পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা,২৯ জুন :”ঝড়ের কাছে রেখে গেলাম আমার ঠিকানা -আমি কাঁদলাম বহু হাসলাম” – ঝড় উঠলে অনেকের সবকিছু হারিয়ে যায়। কেউ হয়তো অপরের বিপর্যয় দেখে হাসে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন সন্দেশখালির ঝড় উঠবে দেশ জুড়ে । সন্দেশখালি উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাটের একটি এলাকা। রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, সন্দেশখালি বসিরহাট লোকসভা কেন্দ্রের একটি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত বিধানসভা কেন্দ্র। এখন প্রশ্ন বসিরহাট কেন্দ্রে কি বিজেপির ঝড় উঠবে? সন্দেশখালির পটভূমিকা ঝড় কি বয়ে নিয়ে আসবে? আগামী ১ জুন বসিরহাট লোকসভা কেন্দ্রের ভোটাররা স্থির করে দেবেন হাসি ফুটবে কার মুখে?
তৃণমূলের হাজি নুরুল ইসলাম, ভারতীয় জনতা পার্টির রেখা পাত্র ও ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টের মহম্মদ আখতার রহমান বিশ্বাস এবং সিপিআইএমের নিরাপদ সর্দার নির্বাচনী সমরে অবতীর্ণ। প্রশ্ন বসিরহাট হবে কার?
চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক বসিরহাট লোকসভা কেন্দ্রের পরিসংখ্যানের দিকে।২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল প্রার্থী নুসরাত জাহান ৭লক্ষ ৮২ হাজার ভোট পেয়ে সাড়ে তিন লক্ষ ভোটের বেশি ব্যবধানে বিজেপির সায়ন্তন বসুকে হারিয়ে জয়ী হয়েছিলেন । উল্লেখযোগ্য বিষয় এই কেন্দ্র বরাবর ১৯৬২ সাল থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত কংগ্রেসের আসন থাকলেও ১৯৭৭ সালে জয়ী হয় জনতা দল। এই কেন্দ্রে ১৯৮০ সালে প্রাক্তন সিপিআই সাংসদ ইন্দ্রজিৎ গুপ্তর হাত ধরে বামেরা প্রথমবার ক্ষমতায় আসে। ১৯৮৪ সালের জয়ী হয়েছিলেন ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত। সিপিআই ২০০৪ সাল পর্যন্ত একচেটিয়া এখানে বিজয়ী হয়ে এসেছে। ২০০৪ সালে অজয় চক্রবর্তী তৃণমূল কংগ্রেসের সুজিত বোসকে হারিয়ে দেন। ২০০৯ সালে সিপিআই এর মিথ ভেঙে দেন হাজী নুরুল ইসলাম। তিনি চারবারের সংসদ অজয় চক্রবর্তী কে ২০০৯ সালে ৬০ হাজার ভোটে হারিয়ে দেন। ২০১৪ সালে জয়ী হন তৃণমূলের সদ্যপ্রয়াত প্রাক্তন সাংসদ ইদ্রিস আলী। ২০১৯ সালেও নুসরাত জাহান এখান থেকে জয়ী হন। বিগত বিধানসভা ভোটে পরিসংখ্যানের ইতিহাসের দিকে নজর রাখার আগে বসিরহাটের ভূগোলে চোখ রাখা যাক।
