Home » যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্র : সায়নী, সৃজন নাকি অনির্বাণ?

যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্র : সায়নী, সৃজন নাকি অনির্বাণ?

পুরন্দর চক্রবর্তী ও চুমকী সূত্রধর, সময় কলকাতা,২৯ মে : যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্র বঙ্গের মধ্যে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি লোকসভা কেন্দ্র। সংসদীয় গণতন্ত্রে এবং লোকসভার নির্বাচনে বিভিন্ন সময়ে ইঙ্গিতপূর্ণ দিশা দিয়েছে যাদবপুর। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন খাতে রাজনৈতিক অভিমুখ ঘুরেছে। যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রের আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই বলতে হয় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক উত্থানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রের নাম।১৯৮৪ সালে এই কেন্দ্র থেকেই সিপিআইএমের তথা ভারতীয় রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রবাদপ্রতিম নেতা সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে হারিয়ে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংসদীয় নির্বাচনের হাত ধরে রাজনৈতিক উত্থান ঘটে।

মাঝেমাঝেই বিভিন্ন নেতা-নেত্রীর উত্থান -পতনের সঙ্গী হয়েছে যাদবপুর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরাজয়ের সাক্ষী থেকেছে যাদবপুর। মালিনী ভট্টাচার্যের কাছে তিনি হার মানেন। মালিনী ভট্টাচার্য আবার তৃণমূলের কৃষ্ণা বসুর কাছে পরাজয় স্বীকার করেন। ১৯৯৮ সালের লোকসভা ভোটে তৃণমূলের জন্মলগ্নে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে তৈরি হওয়া দলকে কৃষ্ণা বসুর মাধ্যমে সাংসদ উপহার দেয় যাদবপুর। তিনি আবার ১৯৯৯ সালে জিতলেও সিপিআইএমের সুজন চক্রবর্তীর কাছে হার মানেন। সুজন চক্রবর্তীও থিতু হতে পারেননি। ২০০৯ সালের লোকসভা ভোটে তিনি হেরে যান প্রখ্যাত গায়ক কবীর সুমনের কাছে। ২০১৯ সালে প্রথমবারের মতো সিপিআইএম এখানে তৃতীয় স্থানে চলে যায়। তৃণমূলের হয়ে মিমি জেতেন, বিজেপির অনুপম হাজরা দ্বিতীয় হন। তৃতীয় হলেও বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য এখানে ২১ শতাংশের বেশি ভোট পান যা ২০১৯ সালে বামেদের লোকসভা নির্বাচনে ছিল আশার ক্ষীণ জ্যোতি। ২০২৪ সালে তৃণমূল-রাম – বাম যুদ্ধে যাদবপুরে কে জয়ী হয়, সেদিকে বঙ্গের নজর থাকবেই। আবার নতুন কোনও রাজনৈতিক অভিমুখ কি দিতে চলেছে যাদবপুর? ভূত ও ভবিষ্যতের চর্চা ছেড়ে ফেরা যাক বর্তমানে। প্রথমেই যাওয়া যাক অন্য চব্বিশ পরগনার অনন্য হয়ে ওঠা লোকসভা কেন্দ্র বসিরহাটের সঙ্গে যাদবপুরের সাদৃশ্য বৈসাদৃশ্যের আলোচনায়। নইলে তারকাদের আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রের সঙ্গে বসিরহাট লোকসভা কেন্দ্রের বেশ কিছু বৈসাদৃশ্য থাকলেও লোকসভা ভোটের নিরিখে সাদৃশ্য কম নেই। আবার ভোটের প্রচারে সেই সাদৃশ্যের প্রভাব কিছু ক্ষেত্রে প্রবল কিছু ক্ষেত্রে অদৃশ্য। দুই কেন্দ্রেই ২০১৯ সালে তৃণমূলের প্রার্থী ছিলেন দুই তারকা অভিনেত্রী। মিমি ও নুসরাত দুজনেই জয়ী হয়েছিলেন। দুজনের বিরুদ্ধেই পাঁচ বছর ধরে সাংসদ হয়েও ডুমুরের ফুল হয়ে যাওয়ার অভিযোগ ছিল। মানুষের সমস্যা নিয়েও বিশেষ আলোকপাত করা বা রা কাড়ার সময় ছিল না তাঁদের। তাঁরা দূরের তারকা। বসিরহাটে প্রার্থী গায়েব থাকায় সমস্যা হতে পারত অথচ হয়নি। সন্দেশখালি ইস্যু নিত্য নতুন এবং চাঞ্চল্যকর মোড় নেওয়ায় নুসরত প্রসঙ্গ ভুলেই মেরে দেয় বসিরহাট লোকসভা কেন্দ্র। দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার লোকসভা কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত হলেও বৃহত্তর শহর কলকাতার একটা বেশ বড় অংশ যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত। যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রে মিমির শূন্যস্থান পূরণ করতে তৃণমূল কংগ্রেস আসরে নামিয়েছে সায়নী ঘোষকে। সায়নী পশ্চিম বর্ধমানের শিল্প শহর আসানসোলে বিধানসভা নির্বাচনে হেরে গেলেও রাজনীতির ময়দান থেকে উবে যাননি। তাঁকে বারবার দেখা গিয়েছে তৃণমূলের বিভিন্ন সভা-সমাবেশে। ফলে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুনজরে থেকেছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রের প্রচারে মিমিকে প্রার্থী হিসেবে চয়নে নিজেদের দোষ স্বীকার করে নিয়েছেন। বলেছেন, সায়নী এখানে থেকে দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করবে। তিনি এও বলেছেন, এখানে মানুষের দাবি আদায় করার জন্য এমন কাউকে চাই যে ‘কোমর কষে’ ঝগড়া করতে পারে।

