পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা , ৯ জুলাই : প্রচলিত প্রবাদ -মারি তো গন্ডার,লুটি তো ভান্ডার। তবে বোকা বানিয়ে, ধোঁকা দিয়ে ভান্ডার লুট করা সহজ নয়। ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন ব্যবসায়ী গৌরব শ্রীবাস্তব অবশ্য এই গৌরবের অধিকারী হতে পেরেছিলেন বলেই অভিযোগ উঠেছে! মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট সেজে তিনি বোকা বানান ইন্দোনেশিয়ার শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাকে। তাও যাকে তাকে নয়, ইন্দোনেশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রী যিনি এখন সেই দেশের প্রেসিডেন্ট- স্বয়ং তাঁকে বোকা বানাতে সক্ষম হয়েছিলেন গৌরব। গন্ডার মেরে ভান্ডার লোড করার যে পরিকল্পনা তিনি করেছিলেন সেক্ষেত্রে অনেকটাই সফল তিনি। অভিযোগ, তিনি ভান্ডার কিছুটা লুট-ও করেছিলেন বোকা বানিয়ে ধোঁকা দিয়ে।অভিযোগ, কোটি কোটি টাকার চুক্তি করার কথা বলে নিজের একাউন্টে মোটা অংকের টাকা এনেছিলেন গৌরব। স্বাভাবিকভাবেই ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন ব্যবসায়ী গৌরব শ্রীবাস্তবের নাম ছড়িয়ে পড়েছে ইন্দোনেশিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোকে প্রতারণা করার অভিযোগে। অভিযোগ অনুযায়ী নিজের প্রচুর আর্থিক ফায়দা তিনি করতে পেরেছেন যদিও তার বিরুদ্ধে তদন্ত জারি থাকলেও তাঁর বিরুদ্ধে এখনো কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়নি। প্রশ্ন, পরিচয় হওয়া হওয়া সত্ত্বেও কিভাবে প্রেসিডেন্ট কে বোকা বানালেন গৌরব?
কে এই একজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যবসায়ী গৌরব যিনি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ (CIA)-এর নন-অফিসিয়াল এজেন্ট সেজে ইন্দোনেশিয়ায় কোটি কোটি ডলারের প্রতিরক্ষা চুক্তি হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টার জন্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে চর্চায় ! ঠিক কী কী অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে? জানা গিয়েছে, তিনি নিজেকে মার্কিন গোয়েন্দা বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলে পরিচয় দিয়ে ইন্দোনেশিয়ার শীর্ষ রাজনীতিবিদদের সাথে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলেন। অর্গানাইজড ক্রাইম অ্যান্ড করাপশন রিপোর্টিং প্রজেক্ট (OCCRP) এবং ইন্দোনেশিয়ার সংবাদমাধ্যম ‘টেম্পো’-এর যৌথ অনুসন্ধানে তাঁর এই জালিয়াতি সামনে আসে। প্রতিরক্ষা চুক্তি সম্পাদন করার কথা বলে গৌরব শ্রীবাস্তব ২০২০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে তৎকালীন ইন্দোনেশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী (বর্তমান প্রেসিডেন্ট) প্রাবোও সুবিয়ান্তোর সাথে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি করেন। তিনি সিআইএ কর্মকর্তা পরিচয়ে প্রায় ১,৩৯০ কোটি (১৩.৯ বিলিয়ন) ডলারের সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের চুক্তি সম্পাদনের চেষ্টা করেছিলেন। গৌরব ও তাঁর প্রাক্তন ব্যবসায়িক অংশীদার নিলস ট্রাস্টের মধ্যকার আইনি বিরোধ ও আর্থিক জালিয়াতির অভিযোগের প্রেক্ষিতে ক্যালিফোর্নিয়া এবং নিউইয়র্কের আদালতে মামলা দায়ের হয়। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক তদন্তকারী সংস্থার রিপোর্টে তাঁর এই ভুয়ো সিআইএ এজেন্ট পরিচয় ও জালিয়াতির বিষয়টি ফাঁস হয়।
গৌরব শ্রীবাস্তব ইন্দোনেশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিরক্ষা কোম্পানির সাথে মোট পাঁচটি প্রাথমিক প্রতিরক্ষা চুক্তির কথা বলেছিলেন । এগুলির মধ্যে প্রধান চুক্তি ছিল যুদ্ধবিমান সংক্রান্ত ৩৬টি যেখানে F-15 ফাইটার জেট সরবরাহ করার চুক্তি সম্পাদন করার কথা বলেন তিনি । এছাড়াও UH-60 ব্ল্যাক হক (Black Hawk) হেলিকপ্টার ক্রয়, C-130 ট্রান্সপোর্ট এয়ারক্রাফট বা পরিবহন বিমান সরবরাহ এবং সর্বোপরি, ইন্দোনেশিয়ার জন্য একটি সামরিক কমান্ড ও কন্ট্রোল সেন্টার (Military Command and Control Centre) স্থাপন করার চুক্তি স্থির করেন তিনি।
সত্যি কি গৌরব শ্রীবাস্তব বড় ব্যবসায়ী নাকি আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী কোনো নাম! কীকরে ইন্দোনেশিয়ার শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাকে চাতুরিতে বোকা বানালেন তিনি!