ভৌগোলিক পটভূমিকার দিক থেকে বসিরহাট এমন একটি জায়গা যেখানে শহর বা পুরসভা, গ্রাম ও পঞ্চায়েত , নদী বা সমুদ্রের মোহনা, জঙ্গল রয়েছে। হিঙ্গলগঞ্জ ও সন্দেশখালির কিছু অংশকে বলা হয় উত্তর ২৪ পরগনার সুন্দরবন। পাশাপাশি রয়েছে নোনা জলভিত্তিক মৎস্য চাষ এবং অজস্র ভেড়ি যার ওপরে অনেকাংশেই দাঁড়িয়ে রয়েছে বসিরহাটের অর্থনীতি। নদীতে কুমির- কামট- জলদস্যু এবং জঙ্গলে সাপ ও বাঘ। সুন্দরবন ও সমুদ্র ঘেঁষা বসিরহাটের বিস্তীর্ণ অঞ্চল বারবার প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বিধ্বস্ত হয়েছে। আয়লা ও আম্ফানে বসিরহাটের ক্ষয়ক্ষতি ছিল রাজ্যে সর্বাধিক। এখানে পর্যটন শিল্প বিকশিত হয়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। রয়েছে টাকি ও সুন্দরবনের মত পর্যটন কেন্দ্র। সবমিলিয়ে বৈচিত্র্যের সমাহার বসিরহাট জুড়ে।
বসিরহাটের ভোটের ময়দানে তিনজন বিতর্কিত চরিত্রের নাম উল্লেখ না করলেই নয়। বাম আমলে শাসনের মজিদ মাস্টার হয়ে উঠেছিলেন অত্যন্ত বিতর্কিত। তাকে গ্রেফতার করার নিয়েও একদা শোরগোল পড়েছিল রাজ্য রাজনীতিতে। পরবর্তীতে বাবু মাস্টারের নাম বাম ও তৃণমূল রাজনীতিতে জড়িয়ে যাওয়ায় এবং বাবু মাস্টারের কার্যকলাপে বিতর্ক দানা বাঁধে। সর্বশেষ ও অধুনা সময়ের বিতর্কিত নাম শেখ শাহজাহানের। বাম আমলে উত্থান হলেও তৃণমূল আমলে তার রমরমা হওয়ায় তাঁকে নিয়ে অস্বস্তি বেড়েছে তৃণমূলের।

এছাড়াও ২০১৯ সালের এই কেন্দ্রে বিজয়ী প্রার্থী ও তৃণমূলের বিদায়ী সাংসদ নুসরাত জাহানের কথা উল্লেখ করা দরকার। তাঁর আলটপকা মন্তব্যের জন্য একাধিকবার বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়েছেন। তৃণমূল সাংসদকে এলাকায়ও দেখা যায় নি বিশেষ। পাঁচ বছর ধরে তাঁর সঙ্গে ভোটারদের কোনও যোগাযোগই ছিল না। সংসদ থেকেও যেন নেই আর এনিয়ে স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি দলীয় কর্মীরাও মুখর হয়েছেন।
তবে বসিরহাটে এবার ভোটের আগে ও ভোটের সময় প্রধান ইস্যু হয়ে ওঠে শেখ শাহজাহান।২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগে সন্দেশখালি দিয়ে উত্তাল হয়ে ওঠে রাজ্য রাজনীতি যার ঢেউ আছড়ে পড়ে রাজ্য ছাড়িয়ে সর্বভারতীয় রাজনীতিতে।অভিযোগ ওঠে,সন্দেশখালিতে তৃণমূল নেতা ও দুষ্কৃতিদের গাঁটবন্ধনে সাধারণ মানুষ ভূমি হারা হন, নির্যাতিতা হতে হয় অসংখ্য মহিলা কে। একে আগে গ্রেফতার করা হয় প্রধান তিন অভিযুক্ত উত্তম সর্দার, শিবু হাজরা ও শেখ শাজাহানকে। সন্দেশখালিতে শাহজাহান ইস্যুতে তৃণমূলকে বারবার আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছে। শাজাহান তৃণমূল সখ্যতার প্রসঙ্গ টেনে বলা হয়েছে তৃণমূল দুষ্কৃতী দমনে আদৌ কখনও চেষ্টা করে নি বরং তৃণমূলেরই অঙ্গুলি হেলনে জঙ্গলের রাজত্ব কায়েম হয়েছে সন্দেশখালিতে ।
লোকসভা ভোটের ঠিক আগে সন্দেশখালি নিয়ে যখন রাজ্য রাজনীতি উত্তাল তখন বিরোধীরা সন্দেশখালিকে শাসক দলের বিরুদ্ধে তাদের হাতিয়ার করে তোলে। বিরোধীরা ধারণা করতে থাকে সন্দেশখালি বিরোধী ভোটব্যাঙ্কে এবং বিরোধীদের ভোটের নৌকায় পাল তুলে দেবে এবং শাসক দলকে ভোটে পর্যুদস্ত করে বিরোধীরা তাদের মাটি ধরিয়ে দেবে । এরকম দোলাচলে ২০০৯ সালের বিজয়ের কান্ডারী ও প্রাক্তন সাংসদ হাজী নুরুল ইসলামকে কে নতুন করে প্রার্থী পদ দেয় তৃণমূল কংগ্রেস। আইএসএফের প্রার্থী ঘোষণা করে মহম্মদ শহিদুল ইসলাম মোল্লাকে । কিন্তু কয়েকদিনের প্রার্থী বদল করে আইএসএফ। আখতার রহমান বিশ্বাসকে প্রার্থী ঘোষণা করে আইএসএফ।তিনি শেষ পর্যন্ত মনোনয়নপত্র জমা দেন।
