Home » মোগল রাজমহিষী যোধাবাই ও রাজা প্রতাপাদিত্যের সেনাপতি শংকরের শিবের কোঠার পুজো

মোগল রাজমহিষী যোধাবাই ও রাজা প্রতাপাদিত্যের সেনাপতি শংকরের শিবের কোঠার পুজো

 শর্মি পাল, পুরন্দর চক্রবর্তী , চুমকী সুত্রধর, সময় কলকাতা : ”ওম জয়ন্তী মঙ্গলা কালী ভাদ্র কালী কপালিনী, দুর্গা ক্ষমা শিবধাত্রী স্বাহা স্বধা নমোস্তুতে”- ত্রেতা যুগে শ্রীরামচন্দ্রের অকাল বোধন করার বহু পরে বঙ্গে কয়েকশো বছর আগে শরৎকালেই রাজারা প্রথম দুর্গাপুজো প্রচলন করেন। দুর্গাপুজো ইতিহাস সুপ্রাচীন হলেও আধুনিক সময়ে মোগল আমলে প্রথম দুর্গাপুজো শুরু হয়। সে সময় হাতে গোনা যে কয়েকটি দুর্গাপুজো হত তারই একটি পুজোর ইতিহাস, রীতি এবং বৈশিষ্ট্যের কথা তুলে ধরার চেষ্টায় এবারের প্রতিবেদন বারাসাতে শঙ্কর প্রতিষ্ঠিত শিবের কোঠার দুর্গা পুজো নিয়ে।এই পূজার সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রাচীন এক ইতিহাস ও জনশ্রুতি।

 ‘আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোক মঞ্জীর; ধরণীর বহিরাকাশে অন্তরিত মেঘমালা; প্রকৃতির অন্তরাকাশে জাগরিত জ্যোতির্ময়ী জগন্মাতার আগমন বার্তা’ – বাঙালি মেতে উঠেছে তার প্রাণের উৎসব দুর্গাপুজোয়। দুর্গাপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুরাণ ও ইতিহাস। পৌরাণিক ত্রেতাযুগে শ্রীরামচন্দ্রের দুর্গাপুজোর পরে কলিযুগে কবে প্রথম দুর্গাপুজো হয়েছিল, তা নিয়ে রয়েছে বহু বিতর্ক। প্রচলিত মতে, ৫৪৩ বছর আগে দুর্গাপুজো প্রথম শুরু হয়েহিল অধুনা বাংলাদেশে। প্রচলিত মতে, রাজা কংসনারায়ণকে বর্তমান যুগের দুর্গাপুজোর প্রবর্তক বলা হয়। ঐতিহাসিকরা বলেন, ১৫৮৩ খ্রিস্টাব্দে রাজা কংসনারায়ণ তাহেরপুরে দুর্গাপুজো শুরু করেছিলেন অর্থাৎ আজ থেকে ৪৪১ বছর আগে। আবার একটি মতে, পঞ্চদশ শতকে রাজা গণেশ প্রথম দুর্গাপুজো করেন ,যদিও তা নিয়ে কোনও প্রামাণ্য তথ্য নেই। ইতিহাস এও বলে, ১৪৮০ খ্রিস্টাব্দে রাজা কংসনারায়ণের জন্ম হয়নি। তিনি যে ষোড়শ শতকের শেষ ভাগে সম্রাট আকবরের সময় রাজা ছিলেন তা নিয়ে সংশয় নেই। সেদিক দিয়ে দেখলে বঙ্গের সামান্য কয়েকটি পুজোই কংসনারায়ণ পরবর্তী সময়ে শুরু হয়েছিল। এরমধ্যে অন্যতম পুজো বারাসাতের শিবের কোঠার পুজো। উত্তর চব্বিশ পরগনার সদর শহর বারাসাত তখন ছিল গ্রাম এবং এখানেই ছিল বারো ভূঁইয়ার অন্যতম প্রতাপাদিত্যের সেনাপতি শঙ্কর চট্টোপাধ্যায়ের নিবাস। তিনি ছিলেন প্রতাপাদিত্যের অভিন্ন হৃদয় ও পরাক্রমশালী যোদ্ধা। তাঁর আদি নিবাসে তিনি সপ্তদশ শতকের গোড়ায় দুর্গাপুজো করতে শুরু করেন। এই পুজোর ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে জাহাঙ্গীর ও জোধাবাঈ-এর নাম। ঐতিহাসিক সন তারিখ হিসেব করলে, এই পুজোর সূচনা নিশ্চিতভাবে চারশো বছরেরও বেশি সময় আগে শুরু হয়েছিল।
শিবের কোঠা নামকরণে যেমন রয়েছে ইতিহাস, ঠিক একইভাবে বারাসাতের দক্ষিণপাড়ায় শিবের কোঠার দুর্গাপুজোর পরতে পরতে রয়েছে ইতিহাস। মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনকালে রাজমহিষী যোধাবাই-য়ের ভাবনার সঙ্গে নিজের ভাবনাকে মিশিয়ে শঙ্কর চট্টোপাধ্যায় প্রথম এই পুজো শুরু করেন। কেন মোগল রাজমহিষী ও বঙ্গের সেনাপতির এই ভাবনার মেলবন্ধন?

