Home » আন্দামানের রোজনামচা

আন্দামানের রোজনামচা

দেবিকা চট্টোপাধ্যায় (অতিথি লেখিকা ), সময় কলকাতা

চতুর্থ পর্ব

মিউজিয়াম টা দেখার পর আমরা বাকি অংশ ভালভাবে দেখার জন্য একজন গাইড নিলাম। গাইড আমাদের নিয়ে গেলেন মূল টাওয়ারে,যেখানে রাজনৈতিক বন্দীদের এক একটা কুঠুরির মধ্যে আটক করে রাখা হত।সাতটি টাওয়ারে একই রকমভাবে কুঠুরিগুলো তৈরী করা হয়েছিল।টানা লম্বা বারান্দার এক পাশে কুঠুরির সারি।প্রত্যেকটা কুঠুরির উপর দিকে, সিলিং থেকে একটু নীচে একটিই মাত্র ছোট ঘুলঘুলি, এছাড়া বহির্জগতের সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক নেই।দরজার পাশে একটি ছোট চৌকো আকৃতির গর্ত যার মধ্যে দিয়ে বন্দীকে খাবার বা জল দেওয়া হতো। টয়লেট বলে কিছুই ছিল না,ঐ কুঠুরির মধ্যেই সমস্তকিছু সারতে হত তাঁদের।

কয়েকটি কুঠুরি সেই আগের মতই সাজিয়ে রাখা রয়েছে দর্শকদের দেখানোর জন্য। আমাদের যিনি গাইড ছিলেন তিনি প্রত্যেকটা জায়গার ঐতিহাসিক তাৎপর্য বুঝিয়ে বলছিলেন খুব বিস্তারিতভাবে। হিন্দিতে তিনি খুব দ্রুত সমস্ত তথ্য বলছিলেন, তবে লক্ষ্য করলাম তথ্যের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর গলায় সেই সমস্ত রাজবন্দীদের প্রতি তাঁর আবেগও ঝরে পড়ছে । অনুভব করলাম কেজো দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তাঁর আন্তরিক ভালোবাসাও রয়েছে কাজটির প্রতি। আমাদের চার জনের সঙ্গে সঙ্গে আরো একটি দলকে উনি গাইড করছিলেন।ঐ দলটিতে একটি পরিবার ও তার সঙ্গে বেশ কয়েকজন সাঙ্গপাঙ্গ এবং দুজন পুলিশ দেহরক্ষী দেখে বুঝলাম উনি কোনো সরকারি আধিকারিক হবেন হয়তো। ওঁকে বেশ গুরুত্ব দিয়েই গাইড ভালোভাবে সব বুঝিয়ে বলছিলেন। গাইডের বলা সেইসব তথ্যের একটা কথাও যাতে মিস না করে যাই,তাই আমাকে প্রায় ওঁর পিছনে ছুটতে হচ্ছিল। আসলে ঐ আধিকারিক তাঁর দলবল নিয়ে গাইডকে প্রায় ঘিরে রেখেছিলেন। কিন্তু দুতলা তিনতলা টাওয়ার গুলো দেখানোর সময় সেই দলবল কমতে কমতে তিনজনে এসে ঠেকলো, দুই দেহরক্ষী আর তাদের কর্তা।ফলে আমাদের শোনার আর সমস্যা রইলো না।সব তথ্য জানার পর প্রতিটা টাওয়ারের বারানর্জনতায় মোড়া এক একটা কুঠুরির পাশে দাঁড়িয়ে সেই সুদূর অতীতে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে হচ্ছিল, জানতে ইচ্ছে করছিল কোন তাড়নায় সব ছেড়ে এই অন্ধকূপের জীবন বেছে নিয়েছিলেন তাঁরা? বর্তমান সমাজ সে উত্তর জানতে চায়না , ওঁরাও নিশ্চয়ই এই সমাজকে তা জানানোর প্রয়োজনকে বাহুল্য বলেই মনে করেন।