অতঃপর ভোটের রঙ্গমঞ্চে প্রবেশ করেন রেখা পাত্র। বিজেপির তরফে সন্দেশখালির নির্যাতিতা মহিলাদের মুখ রেখা পাত্রকে প্রার্থীপদ দেওয়ায় রীতিমত রাজনৈতিক মহলে শোরগোল পড়ে । তাঁকে ভোটে দাঁড় করানোর বিষয়ে কার্যত সিলমোহর দেন নরেন্দ্র মোদি। রেখা পাত্র নিজে নারী দিবসের প্রাক্কালে বারাসাতে নরেন্দ্র মোদির সভামঞ্চে উপস্থিত হয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন।
২০১৯ সালে লোকসভা ভোটে বঙ্গে ১৮ টি আসন পাওয়া বিজেপি বিগত কিছুদিন ধরেই নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করেছে। বসিরহাট তার ব্যাতিক্রম নয়। বসিরহাট লোকসভা কেন্দ্রে সন্দেশখালি থাকায় বিজেপি মনে করতে শুরু করে বসিরহাটে ভোটে তাদের জয়ের প্রবল সম্ভবনা রয়েছে। কিন্তু বাস্তব কি তাই? পরিসংখ্যান কি বলে ? রাজনৈতিক সমীকরণই বা কি বলে?
সন্দেশখালি লোকসভা কেন্দ্রের সভা কেন্দ্রের অধীনস্থ সাতটি বিধানসভা কেন্দ্র বাদুড়িয়া,হাড়োয়া,মিনাখাঁ, বসিরহাট উত্তর,বসিরহাট দক্ষিণ,সন্দেশখালি ও হিঙ্গলগঞ্জ।আগেই বলা হয়েছে, বসিরহাট লোকসভা কেন্দ্রের তৃণমূলের হয়ে নুসরাত জাহান ৭,৮২,০৭৮ ভোট পান। শতাংশের নিরিখে যা ছিল ৫৪.৫৬ ও ২০১৪ সালের তুলনায় এই ভোট ১৫.৯১ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। বিজেপির সায়ন্তন বসু পেয়েছিলেন ৪,৩১,৭০৯ ভোট যা ছিল ৩০.১২ শতাংশ। ১১.৭৬ ভোট বেড়েছিল বিজেপির।কংগ্রেসের কাজী আব্দুর রহিম পান ১,০৪,১৮৩ ভোট যা ছিল ৭.২৭ শতাংশ। তাদের ভোট ০.৭৫ কমে।
বাম প্রার্থী সিপিআইএর পল্লব সেনগুপ্ত ২০১৯ সালে ৬৮,৩১৬ ভোট পান যা ছিল ৪.৭৭ শতাংশ।বামেদের ভোট কমে ২৫.২৭ শতাংশ। ২০২৪ সালে তাদের হয়ে লড়ছেন একদা সন্দেশখালির সিপিআইএম বিধায়ক নিরাপদ সর্দার। তিনি আবার এবারের ভোটের সন্দেশখালি কান্ডের সময় বাম আন্দোলনের মুখ হয়ে ওঠেন এবং পুলিশ তাকে গ্রেফতার করায় তিনি আন্দোলনের অন্যতম প্রধান চরিত্রও হয়ে ওঠেন।
বিধানসভা ভিত্তিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় ২০২১ সালের ভোটে সাতটি বিধানসভা কেন্দ্রে জয়ী হয় তৃণমূল। বাদুড়িয়ায় তৃণমূলের টিকিটে জয়ী হন প্রাক্তন কংগ্রেস নেতা ও ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বসিরহাট কেন্দ্রে কংগ্রেস প্রার্থী থাকাআব্দুর রহিম কাজী। তিনি ৫১ শতাংশ ভোট পেয়ে নিকটতম বিজেপি প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে ৫৬ হাজার ভোটে জয়লাভ করেন।