Home » বাংলা সাহিত্যের দাদাচরিত্র – কালজয়ী দাদাদের গল্প

বাংলা সাহিত্যের দাদাচরিত্র – কালজয়ী দাদাদের গল্প

পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা,২৮ জুলাই : “দাদা” শব্দটির ব্যাপ্তি বৃহৎ। দাদা শব্দটি বাঙালির জীবনে জড়িয়ে আছে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ নিয়ে। দাদা শব্দটি নিছক সম্বোধনে আটকে না থেকে আদর, রাগ, অভিমান বিভিন্ন আঙ্গিকে আলাদা আলাদা তাৎপর্য নিয়ে আসে দাদা বলতে বাঙালির নতুন প্রজন্ম তো বটেই, বাংলার বাইরে ভারত জুড়েই বেশ কিছুদিন ধরেই দাদা শব্দটি বলতে একজনকেই বোঝায় – তিনি আর কেউ নয়, তিনি সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়।কিন্তু বাংলা সাহিত্যের কথা উঠলে পরে সাহিত্যের দাদারাও কালজয়ী। বাংলা সাহিত্যে লব্ধপ্রতিষ্ঠ লেখকদের সৃষ্টি অসংখ্য দাদাচরিত্র। বইয়ের পাতা থেকে বিভিন্ন দাদাচরিত্র বাঙালির আপনজন হয়ে উঠেছে। সাহিত্যে বিখ্যাত বিভিন্ন দাদাচরিত্র যারা, তাঁদের মধ্যে অতি বিখ্যাত হয়ে উঠেছেন বেশ কয়েকজন। এঁদের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য ফেলুদা, ঘনাদা, টেনিদা, ঋজুদা, ব্রজদা।  এই পাঁচজনকে নিয়ে আলোচনা করলেই দাদাচরিত্রের সাতকাহন শেষ হয়ে যায় না। তবুও এই কয়েকজন দাদা জনপ্রিয়তা, খ্যাতি এবং সাহিত্যিক দৃষ্টিকোন থেকে স্বতন্ত্র। বাংলা সাহিত্যে দাদার আসরে অন্যতম প্রধান পাঁচ দাদা হিসেবে এই মহারথীদের কথা সর্বাগ্রে আলোচ্য। কেন এই এই পাঁচজনের খ্যাতি  আলাদা মাত্রা বয়ে নিয়ে চলে?

প্রথমেই বলা যাক সত্যজিৎ রায়ের চরিত্র ফেলুদার কথা।ফেলুদার খ্যাতি প্রধানত রহস্যের জট ছাড়ানোয়। পাহাড়ে হোক বা পুরীর সমুদ্রতীরে হোক অথবা কলকাতার বুকে তোপসে ও জটায়ুকে সঙ্গে নিয়ে তিনি রহস্য ভেদ করে ফেলেন অবলীলায়। তাঁর কাহিনীর বুনোট অত্যন্ত জটিল নয় অথবা খুনখারাপির সংখ্যায় নগন্য। সাবলীল ভাষায় তোপসের মুখে ফেলুদার কাহিনী বাঙালি পাঠকদের অত্যন্ত প্ৰিয়। রহস্য, অ্যাডভেঞ্চার এবং ভ্রমণ সবই একযোগে হয় ফেলুদার কাহিনীর মধ্যে দিয়ে। ফেলুদার কথা বললে চলচ্চিত্রের মুখ হিসেবে প্রথমে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কথাই মনে পড়ে  কারণ ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ বা ‘সোনার কেল্লা’র মত চলচ্চিত্রে  বাঙালি আরও বেশি নিবিড় ও আত্মিক সম্পর্ক অনুভব করতে থাকে  ফেলুদার সঙ্গে।

এরপরেই আসে প্রেমেন্দ্র মিত্রের ঘনাদার কথা।ঘনাদা মুখে জগত-জয় করেন আর তাঁর বিশ্ব জয় হয় বনমালী নস্কর লেনে আড্ডা দিতে দিতে। ছোট ছোট বিষয় থেকে গল্প  বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ছবি তুলে ধরতে থাকে। বিজ্ঞান, ভূগোল, ইতিহাস মিশে যায় ঘনাদার বর্ণনায়।সবকিছু উপভোগ্য হয়ে ওঠে ঘনাদার কথকথায়।

এরপরে বলতে হয় গৌরকিশোর ঘোষের সৃষ্টি ব্রজদার কথা।রূপদর্শীর কলমে “গুলগল্প” হিসেবে খ্যাত কাহিনীর মধ্যে দিয়ে কাশ্মীর থেকে বিশ্বযুদ্ধ, পাহাড় থেকে জঙ্গলে পৌঁছে যান ব্রজদা। চলচ্চিত্রে  ব্রজদার চরিত্রায়ণ করেছিলেন মহানায়ক উত্তমকুমার।

বাংলা সাহিত্যে রোমান্টিক সাহিত্যের এক অনন্য  ঘরানা তুলে ধরা বুদ্ধদেব গুহর  জঙ্গলের প্রতি টান ছিল রক্তে। তাঁর প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকের জন্য লেখায় তিনি জঙ্গলের কথা বইয়ের পাতায় তুলে ধরতেন। ঋজু দার কাহিনীতেও জঙ্গলের ঘ্রান। সেখানে মানব – মানবীর সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে আলোচনা নেই। ঋজুদা কাহিনী জঙ্গল ও জঙ্গলের জীবন নিয়ে আখ্যান।

নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের টেনিদা নিশ্চিতভাবে কিশোর সাহিত্য হলেও  সব বয়সের পাঠক টেনিদার গল্পের স্বাদ নিয়ে থাকেন। টেনিদা ও তার তিন সঙ্গী ক্যাবলা, হাবুল সেন এবং প্যালারামের গল্প যুগে যুগে কিশোর কিশোরীদের ভীষণ প্ৰিয় তার প্রধান কারণ চারমূর্তির আখ্যানগুলি হাস্যরসে ভরপুর। চারমূর্তির অভিযানে -জঙ্গলে বা পাহাড়ে রহস্য ভেদ করার মধ্যেও অনাবিল হাসির খোরাক রয়েছে বেশ কিছু কাহিনীতে। কম্বল নিরুদ্দেশের মত উপন্যাস অবশ্যই কলকাতা ছাড়িয়ে জেলার।তবে ছোটগল্পে টেনিদা কলকাতার বুকে বিভিন্ন কীর্তি করেছে অথবা পটলডাঙ্গার চাটুজ্জেদের রোয়াকে বসে গল্পের ঝুড়ি উজাড় করেছে। আর এই গল্পমালা গত পঞ্চাশ- ষাট বছর ধরেই খাদ্য হয়েছে শিশুমনের।

প্রত্যেক দাদাচরিত্র নিশ্চিতভাবে উচ্চমানের সাহিত্য।পাঁচ দাদাচরিত্র ভীষণ জীবন্ত। তাঁরা বাঙালির রক্তমজ্জায় জড়িয়ে আছেন। তাঁদের মধ্যে যে বিষয়গুলি কমন সেগুলি হল তাঁরা সব বয়সের পাঠকের কাছে সমাদৃত, সাহিত্যগুণে সমৃদ্ধ কাহিনীগুলি সরস ভাষায় জ্ঞানের ভান্ডার বাড়াতে থাকে আর আড্ডার আসর থেকে ভ্রমণপিপাসু বাঙালিকে  টেনে নিয়ে যায় সমুদ্র, পাহাড়ে,জঙ্গলে। পাঁচ দাদাচরিত্র চিরায়ত ও শাশ্বত।

 

About Post Author