লাভ করে। কুড়ি শতকের প্রথম দিকে কনডম উৎপাদনের ক্ষেত্রে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়। গর্ভনিরোধক পিল প্রবর্তন হওয়ার আগে কনডমই ছিল পশ্চিম বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি। উনিশ শতকের আগেও যে বিভিন্ন ধরনের কনডমের ব্যবহার করা হতো তার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল ডুডলি ক্যাসেলের একটি মাঠে সেফটি ট্যাংকের মধ্যে থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল প্রাণীর ঝিল্লি থেকে তৈরি করা কনডম। পঞ্চদশ শতকের আগে সমগ্র এশিয়াজুড়ে গ্লান কনডমের ব্যবহার প্রমাণ পাওয়া যায়। শুধুমাত্র পুরুষাঙ্গের মাথা ঢেকে রাখার জন্যই সেই কনডমের ব্যবহার করা হতো। সেই কনডম ব্যবহার করত মূলত সমাজের উচ্চ শ্রেণীর মানুষ জন। মিং সাম্রাজ্যে এর প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল। চীনে গ্লান কনডম সাধারণত তেলযুক্ত সিল কাগজ বা ভেড়ার অন্তর থেকে তৈরি করা হতো আর জাপানি সেই কনডম কচ্ছপের খোল বা পশুর সিংয়ের ছাল থেকে তৈরি করা হতো।১৪৯৪ সালে প্রথম ফরাসি সৈন্যদের মধ্যে সিফিলিস নামক রোগের প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করা যায় । ধীরে ধীরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে এই সিফিলিস রোগ। এক ঐতিহাসিক জ্যারেড ডায়মন্ড তার একটা লেখনীতে বর্ণনা করেছিলেন সিফিলিস যাদের হত তাদের মাথা থেকে হাঁটু পর্যন্ত শরীর ঢেকে রাখা হতো কারণ মানুষের মুখ এবং শরীর থেকে মাংস ঝড়ে পড়তো আর তারপরই তার মৃত্যু হত। বর্তমানে সেইরোগের মারুন ক্ষমতা অনেক কমে গিয়েছে। তৎকালীন সময়ে সিফিলিস রোগ কে প্রতিহত করার জন্য লিলেন সিট গুলি একটি রাসায়নিক দ্রব্য ভিজিয়ে রাখা হতো তারপরে সেটা শুকিয়ে নিয়ে লিঙ্গের অগ্রভাগ ঠিক রাখা হতো এবং ফিতে দিয়ে বেঁধে রাখা হতো। তখন থেকেই মনে করা হয় পরিকল্পিতভাবে কনডমের ব্যবহার শুরু। রেনেসাঁসের সময় মূলত পশুর অন্ত্র এবং মূত্রাশয় থেকে কনডম তৈরি করা হতো এবং সেই কনডম ত্রয়োদশ শতক থেকে বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি হয়েছে পশ্চিম বিশ্বের দেশগুলোতে।১৫৬৪ সালে কনডমের প্রথম ব্যবহার নথিভূক্ত করা হয় এ্যানাটমিস্ট ফ্যালোপিয়া সেই সময় একটি কনডম আবিষ্কার করেছিলেন যার নাম দেয়া হয়েছিল ফ্যালোপিয়ান টিউব। কনডম শব্দের উৎপত্তি নিয়ে আজও হাজারখানা মতবাদ রয়েছে। অনেকে মনে করেন ফ্রান্সের একটি শহর এই প্রথম কনডম শব্দের উৎপত্তি হয় আবার অনেকের মতে কনডম শব্দটির আসলে একটি ল্যাটিন শব্দ। ১৭০৬ সালে একটি কবিতায় “কন্ডন”শব্দটি প্রথম ব্যবহৃত হয় তৎকালীন সময়ে এক সাহিত্য জার্নালে প্রকাশিত হয়েছিল সেই কবিতা ।১৮৩৯ সালে ভলকানাইজিড রাবারের আবিষ্কার হয়। চার্লস গুড ইয়ারের সেই আবিষ্কার তৎকালীন সময়ে সাড়া জাগিয়েছিল সারাবিশ্বে। তখন থেকে বলা হয় যে আধুনিক কনডমের প্রস্তুতি শুরু। সেই সময়ে একাধিক বাণিজ্য গোষ্ঠী কনডমের ব্যবহার শুরু করেন এবং তারা উৎপাদন শুরু করেন। চতুর্দশvশতকে বাজারে তখন দুই প্রতিদ্বন্দ্বী মিসেস ফিলিপস এবং মিসেস পার্কিন্সের আধিপত্য ছিল কনডমের দুনিয়ায় । প্রাণীর অন্ত্র এবং মূত্রাশয় থেকে তৈরি কনডম তৈরি করে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবসা করতেন এই দুই প্রতিদ্বন্দ্বী। অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকে যখন ভল্কানাইজিড রাবারের রাবারের উৎপাদন শুরু হলো তখন থেকেই বাণিজ্য দুনিয়ায় মোড় ঘুরে গেল, একাধিক কোম্পানি ঝাপিয়ে পড়ল রাবার কনডম প্রস্তুতিতে।

শুধু পুরুষদের ক্ষেত্রে নয় মহিলা কনডম ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায় প্রাচীন গ্রিসে। ২০০০ বছরেরও আগে প্রাচীন গ্রিসে মহিলারা কনডম ব্যবহার করত । ছাগলের মূত্রাশয় থেকেই সেই সময় তৈরি করা হতো মহিলাদের-কনডম। প্রাচীনকালে মনে করা হতো এই কনডম ব্যবহারের ফলে বিভিন্ন অভিশাপ থেকে মুক্তি ঘটে। ১৯২৩ সালে মহিলা কনডম ব্যবহারের জন্য প্রথম প্রচার করেছিলেন মেরিস্টোপস নামক এক মহিলা। তৎকালীন সময়ে ভলকানাইজিং রাবার দিয়ে কোয়েল রিম দিয়ে তৈরি করা হতো মহিলাদের এই গর্ভনিরোধক কনডম। ১৯৯৩ সালে প্রথম আধুনিক মহিলা কনডম বাজারে আসে । সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় ১৯৯৮ সালে উইসকনসিন ফার্মাসিউটিক্যালস একটি কোম্পানির কাছে ত্রিশ হাজার মহিলা স্বাক্ষরিত একটি পিটিশন জমা পড়ে যাতে লেখা থাকে যে জিম্বাবোয়ের মহিলারা আবেদন করেছেন যে মহিলা কনডম তাদের দেশে প্রচলন করা হোক।

কনডম নিয়ে সচেতনতা হাজার হাজার বছর ধরে রয়েছে। আর সে কারণেই কনডমের উপর পরীক্ষা চলেছে যুগ যুগ ধরে। আজও প্রতিনিয়ত পরীক্ষা চলছে শুধুমাত্র জন্ম নিয়ন্ত্রণ করার জন্যই নয় বিভিন্ন রোগ ব্যাধি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আজও চলছে কনডম কেন্দ্রিক গবেষণা।


More Stories
নেতা নয় নায়ক, যমের অরুচি, ঋতব্রতকে ভয়ঙ্কর আক্রমণ শতরূপের
কেক কেটে ঈদ উদযাপন
বউ বদল : ময়নাগুড়িতে স্বামী-স্ত্রীর বদলাবদলি নাকি বদলা ?