হাড়োয়া কেন্দ্রে তৃণমূলের হয়ে জয়ী হন এবার লোকসভা ভোটের তৃণমূলের প্রার্থী হাজী নুরুল ইসলাম। তিনি ৮১ হাজার ভোটে নিকটতম আইএসএফ প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে দেন।মিনাখায়ও তৃণমূল জয়ী হয়।তৃণমূলের ঊষা রানী মন্ডল জয়ী হন ৫৬ হাজার ভোটে।বসিরহাট উত্তর কেন্দ্রে তৃণমূল জয়ী হয় ৮৯ হাজার ভোটে।রফিকুল ইসলাম মণ্ডল তৃণমূল দলের হয়ে জয়ী হন।বসিরহাট দক্ষিন কেন্দ্রে তৃণমূলের হয়ে চব্বিশ হাজার ভোটে জয়ী হন ডক্টর সপ্তর্ষি ব্যানার্জি। হিঙ্গলগঞ্জে ২৫ হাজার ভোটে বিজেপি প্রার্থীকে হারিয়ে জয়ী হন তৃণমূলের দেবেশ মন্ডল।সন্দেশখালিতেজয়ী হন তৃণমূলের সুকুমার মাহাতো বিজেপির নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারান চল্লিশ হাজার ভোটে।অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল প্রার্থী নুসরাত জাহান ৭লক্ষ ৮২ হাজার ভোট পেয়ে সাড়ে তিন লক্ষ ভোটে জয়ী হয়েছিল। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বসিরহাটের অন্তর্গত সাতটি বিধানসভার মোট প্রাপ্ত ফলের নিরিখে তৃণমূলের ভোট বেড়ে দাঁড়ায় ৮ লাখ ২০ হাজার।
২০২৪ সালের ভোটে বসিরহাটের ঘটনা পরম্পরার সর্বশেষ অভিমুখ এবং ভোট বাক্সে কিভাবে তার প্রতিফলন ঘটাতে পারে তার দিকে নজর রাখা যাক। বসিরহাট লোকসভা ভোটে বারবার তুলে আনা হচ্ছে সন্দেশখালির কথা। সন্দেশখালিতে তৃণমূলের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ ছিল দুটি। শাহজাহান উত্তম বা শিবু হাজরাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল জমি দখল এবং নারী নির্যাতনের। আরও বিভিন্ন ক্ষোভ মানুষের মধ্যে জমা হয়েছিল যেগুলি কালক্রমে হারিয়ে যায় এবং প্রধান হয়ে ওঠে এই দুটি অভিযোগ। আশ্চর্যজনকভাবে বিজেপি ও তৃণমূল যথাক্রমে নারী নির্যাতনের অভিযোগ তোলা এবং নারী নির্যাতনের অভিযোগ খন্ডন করার মধ্যেই সন্দেশখালি আন্দোলনকে সীমাবদ্ধ করে। রাজনৈতিকভাবে তৃণমূলের বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্র ছোট হয়ে আসে। এখানেই বিজেপির রাজনৈতিক ব্যর্থতা এবং তৃণমূলের সাফল্য।
তৃণমূলের সেকেন্ড ইন কমান্ড অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বরাবরই বলছিলেন বলছিলেন, সন্দেশখালির নারী নির্যাতনের অভিযোগ সাজানো। এবং ভোটের ঠিক আগে একটি ভাইরাল হয়েছে স্টিং অপারেশনের ভিডিও। যাবতীয় আন্দোলনের গতি,অভিমুখ ও দিশা পাল্টে দেয় ভাইরাল ভিডিওটি । শুভেন্দু অধিকারী হয়ে ওঠেন এই ভাইরাল ভিডিওর অন্যতম প্রধান চরিত্র, কারণ তাঁর নাম সেখানে নেওয়া হয়। যেখানে যা বলা হয় তা সত্যি হলে তৃণমূলের বিরুদ্ধে অভিযোগের গুরুত্ব হ্রাস পাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা । কারণ,সেই ভিডিয়োতে সন্দেশখালি ২ মণ্ডলের সভাপতি গঙ্গাধর কয়াল দাবি করছেন যে, মহিলাদের ফুসলিয়ে তৃণমূল নেতাদের বিরুদ্ধে পুলিশে ধর্ষণের অভিযোগ করানো হয়েছে। আদতে কোনও ধর্ষণের ঘটনা ঘটেনি। আর এই কাজে টাকা ও মোবাইল ফোন দিয়ে সাহায্য করেছেন শুভেন্দু অধিকারী। তবে পরবর্তীতে গঙ্গাঝর সেই ভাইরাল ভিডিয়ো প্রসঙ্গে দাবি করেছিলেন, ভিডিয়োতে প্রযুক্তির সাহায্যে তাঁর ছবি এবং কণ্ঠস্বর বিকৃত করা হয়েছে।