শঙ্কর চট্টোপাধ্যায় বারো ভূঁইয়ার অন্যতম প্রতাপাদিত্যর প্রধান সেনাপতি হওয়ায় মোগল সম্রাটের নির্দেশে তৎকালীন যশোর জেলা তথা পরগনা থেকে তাঁকে বন্দি করা হয়। সেদিনের যশোর এখন টুকরো টুকরো হয়ে বর্তমান বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। যশোর থেকে মোগল সেনাপতি মানসিংহ তাঁকে বন্দি করে আগ্রা নিয়ে যান। কথিত আছে, তাঁর বন্দিদশায় নিয়ম করে তিনি শ্লোক পাঠ করতেন। একদা যোধাবাই তাঁর তর্পণ শুনে মুগ্ধ হয়ে জাহাঙ্গীরকে তাঁকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করার নির্দেশ দেন। জনশ্রুতি রয়েছে, যোধাবাঈ স্বপ্নে দেখেছিলেন মা দুর্গা তাঁকে পুজোর আয়োজন করতে বলছেন।

যোধাবাঈ-এর শঙ্করকে মুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়ার নেপথ্যে অন্যতম শর্ত ছিল যে, শঙ্করকে স্বভূমিতে ফিরে যোধাবাঈয়ের নামে সংকল্প করে পুজো শুরু করতে হবে। এরপর বারাসাতে ফিরে এসে যোধাবাইয়ের স্বপ্নাদেশ মেনে শঙ্কর চট্টোপাধ্যায় শুরু করেন শিব ও দুর্গা পুজো। শঙ্কর চট্টোপাধ্যায়ের বর্তমান প্রজন্মে শেষ পুরুষ ছিলেন কিরণ শঙ্কর চট্টোপাধ্যায়। তিনি বলতেন, এই পুজো ১৬০৭ সালে শুরু। যদিও প্রচলিত ধারণা ও ইতিহাস মেনে বলতে হয় ১৬১১-১৬১৯ সালের মধ্যে কোনও একসময় এই পুজো চালু হয় এবং তথাকথিত প্রাচীন বনেদি পুজো সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের পুজোর পর পরই এই পুজোর সূচনা হয়। বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে বলা যায়, এই পুজোর সূচনালগ্ন সপ্তদশ শতকের একেবারে গোড়ার দিকে।

 আমরা আজও মুগ্ধ বিস্ময়ে বঙ্গের বনেদি পুজোগুলির ঐতিহ্য স্মরণ করি পুজোর প্রাক-মুহূর্তে। স্মরণ করি ইতিহাসের কথা। তবুও পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুজোর আচার ও পুজো পালনের কথা। শঙ্কর প্রবর্তিত পুজোর বিভিন্ন আঙ্গিক স্বতন্ত্র।

শঙ্করের কাছে থাকা সেই প্রাচীন সময়ের রাধা এবং পরে নতুন করে শঙ্করের তৈরি কৃষ্ণ আজও পুজোর দিন পুজোর দালানে রেখে পুজো চলে। কিরণশঙ্কর প্রয়াত হওয়ার পরে বাড়ির মহিলারা পুজোর হাল ধরেছেন। জন্মষ্টমীর দিন কাঠামো নির্মাণ থেকে পুজোর সাজো সাজো রব শুরু হয়ে যায়। এরপরই প্রতিমাকে মণ্ডপে তোলা হয়। ষষ্ঠী থেকে দশমী পাঁচ দিন ধুমধাম করে চলে পুজো। শঙ্কর শৈব হলেও শাক্ত, শৈব, বৈষ্ণব তিনটি মত মেনেই পুজো হয়। আগে এখানে পাঠা বলি দেওয়ার প্রথা ছিল, এখন চাল কুমড়ো সহ নিরামিষ বলি দেওয়া হয়। পুজো শেষ হলে বিসর্জনের দিন পুরনো কাঠামোকে রেখে দেবী প্রতিমাকে খালি নিরঞ্জন দেওয়া হয়। তবে পুজোর অন্যতম বিশেষত্ব দশমীর সন্ধ্যার আগে প্রতিমা বিসর্জন করতে হবে এবং এই রীতি আবহমান কাল ধরে চলছে।

“আনন্দময়ী মহামায়ার পদধ্বনি। অসীম ছন্দে বেজে উঠে রূপলোক ও রসলোকে নবভাবমাধুরীর সঞ্জীবন।” বাঙালির প্রাণের উৎসব দুর্গাপুজো সমাগত যেখানে ইতিহাস, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতি মিশেছে পুজোর ধর্মনিষ্ঠ আরাধনা ও বন্দনায়। এরকমই এক সার্বিক মেলবন্ধন শিবের কোঠার বনেদি বাড়ির পুজোয়। মন কেমনের দিন – শিউলি ফুল, কাশফুল, নীল আকাশ আর ঢাকের বাদ্যিতে পুজো এসে গেল আরেকবার। চারশো বছর ধরে সেই পুজোর সৌরভ বয়ে নিয়ে চলেছে যোধাবাই ও শঙ্করের নাম জড়িয়ে থাকা শিবের কোঠা।।

শংকরের শিবের কোঠার পুজো #শংকরের শিবের কোঠার পুজো

About Post Author