দ্য অর্গানাইজড ক্রাইম অ্যান্ড করাপশন রিপোর্টিং প্রজেক্ট (OCCRP) এবং ইন্দোনেশিয়ার সংবাদমাধ্যম ‘টেম্পো’-এর যৌথ তদন্তে জানা যায় যে, গৌরব শ্রীবাস্তব কোন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী নন এবং এই প্রস্তাবিত চুক্তিগুলো কখনোই চূড়ান্ত হয়নি এবং গৌরব শ্রীবাস্তব যে কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে এগুলো করছিলেন সেগুলো আদতে ‘শেল কোম্পানি’ (shell companies) ছিল । করফাঁকির দায়ে এই কোম্পানিগুলির রেজিস্ট্রেশনও বাতিল হয়ে যায়।পরবর্তীতে মার্কিন সরকার ইন্দোনেশিয়ার কাছে যুদ্ধবিমান বিক্রির অনুমোদন দিলেও, সেই আনুষ্ঠানিক চুক্তিতে গৌরব শ্রীবাস্তবের কোনো কোম্পানির নাম ছিল না। তাহলে, গৌরবের লাভ কী হয়েছে?
গৌরব শ্রীবাস্তব সরাসরি সরকারের টাকা না হাতিয়ে, প্রেসিডেন্ট সুবিয়ান্তোর ছোট ভাই হাশিম জোজোহাদিকুসুমোর মালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ‘আরসারি গ্রুপ’ (Arsari Group)-এর সঙ্গে ব্যবসায়িক প্রতারণা করেন। সিআইএ-র একটি গোপন অভিযানের কথা বলে গৌরব তাঁর ব্যবসায়িক অংশীদারের কাছ থেকে আরসারি গ্রুপকে ৫১ মিলিয়ন ডলার ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করান।এরপর তিনি চাতুর্যের সাথে আরসারি গ্রুপকে বোঝাতে সক্ষম হন এবং সেই ঋণের প্রায় অর্ধেক টাকা (২৫ মিলিয়ন ডলার) নিজের অ্যাকাউন্টে ঘুরিয়ে নেন।এই হাতিয়ে নেওয়া ২৫ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ২১৫ কোটি টাকা) দিয়ে তিনি লস অ্যাঞ্জেলেসে নিজের জন্য একটি বিলাসবহুল প্রাসাদ কেনেন।বর্তমান পরিস্থিতিবর্তমানে ইন্দোনেশিয়ার আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণ কেন্দ্র ও মানি লন্ডারিং কর্তৃপক্ষ এই সন্দেহজনক লেনদেন ও অর্থপাচারের বিষয়টি তদন্ত করছে। অবশ্য গৌরব শ্রীবাস্তব তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা এই সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করেছেন এবং অডিও রেকর্ডগুলোকে ‘বানানো’ বলে দাবি করেছেন।
কী করে ইন্দোনেশিয়ার প্রতি প্রাক্তন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী তথা বর্তমান প্রেসিডেন্টের বিশ্বাস অর্জন করলেন “মিস্টার জি” নামে পরিচিত গৌরব শ্রীবাস্তব ?