এছাড়াও ভোটের ঠিক আগে দরকারে খুনের নির্দেশ ছিল এমন বিজেপি নেতা-নেত্রীদের অডিও ভাইরাল হয়।অর্থাৎ একের পর এক ভিডিও এবং অডিও ভাইরাল হতে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিজেপি নেতাকে দেখা যায় ভিডিওতে , অনেক ক্ষেত্রে বিজেপি নেতাদের পারস্পরিক কথোপকথনে ব্যস্ত থাকতে শোনা যায়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিজেপি ভিডিও বা অডিওগুলি সত্যতা অস্বীকার করলেও মানুষের কাছে সন্দেশখালী নারী নির্যাতন সম্পর্কিত অভিযোগের প্রাবল্য ক্রমেই লঘু হয়ে আসতে শুরু করে। সাধারণ মানুষ সন্দিহান হতে শুরু করেন সন্দেশখালির নারী নির্যাতন সম্পর্কিত ঘটনা সম্পর্কে। পাশাপাশি যে ঘটনা অতি বাস্তবসম্মত হয়ে প্রধান অভিযোগের আকার নিতে পারত তা গৌণ হয়ে যায়। জমি কেন্দ্রিক আন্দোলন ও শাহজাহানদের অত্যাচার এবং তাদের মাফিয়ারাজ থেকে মানুষের নজর ঘুরে যায়। অর্থাৎ বামেদের অপারেশন বর্গার পরে বিলিবন্টন হয়ে যাওয়া জমি পুনরায় দখলের জন্য তৃণমূলের পোশাকে দুষ্কৃতিদের সাধারণ মানুষের ওপরে অত্যাচার কতটা ভয়াবহ ছিল তা বিজেপি আন্দোলনের প্রধান অভিমুখ হিসাবে টেনে আনতে ব্যর্থ হয়। রেখা পাত্রকে বিজেপি প্রার্থী করা হয় কারণ তিনি অভিযোগক্রমে নির্যাতিতা নারী। অথচ নারী নির্যাতনের অভিযোগ অনেক হালকা হয়ে যায় ভোটের আগে।অন্যদিকে,জমি সম্পর্কিত যে ভয়ংকর অভিযোগ উঠে আসছিল অর্থাৎ সাধারণ মানুষ জমি,বাড়ি, বিষয় সম্পত্তি হারিয়েছেন তৃণমূল আশ্রিত দুষ্কৃতিদের দাপটে,সেই অভিযোগকে সেভাবে তুলেই ধরেনি বিজেপি। তুলে ধরার চেষ্টাও করে নি।একই কথা প্রযোজ্য অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির ক্ষেত্রে। এখানেই সুবিধা পেতে থাকে তৃণমূল । এছাড়াও নদীবাঁধ নির্মাণ সংক্রান্ত রাজ্য সরকারের ব্যর্থতা, অনুন্নয়ন প্রভৃতি প্রশ্ন ধামাচাপা পড়ে যায়। ফলশ্রুতি, অসুস্থ হাজী নুরুল ইসলাম ভোটপ্রচারের মধ্যে আবার অসুস্থ হয়েও, ভোটে সেভাবে প্রচার না করতে পেরেও অত্যন্ত স্বস্তিজনক জায়গায় অবস্থান করছেন।
