দীপ সেন ও পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা : একেবারেই কাম্য ছিল না তবুও আশঙ্কা অবশেষে সত্যি হল। বুধবার রাতে পুলিশ-আয়োজক সংঘাতে অশান্ত হয়ে উঠল কালীপুজোর বারাসাত। কালীপুজোয় পুলিশের ব্যারিকেড ও রোড ম্যাপ নিয়ে ক্ষোভে ফুঁসছিলেন বেশ কিছু পুজোর আয়োজক। সেই ক্ষোভের আগুনে ঘৃতাহুতি পড়ল বুধবার রাতে বারাসাত ১১ নম্বর রেলগেট সংলগ্ন ইউনাইটেড ক্লাবের সামনে।ক্ষোভ-বিক্ষোভ থেকে পুলিশের হাতে ক্লাব সদস্য আটক -বাকি থাকল না কিছুই।
২০২৫ সালের কালী পুজো সংগঠন করা এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বারাসাতের কালীপুজোর আয়োজকদের ক্ষোভ ক্রমেই দানা বাঁধছিল। প্রতিবছর এখানে পুলিশকে সুষ্ঠু হাতে কালীপুজো নিয়ন্ত্রণ করতেই দেখা গিয়েছে। এবার সেই কালীপুজোর আয়োজন ও পুলিশের ‘অতি- সক্রিয়তা’ নিয়ে আয়োজকরা কিছুটা বেসুরো। বারাসাতের ঐতিহ্যশালী কালীপূজোয় অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটল অবশেষে বারাসাতে ১১ নম্বর রেলগেট লাগোয়া হরিহরপুর ইউনাইটেড ক্লাবে। এবার বুধবার রাত শেষ হতে না হতেই সরাসরি সম্মুখ সমরে জড়িয়ে পড়ল ক্লাব কর্তৃপক্ষ ও জেলা পুলিশ। পুজোর বিশৃঙ্খলা রুখতে গিয়ে বিশৃঙ্খলাএতটাই চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছল যে পুলিশকে ক্লাবের সভ্য সদস্যদের আটক করে নিয়ে যেতে হল বারাসাত থানায়। বুধবার সন্ধ্যের কিছু সময় পর থেকে ইউনাইটেড ক্লাব ও পুলিশের মধ্যে বিবাদের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল। ক্লাব কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করছিল, পুলিশ তাদের পুজো প্যান্ডেলের দিকে কাউকে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না।তাদের প্রশ্ন তাহলে পুজোর অনুমতি দেওয়া হল কেন? তারাও ক্ষুব্ধ কন্ঠে পুলিশ প্রশাসনকে এও জানায়, তাদের পুজো এর চেয়ে বন্ধ রাখা ভালো। তারপরেই ক্ষোভে ফেটে পড়ে ১১ নম্বর রেলগেট সংলগ্ন ইউনাইটেড ক্লাবের সভ্য সদস্যরা। উত্তেজনা ধীরে ধীরে তীব্র আকার নেয় যা দমন করতে পুলিশকে বেগ পেতে হয়। পুলিশকে সদস্যদের ক্ষোভ প্রশমনের নামে টানতে টানতে পুলিশ ভ্যানে তুলতে দেখা যায়। উল্লেখ্য, বারাসাতের বিভিন্ন বড় কালীপুজোর আয়োজকরা পুজো শুরুর পর থেকেই বলছিলেন, বারাসাত জেলা পুলিশের অতি সক্রিয়তায় বিভিন্ন পূজা মন্ডপে মানুষ ঢুকতে পারছেন না। বারাসাতের বিভিন্ন বড় কালীপুজোর আয়োজকরা বলছিলেন, এবারে পুজো ভালোয় ভালোয় মিটলে হয়। কালীপুজো দর্শন করার জন্য চারদিনের পুলিশ অনুমতি বা পারমিশন ছিল। কিন্তু অভিযোগ ছিল, পুলিশ ভিড় আটকাতে বিভিন্ন রাস্তা এমনভাবে আটকে রেখেছে যার ফলে দর্শনার্থী ও সাধারন মানুষ উভয়েরই অসুবিধা হচ্ছে। সাধারণ মানুষ অনেক ক্ষেত্রেই বাড়ি ফিরতে পারছেন না তাদের চিরাচরিত বা একমাত্র রাস্তা দিয়ে। চিকিৎসা পরিষেবা পেতে অসুবিধা হচ্ছে এরকম অভিযোগ ছিল। তবে আয়োজকদের অভিযোগ ছিল অন্য মাত্রার। অনেক পুজো আয়োজক গত কয়েকদিন ধরেই বলে চলেছেন, পুলিশি ব্যারিকেডের ফলে তাঁদের পুজোয় দর্শকরা ঢুকতে পারছেন না। রেজিমেন্ট এবং ব্যায়াম সমিতি ইতিপূর্বেই অভিযোগ তুলেছিল, হেলা বটতলা ও কলোনি মোড়ে এমন করে পুলিশি ঘেরাটোপ সাজিয়েছে যে, ক্লাব গুলির লক্ষ লক্ষ টাকার পুজোর আয়োজন কার্যত বৃথা হয়ে যাচ্ছে। আর এমন অভিযোগ চূড়ান্ত মাত্রায় দেখা দেয় হরিহরপুর ইউনাইটেড ক্লাবে।