এরপর গাইড টাওয়ারের শীর্ষে উঠে টাওয়ার গুলোর অবস্থান ও দেখালেন।যে তিনটি টাওয়ার ভেঙে গেছে বা ভেঙে ফেলে নতুনভাবে তৈরী করে অন্য কাজে ব্যবহারোপযোগী করে তোলা হয়েছে,তাও দেখা গেল।খোলা ছাদ থেকে চারপাশের দৃশ্য বেশ সুন্দর।কাছেই সমুদ্র,তার সবজেটে নীল জলের ঢেউ তীরের কাছে আছড়ে পড়ছে সাদা ফেনা সহ। গাছপালার ফাঁক দিয়ে চোখে পড়লো দূরে আরেকটা দ্বীপের ঘন সবুজ গাছপালা। এখানে অজস্র ছোট বড় দ্বীপের সমাহার,আর প্রতিটা দ্বীপই ঘন সবুজে ঢাকা। তাকিয়ে থাকলে চোখ ফেরাতেই ইচ্ছে করে না।জেলের সীমানা প্রাচীরের ভিতরে প্রচুর গাছপালা ও কেয়ারি করা বাগান ছাড়াও অনেকটা ফাঁকা জমি রয়েছে, উপর থেকে দেখা গেল সেখানে এলোমেলোভাবে বড় বড় গাছপালার মাঝে দু একটা লোহার চেয়ার পড়ে আছে অব্যবহার্য্য।বোঝা যাচ্ছিল এখন সেখানে কেউ আর বসেনা। আশেপাশে ঝোপঝাড় হয়ে রয়েছে। একসময় হয়তো কোনো নিষ্ঠুর ইংরেজ শাসক তার প্রণয়িণীর সঙ্গে ঐ চেয়ারে বসে প্রেমালাপ করেছেন। নিষ্ঠুর মানুষও তো ভালবাসে, ভালবাসা পায়ও।


সব টাওয়ার গুলি যে জায়গায় একসঙ্গে সংযুক্ত সেখানে নামা ওঠার সিঁড়ি রয়েছে ও সিড়ির ল্যান্ডিংএ এই জেলের বন্দীদের নামের তালিকা রয়েছে। তা দেখে আমরা নীচে নেমে এলাম। নীচের খোলা মাঠের এক অংশে একটি মঞ্চে লাইট এন্ড সাউন্ড সিস্টেম এর মাধ্যমে বন্দীদের জীবনকে ফুটিয়ে তোলা হয়।তবে এখন কিছুদিনের জন্য তা বন্ধ রাখা হয়েছে পুনর্গঠনের জন্য।এ ব্যাপারে আমাদের আফশোষ আছে জেনে গাইড ভদ্রলোক আমাদের আস্বস্ত করলেন এই বলে,যে উনি যেভাবে সবকিছু বুঝিয়ে বললেন ও দেখালেন লাইট এন্ড সাউন্ড সিস্টেম তার থেকে বেশী নয়, অনেক কম দেখাবে।তবে লাইট ও সাউন্ডের সঙ্গে নাটকীয়তা সহযোগে তা দেখানো হয় বলেই তা সবার আগ্রহের বিষয়। একথা শুনে কিছুটা হলেও আফশোষ কমলো আমাদের।গেটের বাইরে বেরিয়ে এসে আরেকবার ফিরে দেখলাম সবটা। আশেপাশে আমাদের গাড়ি বা ড্রাইভারকে দেখতে না পেয়ে ফোন করা হলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়ি এলে চটপট আমরা উঠে পড়লাম,গাড়ি কর্বিনস্ কভ বীচের দিকে চলতে শুরু করলো। পোর্ট ব্লেয়ারের এই শান্ত বীচ সন্ধ্যের মুখে প্রায় ফাঁকা হয়ে এসেছিল।আমরা জুতো হাতে নিয়ে বেশ কিছু সময় জলে পা ডুবিয়ে হেঁটে বেড়ালাম।লোকজন কমে যাওয়ায় ছোট ছোট কাঁকড়ার বাচ্চা বালির ভিতর থেকে বেরিয়ে আসছিল আবার ঢুকে যাচ্ছিল। অন্ধকার হয়ে এলে সমুদ্রের উপরে ভাড়া খাটা স্পীডবোটগুলোর চলাচল কমলো।গোটা বীচটা পোড়া তেলের গন্ধে ভারী হয়ে ছিল। মানুষের ভোগের উপকরণ যত বাড়বে পরিবেশ ততই দূষিত হবে,এ আর এমন কথা কি?তবে এর শোধ যে প্রকৃতি নেবেই কোনোদিন তাও সবারই জানা।।

About Post Author