Home » দোল উৎসব : রাঙিয়ে দিয়ে যাও

দোল উৎসব : রাঙিয়ে দিয়ে যাও

Oplus_131072

পুরন্দর চক্রবর্তী,সময় কলকাতা , ৩ মার্চ : পাতা ঝরার দিন,  রাঙিয়ে দিয়ে যাওয়ার দিন, বসন্তের দিন।দোল পূর্ণিমা মানেই বাঙালীর কাছে বসন্ত উৎসব। প্রতি বছর বাঙালীরা এই দিনটিতে রং খেলায় আনন্দ উৎসবে মেতে ওঠে। দোলযাত্রা যেন বসন্তের আহ্বান। এই দোল উৎসব যেন জানিয়ে দেয় শীত বিদায় নিয়েছে,এসেছে বসন্তের ছোঁয়া। এই দিনটিতে বাঙালিরা একে অপরকে রঙে রাঙিয়ে দেয়। বাতাসে যেন একটাই সুর ভেসে ওঠে “রাঙিয়ে দিয়ে যাও যাও যাও গো এবার যাবার আগে” ।এই বসন্ত উৎসবকে স্বাগত জানাতে প্রকৃতি যেন এক বর্ণিল সাজে সেজে ওঠে। দোল পূর্ণিমা ভিন্ন নামে অভিহিত। কোথাও এই দোল পূর্ণিমাকে দোল যাত্রা বলে। মহাপ্রভু শ্রী চৈতন্যের জন্ম হয়েছিল এই পূর্ণিমা তিথিতে,তাই দোল পূর্ণিমাকে গৌরী পূর্ণিমা বলা হয়। দোল পূর্ণিমার অনেক পৌরাণিক ঘটনা রয়েছে। এই তিথিতে বৃন্দাবনে আবির ও গুলাল নিয়ে শ্রী কৃষ্ণ,রাধা এবং তাঁর গোপীগনের সঙ্গে হোলি খেলেছিল। আর সেই ঘটনা থেকেই উৎপত্তি হয় দোল খেলার।

 

দোল পূর্ণিমার মূল আকর্ষণ আবির। এই দিনটি আবিরের রঙে রাঙিয়ে দেওয়ার দিন। এই দিনের পূজিত ঈশ্বর রাধা-কৃষ্ণ। বাঙালির দোল যাত্রাটি রাধা কৃষ্ণকে ঘিরেই। কিন্তু কেন এই দোলযাত্রা? কীভাবেই বা এই বিশেষ দিনটি পালন করা হয় আসুন তা জেনে নেওয়া যাক-

দোল শুধুমাত্র বাঙালিদের উৎসব না। সারা বিশ্বজুড়ে ভিন্ন ভিন্ন নামে দোল পূর্ণিমা পালন হয়। সারা বিশ্ব জুড়ে এই উৎসবটি হোলি নামে পরিচিত। কিন্তু বিশেষ করে এই উৎসবেই কেন রঙ খেলা হয় তার পেছনেও একটি কাহিনী আছে।
দোল পূর্ণিমাতে রঙ খেলার কারণ
দোল সাধারণত পূর্ণিমা তিথিতে পালন করা হয়।দোল এবং হোলি দুটি আলাদা অর্থবাহী, দুটির পৃথক আঙ্গিক হলেও কার্যত দুটি উৎসব একই উৎসবের রকমফের।হোলি কথাটি “হোলিকা”থেকে সৃষ্টি হয়েছে।হোলিকা ছিলেন মহর্ষি কর্শপ এবং দিতির ছেলে হিরণ্যকশিপুর বোন।আর হিরণ্যকশিপুরের ছেলে ছিল প্রহ্লাদ।প্রহ্লাদ অসুর বংশে জন্ম গ্রহণ করা সত্ত্বেও ছিলেন প্রভু বিষ্ণুর ভক্ত।এর জন্য তার পিতা তার ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন।কারণ সে প্রভু বিষ্ণুকে তাঁর বাবার ওপর স্থান দিয়েছিলেন।তাই তাঁর পিতা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন নিজের ছেলেকে হত্যা করবে।

