Home » রবীন্দ্রনাথের ঈশ্বরচেতনা

রবীন্দ্রনাথের ঈশ্বরচেতনা

পূরবী বন্দ্যোপাধ্যায় (অতিথি লেখিকা), সময় কলকাতা:

রবীন্দ্রনাথ ও ঈশ্বর চেতনা এমন এক বিষয় যা নিয়ে আলোচনা করে তাকে ছোঁয়ার চেষ্টা করা হলে মনে হয় মহাসমুদ্রর সামনে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। কবিগুরুর সমগ্র জীবন ও সাহিত্য সৃষ্টির মূল কথাই হ’ল ঈশ্বর চেতনা। তাই কবি লেখেন -“সীমার মাঝে অসীম তুমি বাজাও আপন সুর, আমার মধ্যে তোমার প্রকাশ তাই এত মধুর “।

জীবন স্মৃতি থেকে জানা যায় যে মাঘ উৎসবে একদিন চুঁচুড়ায় দেবেন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথকে পরপর কটি গান করতে বলেন। তার মধ্যে একটি গান ছিল “নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে রয়েছ নয়নে “।কবি লিখেছেন,”গান গাওয়া যখন শেষ হইল তখন তিনি বলিলেন,”দেশের রাজা যদি দেশের ভাষা জানিত ও সাহিত্যের আদর বুঝিত, তবে কবিকে তো তাহারা পুরস্কার দিত। রাজার দিক হইতে যখন তাহার কোনো সম্ভাবনা নাই তখন আমাকেই সে কাজ করিতে হইবে ” এই বলিয়া একখানি পাঁচশো টাকার চেক আমার হাতে দিলেন। ” মহর্ষি পুত্রের জীবনচেতনা সম্পর্কে যা উপলব্ধি করেছেন অর্থাৎ কবির রচনার কেন্দ্রে থাকা বোধই কবির জীবনে প্রতিটি ঘটনায়, সাহিত্য সৃষ্টিতে পরিব্যপ্ত।

এই যে বোধ ঈশ্বরকে একান্ত ভাবে চেতনার মধ্যে আত্মীকরণ কবির জীবনের প্রতিটি ঘটনা ও সাহিত্য কৃতিতে পরিব্যপ্ত। সামগ্রিক বিষয়কে কোনও আঙ্গিকে বর্ণনা করা অসম্ভব। কোলাজ থেকে কেবলমাত্র কিছু টুকরো ছবি তুলে আনার চেষ্টা করা যেতে পারে মাত্র।উল্লেখ্য, “নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতাটির কথা। কবি লিখেছেন,”সদর স্ট্রিটের রাস্তাটার পূর্বপ্রান্তে বোধকরি ফ্রী স্কুলের বাগানের গাছ দেখা যায়। একদিন সকালে বারান্দায় দাঁড়াইয়া এই গাছগুলির পল্লবান্তরাল হইতে যেমন আমি সূর্যোদয় দেখিলাম অমনি আমার চোখের উপর হইতে যেন একটা পর্দা উঠিয়া গেল। একটি অপরূপ মহিমায় বিশ্বসংসার আচ্ছন্ন হইয়া গেল –আনন্দ এবং সৌন্দর্য সর্বত্র তরঙ্গিত হইতে লাগিল —-আমি সেইদিনই মধ্যাহ্ন ও অপরাহ্ন “নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ ” লিখিলাম।”

কবি লিখলেন, “হৃদয় আমার কেমনে গেল খুলি, জগৎ আসি সেথা করিছে কোলাকুলি “-কবির সমগ্র জীবন ও সাহিত্য সাধনা জগৎ ও ঈশ্বরের সাথে মিলনের সাধনা, বিশেষ করে পূজা পর্যায়ের সমস্ত সংগীত ঈশ্বরের সাথে তাঁর গভীর অনুভব।বলা হয় সাধক, ঋষি কবির সমগ্র জীবন ও সাহিত্য সাধনা এই সীমার সাথে অসীমের মেলবন্ধন। আমরা অনেক সময় ভাবি ও আলোচনা করি কবির জীবনে এই যে বার বার একান্ত প্রিয় জনের বিচ্ছেদ কী গভীর শান্ত ভাবে তিনি গ্রহণ করলেন কী করে তখন তার নির্যাস ফুটে ওঠে। প্রকাশ পায় যে এখানেই রয়েছে কবির ঈশ্বর চেতনা যা তাঁকে দিয়েছে আত্মনির্ভরতা ।তাঁর একান্ত প্রার্থনা “বিপদে মোরে রক্ষা কর এ নহে মোর প্রার্থনা বিপদে আমি না যেন করি ভয় “। কেন? কারণ “জানি তুমি মোরে করিবে উদ্ধার যতই অনলে দহিবে “।

 

 

জীবন উপান্তে যখন সর্ব কনিষ্ঠ অতি প্রিয় সন্তান শমীন্দ্র নাথকে হারিয়ে পুত্রের শেষ কাজ করে মুঙ্গের থেকে ফিরে আসছেন তখন তাঁর অনুভূতিতে যেন কোনও ঈশ্বর তুল্য মানবের প্রকাশ যেখানে ঈশ্বর চেতনা ও মানব জীবনের নশ্বরতা যেন একাত্ম : “রাতে ট্রেনে আসতে আসতে দেখলেন জোৎস্নায় আকাশ ভেসে যাচ্ছে, কোথা কিছু কম পড়েছে তার লক্ষণ নেই। তাঁর মন বললে, কম পড়েনি –সমস্তের মধ্যে সবই রয়ে গেছে, আমিও তারি মধ্যে। সমস্তর জন্য আমার কাজও বাকি রইল।”

তাই কবিগুরু লিখে যান “যদিও সন্ধ্যা আসিছে মন্দ মন্থরে,–তবু বিহঙ্গ ওরে বিহঙ্গ মোর এখনই একান্ত অন্ধ বন্ধ কোরো না পাখা।”স্পষ্টতই,রবীন্দ্রনাথের ঈশ্বর চেতনা, ঈশ্বর অনুভূতি কোনো বিপর্যয়ের সামনে তাঁকে ভেঙে পড়তে দেয় নি। “তোমার অসীমে প্রাণ মন লয়ে যত দূরে আমি ধাই, কোথাও দুঃখ, কোথাও মৃত্যু, কোথা বিচ্ছেদ নাই,” -এই ছিল সাধক ঋষি কবির জীবন বোধ আর তাঁর ঈশ্বর চেতনার মূল কথা।।

About Post Author