Home » অভিনেত্রী মহুয়া রায়চৌধুরীর মৃত্যুরহস্য : প্রশ্নই যেখানে উত্তর

অভিনেত্রী মহুয়া রায়চৌধুরীর মৃত্যুরহস্য : প্রশ্নই যেখানে উত্তর

পুরন্দর চক্রবর্তী,সময় কলকাতা  : চোখে নেমে আসছে অন্ধকার। এপারের সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। ঠিক তখন,”আমার গোলা রইল, ওকে দেখিস ” –  শিশুপুত্রকে নিয়ে নিজের দুশ্চিন্তার কথা নার্সিংহোমের বেডে জড়ানো স্বরে অন্তরঙ্গ বান্ধবী রত্না ঘোষালকে বলেছিলেন। মৃত্যুর কিছু আগে এটুকুই ছিল বাংলা সিনেমার অকালপ্রয়াত অভিনেত্রী মহুয়া রায় চৌধুরীর শেষকথা।  ৩৬ বছর কেটে গেছে। মহুয়া আজও থেকে গেছেন গুনমুগ্ধ দর্শকদের মনে। থেকে গেছে তাঁর মৃত্যু ঘিরে অসংখ্য প্রশ্ন। দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা না খুন – কী হয়েছিল ১৯৮৬ সালের জুলাই মাসের এক রাতে, যার জন্য মহুয়া রায় চৌধুরীর জীবন স্তব্ধ হয়ে যায় ?

আজও ফরেন্সিক রিপোর্ট অপ্রকাশিত। মহুয়ার মৃত্যুকালীন জবানবন্দী, পরিবার- পরিজনের বয়ান, তদন্ত -সবকিছু মিলিয়ে মহুয়া রায়চৌধুরীর মৃত্যু দুর্ঘটনার রূপলাভ করে । তবুও প্রশ্ন থেকেই গেছে ২৮ বছর বয়সী বাংলাখ্যাত অভিনেত্রীর রহস্যজনক মৃত্যু ঘিরে।একটি নয়, অসংখ্য প্রশ্ন আজও রয়ে গেছে মৃত্যু ঘিরে। কী কী প্রশ্ন আর প্রশ্নের কারণই বা কী ?

 

সেই যে দমদমের চোদ্দো বছরের শিপ্রা তরুণ মজুমদারের হাত ধরে ১৯৭২ শ্রীমান পৃথ্বীরাজের নবাগতা মহুয়া নামে পর্দায় দর্শকদের মন জয় করেছিলেন সেই মুগ্ধতা আর কমে নি।বাবা নর্তক হওয়ায় রক্তের মধ্যে ছিল নাচ। আর অভিনয়ে ছিলেন সাবলীল।উত্তম কুমারের  বাঘবন্দী খেলাতেও তিনি অভিনয় করেছিলেন।দাদার কীর্তি,অমৃত কুম্ভের সন্ধানে, সাহেব, অনুরাগের ছোঁয়া, সুবর্ণগোলক সহ অসংখ্য চলচ্চিত্রে ছিল মহুয়ার মাদকতা। বিয়ে করেছিলেন তিলক চক্রবর্তীকে, যিনি কিশোরকন্ঠী গায়ক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। মহুয়ার মৃত্যুতে প্রশ্ন তাঁদের সম্পর্কের অন্তিম সমীকরণ ঘিরে। প্রশ্ন মহুয়ার অসংযমী জীবন নিয়েও।

প্রেম করেই বিয়ে। উদ্দাম জীবনযাপন ছিল তরুণ দম্পতির। আকণ্ঠ মদ্যপান করতেন মহুয়া। জুলাই মাসের ১২ তারিখ রাতে অভিশপ্ত রাতে মদে প্রায় বেহুঁশ হয়ে বাড়ি ফেরেন মহুয়া। তারপরে সে রাতেই অগ্নিদগ্ধ হন তিনি। তেরো তারিখ মধ্যরাতেই তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় নার্সিংহোমে।ন-দশ দিনের লড়াই থেমে যায় যায় একসময়। উঠে আসে প্রশ্নমালা।

সেসময় পুলিশকে স্বামী তিলক চক্রবর্তী বলেছিলেন স্টোভ ফেটে মহুয়ার দুর্ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু পুলিশ প্রথমে আত্মহত্যা বা খুনের সম্ভাবনা প্রথমে উড়িয়ে দেয় নি কারণ আগেও একবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন সেদিনের নামী অভিনেত্রী। অত্যন্ত দ্রুতগতির বেপরোয়া বেহিসাবী জীবনযাত্রা যা মহুয়াকে জড়িয়ে ধরেছিল তার পেছনে ছিল বিষাদ ও মানসিক অবসাদ। মহুয়ার অবসাদের এবং জীবন যন্ত্রণা ঘিরে টলিউড পাড়ায় আজও শোনা যায় অসংখ্য গুঞ্জন যা তাঁর জন্ম থেকে মৃত্যুর বিভিন্ন অধ্যায়কে ঘিরে পাক খেতে থাকে।তার কতটা সত্যি তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও তার জীবন যন্ত্রনা ছিল খুব তীব্র।কাছ থেকে দেখা সহ-অভিনেত্রী দেবশ্রী রায় বলেন, মহুয়া জীবনে কখনও সুখী ছিল না।

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর যে প্রশ্নটি ঘুরপাক খেতে থাকা তা হ’ল তবে কি অভিনেত্রী  খুন হয়েছিলেন? খুন হওয়ার প্রশ্ন তদন্ত থেকেই উদ্ভব হয়। স্বামীর বক্তব্য ছিল কেরোসিনের স্টোভ ফেটে অগ্নিদগ্ধ হন মহুয়া।পরে তদন্তে দেখা যায়, স্টোভে আদৌ কেরোসিন ছিল না। স্টোভটিতে দুর্ঘটনার বিন্দুমাত্র ইঙ্গিত মেলে নি। অবিকৃত ছিল স্টোভ। আরও ধোঁয়াশা তৈরী করে মহুয়ার চোখের নিচে আঘাতের সম্ভাব্য চিহ্ন ও কালশিটে থাকায়। তিলকের পা ঘটনার দিন মচকে যায়। আরও একটি অস্বাভাবিক আর্থিক বিষয় সামনে আসে।মহুয়া, তাঁর স্বামী ও তাঁর কাছেই থাকা মহুয়ার বাবার যাবতীয় জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট ক্লোজ করে দেওয়া হয়। তাহলে কি কোথাও ছিল আর্থিক লাভ বুঝে নেওয়ার গোপন চক্রান্ত ? মনে রাখতে আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলা সিনেমায় অভিনেতা অভিনেত্রীদের মধ্যে অন্যতম  বেশি আয় ছিল মহুয়া রায় চৌধুরীর। এক সময়ে রেকর্ডপরিমান টাকা পেতে থাকেন তিনি। তাঁর মৃত্যুতে অভিনেত্রীর বাবা ও স্বামীর আর্থিক লাভের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়ার উপায় না থাকায় প্রশ্ন থেকেই যায়।২২ জুলাই ১৯৮৬ – মহুয়া শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। মহুয়ার মৃত্যু ঘিরে প্রহেলিকার আজও অবসান হয় নি।খুন, আত্মহত্যা না দুর্ঘটনা -এরকম একাধিক প্রশ্নের বেড়াজালে আজও প্রকৃত সত্য অজানা, জট রয়েই গেছে। প্রশ্ন থেকেই গেছে তবুও এক্ষেত্রে প্রশ্নরাই নিশ্চিতভাবে মৃত্যুর কারণ ও দিক সুস্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে ।।

About Post Author