হাজি নুরুলকে জমি আন্দোলন ঘিরে ও সাধারণ মানুষের উপরে অত্যাচার ঘিরে তাঁকে প্রশ্নের জবাবদিহি করতে হয়নি। ভেড়ি দখল নিয়ে প্রশ্নের জবাবদিহি করতে হয়নি তাঁকে। একদা দেগঙ্গায় দাঙ্গার সঙ্গে আদৌ তার কোনও যোগসাজস ছিল কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে নি। কংক্রিট নদীবাঁধ নির্মাণ সংক্রান্ত প্রশ্নের সামনেও তাকে পড়তে হচ্ছে না। শুধুমাত্র নুসরাত মানুষের সঙ্গে মিশেছেন কিনা এবং সন্দেশখালিতে পিঠে খাওয়ানো হত কিনা এরমধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে গেছে বিরোধীরা। হাজী নুরুল ইসলাম এর পথের কাঁটা হতে পারত আইএসএফ। বিজেপির সুবিধা করে দিতে পারত তারাই। এছাড়া, ২০১১ সালের সেনসাস অনুযায়ী ৪৯ শতাংশ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের বাস বসিরহাট লোকসভা কেন্দ্রে। বিজেপি শুধুমাত্র একটি বিধানসভা কেন্দ্র সন্দেশখালির ক্ষমতাবলে বা জোরে বসিরহাট লোকসভা কেন্দ্র নিজেদের দখলে আনার ক্ষমতা ধরে না। হাড়োয়া ছাড়া আইএসএফ বসিরহাটের সর্বত্র সমান প্রভাব রাখতে পারবে না এবং সেখানের বিধায়কের নাম হাজি নুরুল ইসলাম। তারা তৃণমূলেরও সেই অর্থে ভোট কাটতে সক্ষম হবে না বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। বামেদের ভোট হয়তো বাড়তে পারে, তা আখেরে বিজেপির কোন লাভই এনে দেবে না বলাই বাহুল্য।
২০২৪ সালের বসিরহাট লোকসভা কেন্দ্রের ভোটে তৃণমূলের অসুবিধে একটাই। তৃণমূলের মেশিনারি অনেক দূর্বল হয়েছে। শাহজাহান তো নেই-ই সারিফুল, শাহনুর সহ একাধিক এমন নেতা ভোটের ময়দানে থেকেও নেই যারা বিগত কিছুদিন ধরে তৃণমূলের হয়ে “ভোট করাতেন। “তারা ভোটে কতটা তৎপর থাকবে বলা মুশকিল। এরকম অবস্থায় বিজেপি সুবিধা পেতেই পারত। এখন মুশকিল হয়েছে যে সন্দেশখালির ঝড় উঠবে আর কোথায়, বরং সন্দেশখালির ঘটনা যে সাজানো ও পূর্বপরিকল্পিত নয় তা বোঝাতে গিয়েই জেরবার হয়ে যাচ্ছে বিজেপি নেতৃত্ব। যাইহোক না কেন, নির্যাস একটাই- বসিরহাট লোকসভা ভোট কেন্দ্র হাজী নুরুলকে সাড়ে তিন লাখ না হলেও লক্ষাটিক ভোটের লিড এনে দেওয়ার সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। বিজেপির সম্ভাবনা ক্ষীণ থেকে আরও ক্ষীণ হয়ে চলেছে। হাজি নুরুল বলছেন, উত্তর ২৪ পরগনার তৃণমূলের সবচেয়ে সেফ সিটের নাম বসিরহাট।
আয়ালা, আম্ফান থেকে শুরু করে যে কোনও ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত বসিরহাটে যেসব প্রশ্ন ঝড় তুলতে পারত তার প্রচারে নিরুৎসাহী থেকে কেবলমাত্র নারী নির্যাতন সংক্রান্ত ইস্যুকে সামনে তুলে এনেছিলেন বিজেপি নেতারা।কালক্রমে সেই ইস্যুর সত্যতা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়ে যাওয়ায় এবং অন্য জ্বলন্ত ইসুগুলিকে বিজেপি ও অন্য বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি গুরুত্ব না দেওয়ায় হাজি নুরুল ইসলাম এখন সবুজ ঝড় তোলার স্বপ্ন দেখছেন।।


More Stories
ব্রাজিলের জনবহুল এলাকায় আচমকাই ভেঙে পড়ল যাত্রীবাহী বিমান, পাইলট-সহ বিমানের ৬২ জন যাত্রীর মৃত্যু
বারাসাতে মেট্রো রেল নিয়ে সংসদে মুখর কাকলি ঘোষ দস্তিদার ঠিক কী বললেন?
অধীর চৌধুরী নিজে ডুবলেন, ইন্ডিয়া জোটকে ডোবালেন, বাঁচালেন এনডিএ ও বঙ্গ বিজেপিকে