আন্তর্জাতিক অপরাধ ও দুর্নীতি রিপোর্টিং প্রজেক্ট (OCCRP) এবং ইন্দোনেশীয় সংবাদমাধ্যম ‘টেম্পো’ (Tempo)-র সাম্প্রতিক যৌথ তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে অত্যন্ত সুচতুরভাবে এই বিশ্বাস অর্জন করেছিলেন। তিনি নিজেকে আমেরিকার অত্যন্ত প্রভাবশালী সিআইএ অপারেটিভ হিসেবে দাবি করার পাশাপাশি ২০০২ সালের ইন্দোনেশিয়ার বালি বোমা হামলার তদন্তেও তার বিশেষ ভূমিকা ছিল বলে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ান। বলা হয় এই বিস্ফোরণে আল কায়দার হাত ছিল এবং তদন্তভার কার্যত আন্তর্জাতিক একাধিক সংস্থার হাতে ছিল । গৌরব শ্রীবাস্তব বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য বেশ কিছু আন্তর্জাতিক শীর্ষ নেতা নেত্রীর সঙ্গে নিজের ছবি ব্যবহার করতেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস এবং অন্যান্য শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তাদের সাথে তোলা ছবি দেখিয়ে নিজের বিশাল রাজনৈতিক প্রভাবের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করতেন। তবে পরবর্তীতে জানা যায়, কোনো সরকারি মিশন নয়, বরং সাধারণ রাজনৈতিক অনুদান ও বিভিন্ন পাবলিক নেটওয়ার্কিং ইভেন্টে যোগ দিয়ে তিনি এই ছবিগুলো তুলেছিলেন। এখানেই শেষ নয়, তাঁর দাবি ছিল মার্কিন ডেমোক্রেটিক পার্টিকে ১ মিলিয়ন ডলারের বেশি অনুদান দিয়ে ওয়াশিংটনের প্রভাবশালী মহলে নিজের যাতায়াত তৈরি করেন। তিনি প্রায়ই দাবি করতেন, তিনি চাইলেই হোয়াইট হাউস বা মার্কিন সিনেটরদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন।অসাধারণ বাগ্মীতা ও উচ্চপর্যায়ের মেলামেশার ক্ষমতা তাঁর অন্যতম গুণ। তদন্তে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, গৌরব অত্যন্ত আকর্ষক এবং বিশ্বাসযোগ্যভাবে কথা বলতে পারতেন। ন্যাটোর (NATO) সাবেক সুপ্রিম অ্যালাইড কমান্ডার জেনারেল ওয়েসলি ক্লার্কের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে তার যোগাযোগ ছিল, যা ইন্দোনেশিয়ার কর্মকর্তাদের কাছে তার বিশ্বাসযোগ্যতা আরও বাড়িয়ে দেয়। তিনি শুধু প্রেসিডেন্টের সাথেই নয়, বরং তার ভাই এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়ী হাশিম জোজোহাদিকুসুমোর সাথেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করেন। তিনি তার নিজের ব্যবসায়িক অংশীদারদের বিশ্বাস ভাঙিয়ে প্রায় ৫১ মিলিয়ন ডলারের একটি লোন প্রেসিডেন্টের ভাইয়ের কোম্পানির জন্য বরাদ্দ করার ব্যবস্থা করেছিলেন, যা এক প্রকার টোপ হিসেবে কাজ করেছিল। সবমিলিয়ে, চতুর ভাবে ফাঁদ পেতে ছিলেন গৌরব শ্রীবাস্তব যেখানে ফাঁক ছিল না !


More Stories
বিশ্বকাপে শিল্পময় লাতিন আমেরিকার শিবরাত্রির সলতে আর্জেন্টিনা
ট্রাম্পের নির্দেশে বিশ্বকাপে আমেরিকান ফুটবলারের রেড কার্ডের সাসপেনশন উঠে গেল
ইট ইস নাউ ওভার : নেইমার অবসর নিলেন