মুখ্যমন্ত্রীর কথা মেনে বলতে হয় আগামী পাঁচ বছর জনগণের দাবি দাওয়ার প্রশ্নে দাঁতে দাঁত চেপে, কোমর কষে লড়তে হলে নির্বাচন জেতা অন্যতম প্রধান শর্ত। এখন প্রশ্ন হচ্ছে যাদবপুরের ভোটাররা যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী সায়নী ঘোষকে সেই সুযোগ দেবেন কী? তাঁর বিরুদ্ধে বিজেপি ও সিপিআইএমের যে দুজন ভোটের ময়দানে লড়ছেন, তাঁরা প্রখর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও রাজনৈতিক মেধাসম্পন্ন। তাঁরা বিজেপির অনির্বাণ গাঙ্গুলি বা সৃজন ভট্টাচার্য। এছাড়াও রয়েছেন আইএসএফ প্রার্থী নূর আলম খান। নুর আলম খানের এবারের নির্বাচনে সম্ভাবনা সম্পর্কে বলার আগে বলা ভালো তাঁরা এই কেন্দ্রে বিজয়ী না হলেও প্রচুর ভোট টানবেন। কারণ এখানের সাতটি কেন্দ্রের একটি ভাঙ্গড় যেখানে বিধায়ক আইএসএফের মুখ নওশাদ সিদ্দিকী। ফুরফুরা শরীফের অন্যতম ধর্মীয় নেতা আব্বাস সিদ্দিকীর হাত ধরে কার্যত পথ চলা শুরু হয়েছিল আইএসএফের। আব্বাস সিদ্দিকীকে দেখেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরাট সংখ্যক তরুণ রাজনীতির ময়দানে আসে। এ মুহূর্তে আইএসএফের বিধায়ক বলতে একমাত্র নওশাদ। তৃণমূল ও বিজেপির রমরমার যুগে তিনি স্বমহিমায় বিরাজ করছেন। তিনি ২০২১ সালে ১ লক্ষ ৯ হাজার ভোট পেয়েছিলেন ভাঙড়ে। তবে সেসময় তাদের ভোট সঙ্গী ছিল সিপিএম ও কংগ্রেস। তবুও ভাঙড়ে তারা তৃণমূলের ভোট বাক্সে থাবা বসাবেই একথা মোটের উপর নিশ্চিত।

