সময় কলকাতা ডেস্ক, ১৪ জুলাই :২০২৩ সালের ১৪ জুলাই। ভারতীয় সময় দুপুর ২টো ৩৫ মিনিটে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে অবতরণের উদ্দেশ্যে চন্দ্রযান -৩ যাত্রা শুরু করবে। এই মিশনের লক্ষ্য কী? কেন চন্দ্রের দক্ষিণ অংশেই অবতরণ করবে চন্দ্রযান -৩? চাঁদের দক্ষিণ মেরু সূর্যের কাছ থেকে আড়াল থাকে বলে সেখানে তাপমাত্রা কম, এবং সেখানে জলের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন।এর আগেও ভারত দুবার চন্দ্র অভিযান চালায়। দুটি অভিযানই ব্যর্থ হয়।২০০৯ সালে ভারত প্রথম চন্দ্র অভিযান করে। অতঃপর ২০১৯ সালে ভারত চাঁদে এমন অভিযান চালিয়েছিল। কিন্তু মহাকাশযান উৎক্ষেপণ করা হলেও তা আছড়ে পরে চাঁদের মাটিতে।কিন্তু শেষ মুহূর্তে ২.১ কিলোমিটার উচ্চতায় থাকার সময় মহাকাশযানের সঙ্গে ইসরো-র নিয়ন্ত্রণ কক্ষের বেতার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।অবতরণের লক্ষ্যস্থলটি চাঁদের দক্ষিণ মেরু থেকে প্রয় ৬০০ কিলোমিটার বা ৩৭০ মাইল দূরে। এই অংশকে চাঁদের একটি আদি অংশ বলে মনে হয়। উল্লেখ্য সে বছরই ইজরায়েলের মহাকাশযানও ভেঙে পড়ে। পরে জাপানও ব্যর্থ হয় চন্দ্র অভিযানে ।কেবলমাত্র আমেরিকা, রাশিয়া ও চিনের চন্দ্রযান চন্দ্রের অনালোকিত অংশে নামতে সক্ষম হয়েছে ।চন্দ্রযান-৩-য়ের প্রাথমিক লক্ষ্য সেই একই। জলের উৎস সন্ধান। গবেষণা শুরু হলেও গবেষণা লব্ধ উড়ন্ত সাফল্যের ফল এখনও সামনে আসনি। ভারতের চন্দ্রযান-৩ সফল অবতরণ করলে এবার ভারত চন্দ্র অভিযানে সফল চতুর্থ দেশ হিসেবে ইতিহাসে নাম তুলবে। গবেষণার সাফল্য পরবর্তী বিষয়।

ঠিক কি হয়েছিল প্রথম দুটি চন্দ্র অভিযানে? প্রথম চন্দ্র অভিযান চন্দ্রযান-১ -এর বৈজ্ঞানিক লক্ষ্য ছিল চাঁদের রাসায়নিক, খনিজ ও ভূতত্ত্বিক মানচিত্র তৈরি করা। পৃথিবী থেকে সবচেয়ে বেশি দূরত্বে ডিপ স্পেসে ইসরোর প্রথম অভিযান ছিল চন্দ্রযান-১ অভিযান । প্রযুক্তিগত সার্থকতার লক্ষ্যে ২০০৮ সালের ৮ নভেম্বর পৃথিবী ছেড়ে যাত্রা শুরু করে চন্দ্রযান-১।ভারতের শ্রী-হরিকোটায় অবস্থিত সতীশ ধাওয়ান স্পেস সেন্টার থেকে উৎক্ষেপণ করা হয় মহাকাশযানটিকে। উৎক্ষেপণের জন্যে ব্যবহৃত হয় ইসরোর বিখ্যাত পোলার স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকল (পিএসএলভি)-এর কিছুটা পরিবর্তিত সংস্করণের একটি রকেট। ৯ নভেম্বর মহাকাশযানটি চাঁদের কক্ষপথে পৌঁছায়। ১৪ই নভেম্বর চন্দ্রযান থেকে মুন ইমপ্যাক্ট প্রোব (এমআইপি) নামের অংশটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই অংশটি বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়ে পড়ে