উল্লেখ্য, ডাকবাংলো ও কলোনি মোড় এর মাঝামাঝি ১২ নম্বর জাতীয় সড়ক ও কৃষ্ণনগর রোডের ওপরে ১১ নম্বর রেলগেট থেকে এই ক্লাব ঢিলছোঁড়া দূরত্বে অবস্থিত। এই পূজোর একদিকে সন্ধানী ও অন্যদিকে তরুচ্ছায়া ক্লাবের পুজো যেগুলি জাতীয় সড়ক সংলগ্ন। ফলে ক্রাউড ম্যানেজমেন্ট করতে গিয়ে পুলিশকে বেগ পেতে হচ্ছিল। পুলিশের চ্যালেঞ্জ আরও বেড়ে যাওয়ার কারণ ইউনাইটেড ক্লাবের পাশ দিয়ে সোজা রাস্তা ধরে কিছু দূরে গেলেই আমরা সবাই ক্লাবের পুজোর মণ্ডপ দ্বারকা নগরী যা এবারের কালীপুজোয় বারাসাতে সবচেয়ে বেশি লোক টানছে। পুলিশ তাদের ক্রাউড ম্যানেজমেন্ট করার ও ভিড় কমানোর সবচেয়ে সহজ উপায়টি বেছে নেয় ইউনাইটেড ক্লাবের পাশ দিয়ে যাতায়াতের রাস্তা বন্ধ করে। ফলশ্রুতি, এলাকার স্থানীয় মানুষ যেমন বাড়ি ফিরতে পারছিলেন না, তেমনই দর্শনার্থীরা ইউনাইটেড ক্লাবে ঢুকতে পারছিলেন না। পুলিশের ভিড় কমানোর সহজ ও সস্তা উপায় জটিলতা সৃষ্টি করে এবং ইউনাইটেড ক্লাবের সভ্য সদস্যদের মধ্যে অতিমাত্রায় ক্ষোভের জন্ম দেয়। শুরু হয় বৃহত্তর ক্ষোভ বিক্ষোভ। আলো বন্ধ করে পুজো বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ইউনাইটেড ক্লাব কর্তৃপক্ষ। সরাসরি পুলিশের সামনে বিক্ষোভ দেখাতে যাওয়ায় উত্তেজনা বাড়ে। পুলিশের সঙ্গে কার্যত সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হয় ক্লাব সদস্যরা । কিন্তু পুলিশের “অতিসক্রিয়তায়” রণে ভঙ্গ দিতে হয় তাদের। আটক করা হয় তাদের বেশ কয়েকজনকে। পুলিশ ভ্যানে আশ্রয় লাভ করে ইউনাইটেড ক্লাবের একাধিক সদস্য। ঘটনাস্থলে পুলিশের বিরাট বাহিনী এলেও উত্তেজনার পারদ নামতে সময় নেয়।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত বারাসাত জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অতীশ বিশ্বাস এ প্রসঙ্গে জানান, বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। পুলিশ সুষ্ঠ হাতে পুজো আয়োজনের জন্য যা যা প্রয়োজন মনে করেছে তাই করেছে। ইউনাইটেড ক্লাবের পুজো যেন বন্ধ না থাকে তাও দেখা হচ্ছে বলে তিনি জানান। অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের বক্তব্য পুলিশ সময় ও পরিস্থিতি অনুযায়ী তাদের দায়িত্ব পালন করছে। মানুষের সুবিধার কথা ভেবেই পুলিশ তাদের দায়িত্ব পালন করছে বলেও জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার।
এতদসত্ত্বেও জটিলতা যেন কমছে না। সবমিলিয়ে, ২০২৫ সালের কালীপুজোয় পুলিশের অতি তৎপরতা ঘিরে মানুষ এবছর এযাবৎ হতাশ ও বিরক্ত। সাধারণ দর্শনার্থীরা বলছেন, অনেক কালীপুজোতেই তারা প্রবেশ করতে পারছেন না। অন্যদিকে,শুধু ইউনাইটেড ক্লাব নয়, অনেক ক্লাব কর্তৃপক্ষই সরাসরি এবারের কালীপুজোতে পুলিশি ভূমিকাতে যারপরনাই অসন্তুষ্ট। অনেক আয়োজক সরাসরি বলেই দিচ্ছেন কালীপুজোকেন্দ্রিক তাদের দীর্ঘদিনের আয়োজন ও পরিশ্রমে জল ঢালার কাজ করছে পুলিশ। তথাপি বুধবার রাত পর্যন্ত সরাসরি সংঘাত বাঁধেনি। বাকি ছিল পুজো আয়োজক ও পুলিশের মধ্যে সরাসরি সংঘাত। ভয় ছিল ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটলেই সংঘাত বাঁধবে।দুর্ঘটনা না ঘটলেও বুধবার রাতে সংঘাত পর্ব সারা।।
More Stories
গ্রেফতার কলকাতা পুরসভার দুই কাউন্সিলর
আরজিকর কাণ্ডের আইনি ফাঁসে রচনা
ঋতব্রত সন্দীপনের বহিষ্কারের চিঠিতে কী কী লেখা হয়েছে?