যাদবপুর লোকসভার অন্তর্গত বাকি ছটি বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে রয়েছে যাদবপুর, টালিগঞ্জ, বারুইপুর পূর্ব ও বারুইপুর পশ্চিম, সোনারপুর উত্তর ও সোনারপুর দক্ষিণ। যাদবপুর টালিগঞ্জ এলাকায় আইএসএফের প্রভাব একেবারেই নেই। তাই আইএসএফের জয়ের সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। তবে যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছেন বাম ভোটাররা। ২০১৯ সালের এবং ২০২১ সালের ভোটে যাদবপুর বিধানসভা কেন্দ্রে বামেদের ফল অত্যন্ত ভালো হয়েছিল। ২০২১ সালের নির্বাচন বুঝিয়ে দেয়, বারুইপুর পশ্চিমে বিজেপির শক্তি প্রবল। ২০১৯ এবং ২০২১ সালের ভোটের পরিসংখ্যানের দিকে নজর রাখলে বোঝা যায় যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রের অধীনে প্রত্যেকটি বিধানসভায় তৃণমূলের শক্তি রয়েছে। বিজেপি, বাম বা আইএফএফ প্রতিটি দলের দুর্বলতা এখানেই। সবকটি বিধানসভা অঞ্চলে কোনও দলেরই পায়ের তলায় মাটি অত্যন্ত মজবুত নয়। তবে বাম প্রার্থী সৃজন ভট্টাচার্য তৃণমূলের ভোট মেশিনারির আগাম সন্ত্রাসের মোকাবিলায় ব্লু প্রিন্ট তৈরি করেছেন। বারুইপুর পূর্বের বিধায়ক বিভাস সর্দার এবং ভাঙড় তৎসহ দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের অত্যন্ত নেতা তথা ক্যানিং পূর্বের বিধায়ক শওকত মোল্লাকে নজর বন্দি করার জন্য ইলেকশন কমিশনের দ্বারস্থ হয়েছিলেন তিনি। সবচেয়ে বড় কথা, বামের ভোট ফিরিয়ে আনার জন্য সৃজন মুখ হয়ে উঠেছেন। শ্রীরামপুর কেন্দ্রে দিপ্সিতা বা দমদম কেন্দ্রে সুজন চক্রবর্তী, অথবা ঝাড়গ্রাম কেন্দ্রে সোনামণি মূর্মু টুডু যেভাবে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছেন, সেরকম একইভাবে সুস্পষ্টভাবে লাল ঝাণ্ডার অনুকূলে ভোট টানার ইঙ্গিত রাখছেন সৃজন। দেরিতে হলেও বেগতিক বিজেপি নেতৃত্ব বুঝেছে রামের ভোট আবার বামে ফিরতে পারে যা বঙ্গে বিজেপির খারাপ ফলের কারণ হয়ে উঠতে পারে। স্বয়ং নরেন্দ্র মোদি তৃণমূলের পাশাপাশি তাই বাম কংগ্রেসকেও বঙ্গের প্রচারে একটানা আক্রমণ করছেন। তবুও ইতিমধ্যেই প্রচারের সাড়া ফেলেছেন সৃজন। শিক্ষা-স্বাস্থ্য-খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থানের পাশাপাশি সৃজন সুমসৃণভাবে জনসংযোগ বাড়াচ্ছেন, বাড়িয়ে চলেছেন। হাওয়াই চটি পরে হাওয়া নিজেদের অনুকূলে আনতে পারেন কিনা সৃজন তা সময়ই বলবে।