চাঁদের বুকে। চন্দ্রযান- ২ ছিল ভারতের মহাকাশ সংস্থা ইসরো পরিচালিত সবচেয়ে জটিল মিশন। ভারত এর আগে যে রকেট পাঠিয়েছিল যেটি চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে জলের কণার অস্তিত্ব আবিষ্কার করেছিল। ভারতের তথা ইসরোর আশা ছিল চন্দ্রযান ২ অভিযান ভারতের গবেষণাকে বেশ কয়েক ধাপ এগিয়ে দেবে। ইসরো প্রধান কে শিভান এটি উৎক্ষেপণের পর জুলাই মাসে বলেন, “এটি একটি ঐতিহাসিক যাত্রার সূচনা মাত্র ।”
ল্যান্ডার বিক্রম চাঁদের মাটি বিশ্লেষণ করার জন্যে ২৭ কেজি ওজনের একটি মুন রোভার বহন করছিল।রোভারটির নামকরণ সংস্কৃত ভাষায় করা হয় ‘প্রজ্ঞান’। এটির ক্ষমতা ছিল ১৪ দিনে ল্যান্ডার থেকে ৫০০ মিটার দূরত্বে পরিভ্রমণ করে চন্দ্রপৃষ্ঠের তথ্য ও ছবি সংগ্রহ করে পৃথিবীতে পাঠানো। এই মিশনের উদ্দেশ্য ছিল চন্দ্রপৃষ্ঠে ভূমিকম্প, চাঁদে জলের উপস্থিতি ও অন্যান্য খনিজের সন্ধান করা। কিন্তু এই অভিযান ও বাস্তবিক অর্থে ব্যর্থ হয়। চন্দ্রযান ২ উৎক্ষেপণ করা হয় ২০১৯ সালের ২২ জুলাই। মহাকাশযানটি চাঁদের কক্ষপথে প্রবেশ করে ২০ আগস্ট।সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে চন্দ্রপৃষ্ঠ ছোঁয়ার ঠিক আগে আগে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া ভারতের মহাকাশযানটি চন্দ্রপৃষ্ঠে আছড়ে পড়েছিল বলে দাবি করে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। কেন বট ব্যর্থ হয়েছিল চন্দ্র যান ২-এর সফল অবতরণ?জানা গিয়েছে,যখন চূড়ান্ত মুহূর্তের গণনা শুরু হয়, তখন যানটি সেকেন্ডে ১৬৪০ মিটার বেগে এগিয়ে যাচ্ছিল। বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রথম দুই ধাপে মনে হচ্ছিল বিক্রম পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তৃতীয় ধাপ, যেটি হোভারিং স্টেজ নামে পরিচিত, সে সময় সমস্যার শুরু হয়।

ইসরোর সাবেক সদস্য অধ্যাপক রোড্ডাম নরসিমহা বলছেন, সমস্যাটি হয়তো যানটির মূল ইঞ্জিনে শুরু হয়। পর্দায় যানটির চলাচল দেখে সেটিই মনে হচ্ছে।”একটি বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা হতে পারে, যানটি অনেক বেশি দ্রুত গতিতে নামতে শুরু করেছিল। চাঁদে অবতরণ করার সময় প্রতি সেকেন্ডে দুই মিটার গতিবেগে এটি নামার কথা ছিল। কিন্তু চাঁদের মাধ্যাকর্ষণের কারণে এটা সম্ভবত আরো বেশি দ্রুত গতিতে নামছিল।জানা যায় প্রদক্ষিণকারী মহাকাশযান, যার নাম চন্দ্রযান-২, সেটির অরবিটর কিন্তু এখনও চাঁদকে ঘিরে ঘুরছে। একসময় সঠিক জানা যাবে যে বিক্রমের ভাগ্যে আসলে কী ঘটেছিল।
এবার উৎক্ষেপন হওয়ার পরে কী করতে চলেছে চন্দ্রযান-৩? শুক্রবার ১৭৯ কিলোমিটার উচ্চতায় পