Home » আন্দামানের রোজনামচা

আন্দামানের রোজনামচা

দেবিকা চট্টোপাধ্যায় (অতিথি লেখিকা ), সময় কলকাতা

তৃতীয় পর্ব

আন্দামান সেলুলার জেল

কলকাতা বিমানবন্দর থেকে আন্দামান পর্যন্ত যেতে ঘন্টা দুয়েক সময় লাগে। যাত্রাপথের প্রায় পুরোটাই সমুদ্রের উপর দিয়ে।তবে প্লেনের জানলা দিয়ে দেখে সমুদ্র আর আকাশকে আলাদা করে চেনা যাচ্ছিল না। আন্দামান বিমানবন্দরে অবতরণের কয়েক মিনিট আগে সমুদ্র আবার দৃষ্টিগোচরে এল।বার্ডস্ আই ভিউ তে আন্দামানের ছেঁড়া ছেঁড়া দ্বীপগুলো দেখা যাচ্ছিল তুঁতেরঙা সমুদ্রের জলের উপর ভেসে থাকতে,ঘন সবুজ গাছে ঢাকা সেগুলো।বিমান যত নীচে নেমে আসছিল নীচের দৃশ্য ততই পরিষ্কার রূপে প্রতীয়মান হচ্ছিল।আস্তে আস্তে ছড়ানো ছিটোনো কিছু ঘরবাড়িও দেখা গেল,তবে কলকাতার মত অট্টালিকার সারি নয়,নানা রঙের ছোট ছোট ঘরবাড়ি, প্রতিটার তেরছা ছাদও রঙিন। অত্যধিক বৃষ্টিই হয়তো এর কারণ। অবতরণের পর বিমানবন্দরের বাস আমাদের বিমানবন্দরের মূল বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে আবার একদল যাত্রীকে আনতে চলে গেল।আমরা ভিতরে ঢুকে কনভেয়ার বেল্টের কাছে গিয়ে আমাদের কেবিন লাগেজের জন্য অপেক্ষায় রইলাম। আশেপাশে তাকিয়ে আমাদের অন্যান্য সহযাত্রীদের দেখছিলাম। কিছু কেজো সাধারণ মানুষের সঙ্গে সঙ্গে একদল অত্যাধুনিক বিচিত্র সাজে সজ্জিত মানুষও দেখতে পেলাম। আবার কিছু প্রটোকল মেনে বাইরে বেরোতেই ঝুপঝুপিয়ে বৃষ্টি শুরু হলো। ইতিমধ্যে আমাদের ড্রাইভারের সঙ্গে ফোনে কথা হয়ে গেছে,সে বাইরেই অপেক্ষা করছিল। গাড়িতে উঠে কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমরা পৌঁছে গেলাম হোটেলে।তখন দুপুর সাড়ে বারোটা বাজে। আমাদের নামিয়ে দিয়ে ড্রাইভার বলে গেল বেলা আড়াইটার সময় আমাদের সেলুলার জেল দেখাতে নিয়ে যাবে।হোটেলে ঢুকে আমরা নিজেদের ঘরে দ্রুত স্নান সেরে খাবার ঘরে গিয়ে খেয়ে নিয়ে রেডি হলাম। যথাসময়ে গাড়ি আমাদের নিয়ে চলল সেলুলার জেল।

ফাঁকা ফাঁকা চওড়া উঁচু নিচু রাস্তা ঘাট ধরে মিনিট কুড়ি পঁচিশের মধ্যে সেলুলার জেল এর সামনে এক তেমাথায় আমাদের নামিয়ে দিয়ে ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে দূরে চলে গেল, এখানে পার্কিং এর নিয়ম নেই। চারিদিকের পুলিশ প্রহরা দর্শনার্থীদের যথানিয়মে এগিয়ে যেতে সাহায্য করছে।গাড়ি থেকে নেমে ভিতরে ঢোকার আগে আমরা কয়েকমিনিট স্থির হয়ে দাঁড়ালাম।এই ঐতিহাসিক এবং একইসঙ্গে বিখ্যাত ও কুখ্যাত নিদর্শনের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের আবেগ ও স্মৃতিকাতরতাকে শান্ত করার জন্য না দাড়ালেই নয়। সেলুলার জেল ছবিতে দেখলেও এর সামনে উপস্থিত হওয়ার যে উত্তেজনা,তাকে প্রশমিত করে তবেই ভিতরে প্রবেশ করবার সাহস পেলাম।মনকে শক্ত করে নিয়ে গেট পেরোতেই ডানহাতে একটি ছোট মিউজিয়াম, সেখানে এই জেলের বিভিন্ন স্বদেশী, স্বাধীনতাসংগ্রামী কয়েদীদের টুকরো টুকরো ঐতিহাসিক তথ্য ও ছবি দেখে হাত মুষ্ঠিবদ্ধ হয়ে উঠছিল।তথ্য থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সাহস,জেদ, দেশপ্রেম, সহনশীলতা, কষ্ট ও দুঃখের কিছু কিছু কথাই শুধু জানতে পারলাম।আরো কত তথ্য যে ইতিহাসের তলায় চাপা পড়ে আছে তা আর জানার উপায় কই? ইতিহাস তো ক্রমাগত বিকৃত হয়েই চলেছে। সাভারকারকে নিয়েই যেন যত আগ্রহ! কতশত বাঙালি ও পাঞ্জাবী তরুণ দেশকে ভালবেসে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন অথচ তাঁরা উপেক্ষিত হয়ে বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গেছেন বা যাচ্ছেন।সাভারকার এই জেলের যে কুঠুরিতে থাকতেন ও বৃটিশ ভজনার মাধ্যমে সেখান থেকে মুক্তি পেয়ে বেরিয়ে গেছিলেন সেই কুঠুরিই সকলের মূল আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু দেখে মন খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। যে বা যারা দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য নিজের জীবন তুচ্ছ করে অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করেছিলেন ও স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন তাঁরা সকলেই যথাযোগ্য মর্যাদা পান এছাড়া আর কিই বা চাইতে পারি?আর যে বা যারা সেই সব নিবেদিতপ্রাণ সংগ্রামীদের জীবনের বিনিময়ে নিজের স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত ছিলেন তাদের ও সঠিক বিচার প্রয়োজন।


যাই হোক, ছোট্ট সেই মিউজিয়ামে সেই আমলের সেলুলার জেলের একটি মডেলও ছিল। ইংরেজদের তৈরী সেই জেলে ছিল মোট সাতটি টাওয়ার।এখন তিনটি টাওয়ার আর নেই, বাকি চারটি টাওয়ার দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত। বিভিন্ন তথ্য ও ছবির সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ব্যবহৃত পোষাকের নমুনা, তাদের উপর বৃটিশ সরকারের অত্যাচারের পদ্ধতি ও তার জন্য ব্যবহৃত ধাতব শিকল আংটা চাবুক ইত্যাদির নমুনা দেখে চোখে জল এসে যাচ্ছিল।জেলের কয়েদী হিসেবে তাদের দৈনন্দিন করণীয় কাজ এবং সেই কাজে ভুল ত্রুটি হলে বৃটিশ সেনার নির্মম নির্যাতনের ইতিহাসও জানতে পারলাম।এরপর গাইড আমাদের নিয়ে গেলেন কিছু মডেলের মাধ্যমে কয়েদীদের উপরে হওয়া ঐ অত্যাচারেরই নিদর্শন দেখাতে।এরপর ফাঁসির কুঠুরিও দেখলাম।এর পর গাইড আরো একটি মিউজিয়ামে নিয়ে গেল যেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আন্দামানের বিভিন্ন দ্বীপে কিভাবে ইংরেজদের ঘাঁটি গড়ে উঠেছিল ও জাপান কোথায় কোথায় বোমা বর্ষণ করেছিল,ছবি ও লেখার মাধ্যমে তা দেখানো হয়েছে।

(তথ্য ও মতামত একান্তভাবেই লেখিকার, এজন্য সংবাদ মাধ্যম দায়বদ্ধ নয় )

ক্রমপ্রকাশ্য

About Post Author