অন্যদিকে, বিজেপির প্রার্থী অনির্বাণ গাঙ্গুলীও অত্যন্ত সুবক্তা। তাঁর রক্তের সঙ্গেও মিশে রয়েছে ঐতিহ্য, বিপ্লব এবং সাহিত্য। তিনি উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বংশধর। উপেন্দ্রনাথ ছিলেন শ্রী অরবিন্দের বৈপ্লবিক ও রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী। নির্বাসিতের আত্মকথার লেখক উপেন্দ্রনাথ পরবর্তী সময়ে হিন্দু মহাসভায় যোগদান করেন ও শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির খুব কাছাকাছি চলে আসেন। অনির্বাণ গাঙ্গুলীর পিতামহ দীনেশ গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন বিংশ শতকের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি। উচ্চশিক্ষিত অনির্বাণ গাঙ্গুলী হাতেগোনা বিজেপি প্রার্থীদের মধ্যে অন্যতম, যাদের প্রচারে মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা ও তার প্রতিকারের কথা উঠে আসে। তাঁর প্রচারে শহরে ও গ্রামে ভিন্ন ভিন্ন সমস্যার সমাধানের অঙ্গীকার রয়েছে। তিনি পরিশ্রুত পানীয় জলের কথা বলেন, বলেন মেট্রো রেল সম্প্রসারণের কথা। তিনি নির্ভয় গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও স্বচ্ছ পরিকাঠামোর কথা বলেন। তাঁর শিক্ষা ও বক্তব্য মননশীল মানুষের মস্তিষ্কে পৌঁছনোর উপাদান যোগায়, যেখানে রাজনৈতিক স্থিতাবস্তার স্বপ্নকে বাস্তব করার উল্লেখ থাকে। মুশকিল হল তাঁকে যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রে প্রার্থী করেছে বিজেপি, যে আসনে গাণিতিক হিসেবে পিছিয়ে রয়েছে বিজেপি। যাদবপুর ও টালিগঞ্জের এক বিরাট অংশের শিক্ষিত, বুদ্ধিজীবী মানুষের ভোট যেমন যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রে রয়েছে, ঠিক একইভাবে বিজেপির নীতি-আদর্শের অনুগামী ভোটার তুলনামূলকভাবে এখানে কম। এই দুটি বিধানসভা কেন্দ্রে কখনই বিজেপি সেভাবে দাঁত ফোটাতে পারেনি। এছাড়াও ভাঙড় সহ বিস্তীর্ণ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে রয়েছে সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক, যার মেরুকরণের প্রভাবে বিজেপি কিছু ভোট টানতে পারলেও সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় নিশ্চিত হওয়ার অবকাশ নেই অনির্বাণ গাঙ্গুলির। সব অঙ্কেই অনির্বাণ গাঙ্গুলির মত বাগ্মী, পণ্ডিত, সুবক্তার বর্তমান রাজনৈতিক ক্ষেত্র, এবারের লোকসভা ভোট,কাঁটায় ভরা।

স্বাভাবিকভাবেই আবার চলে আসে মিমি নুসরাতের কথা, যারা তারকা প্রার্থী হয়ে যাদবপুর-বসিরহাটে বাজিমাত করেছিলেন। বসিরহাটে সন্দেশখালির কাঁটা থাকলেও যাদবপুরে সায়নী ঘোষের পক্ষে হাওয়া প্রতিকূল নয়। ভোট কাটাকাটির অঙ্কে আইএসএফ তৃণমূলের অসুবিধার কারণ হতেই পারে কিন্তু সৃজনকে সামনে রেখে বাম ভোট রামে ফেরার প্রক্রিয়া অব্যাহত, যা সুবিধাও করে দিতে পারে তৃণমূলকে। যদিও ভুলে গেলে চলবে না, ২০১৯ সালের কথা। বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য ভালো ফল করেছিলেন এখানে। তাছাড়াও যাদবপুরের ঐতিহ্য রয়েছে রাজনীতিতে নতুন দিশা দেওয়ার। স্বাভাবিকভাবেই, যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রে বামেদের সম্ভাবনাও কোনওভাবেই খারিজ করা যায় না। তথাপি এগিয়ে আছেন সায়নী, কারণ তৃণমূলের অরূপ বিশ্বাস সহ প্রথম সারির নেতাদের প্রভাব রয়েছে এই কেন্দ্রে, রয়েছে সংখ্যালঘু ভোট ব্যাঙ্ক আর আছে তৃণমূলের মেশিনারি। তবুও বাম বিজেপির দুই প্রার্থী অঘটন ঘটাতে পারেন কিনা তার জন্য ৪ জুন পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে।।

আরও পড়ুন বসিরহাটে কে জিতবে? হাজি নুরুলের বিরুদ্ধে ঝড় তুলে রেখা পাত্র কতটা রেখাপাত করবেন?

About Post Author