Oplus_131072

হোলিকা দহন
প্রহ্লাদ ধার্মিক ছিলেন।তাই তাকে হত্যা করা সহজ ছিল না।কোনোভাবেই তাকে হত্যা করা যাচ্ছিল না।তাই হিরণ্যকশিপুর তার ছেলেকে পুড়িয়ে মারার নির্দেশ দেন।অন্যদিকে হোলিকা বর পেয়েছিল তার কোনোদিনও আগুনে ক্ষতি হবেনা।তাই প্রহ্লাদ কে হত্যা করার জন্য হোলিকা সিদ্ধান্ত নেয় যে সে প্রহ্লাদকে নিয়ে আগুনে ঝাঁপ দেবে।এরপর সে প্রহ্লাদকে কোলে নিয়ে একদিন আগুনে ঝাঁপ দেয়।।কিন্তু হোলিকার বর পাওয়া সত্ত্বেও সেদিন শেষ রক্ষা হয়নি।প্রহ্লাদ তো বিষ্ণুর আশীর্বাদে বেঁচে যায়।কিন্তু আগুনে ভস্ম হয়ে হোলিকা।সে তার বরের অপব্যবহার করায় আগুনে ঝাঁপ দেওয়ার সময় তার বর নষ্ট হয়ে যায় এবং সে পুড়ে ছাই হয়ে যায়।হোলিকার এই কাহিনী হোলিকা দহন নামে পরিচিত।

দোল পূর্ণিমা উৎসব পালন
দোলযাত্রা যেহেতু রঙের উৎসব,তাই এই উৎসবের প্রাণ কেন্দ্র আবির।এই দিন সকাল থেকেই আট থেকে আশি সবাই মেতে ওঠে আবির খেলায়।আগে আবির দিয়ে রং খেলার প্রচলন বেশি থাকলেও পরে আবিরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তরল রঙ।

শান্তিনিকেতনের দোল উৎসব
এই দিনটি শান্তিনিকেতনে বিশেষভাবে পালিত হয়।এই দিন সকাল থেকেই শান্তিনিকেতনে এই অদ্ভুত পরিবেশের সৃষ্টি হয়।ছোটো থেকে বড়ো সবাই এই দিন সকালে রাস্তায় প্রভাত ফেরি বার করে আবির খেলতে খেলতে “ওরে গৃহবাসী খোল দ্বার খোল লাগল যে দোল” গানটি গায়।এর সাথে নৃত্যের তালে তালে সারা আকাশ জুড়ে আবিরের রঙে রাঙিয়ে দেয়।এইদিনটি আসলেই যেন মনে হয় শান্তিনিকেতনের কোনায় কোনায় লুকিয়ে আছে সব আনন্দ।এই দিন সন্ধ্যাবেলা দোল পূর্ণিমাকে ঘিরে গৌরপ্রাঙ্গনে চলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাটকের পালা।

বৃন্দাবনের দোল উৎসব
মথুরা,নন্দগাঁও,বারসানা,বৃন্দাবনে ৪০ দিনের জন্য দোল উদযাপন করা হয়।ব্রিজ ধামের প্রত্যেকটি স্থানে দোল খেলার স্বাদ ভিন্ন।বৃন্দাবনের লোকজনদের মতে,কৃষ্ণ নন্দগাঁও থেকে বারসানা পর্যন্ত রাঁধার সঙ্গে হোলি খেলতে আসতেন এবং তাঁদেরকে জ্বালাতেন।বারসানার নারীরা লাঠি দিয়ে কৃষ্ণ এবং তার বন্ধুদের মজা করে আঘাত করতেন।বৃন্দাবনে বাঁকে বিহারী মন্দিরে বাইরের লোকেরা আনন্দের উৎসব হিসেবে হোলি উদযাপন করে।বৃন্দাবনের হোলি গুলালের সঙ্গে খেলা হয়।বৃন্দাবনের বাঁকে বিহারী মন্দিরের সামনে গেলে দেখা যাবে হাজার হাজার মানুষের ঢল।মন্দিরের ভেতরে প্রভু শ্রীকৃষ্ণের মূর্তিকে ঘিরে আবির খেলা হয়।

এভাবেই ধর্মে -কর্মে শুভকে আবাহন,  অশুভ বিনাশকারী আনন্দ উদযাপনের তিথি দোল উৎসব, রঙের উৎসব ।

About Post Author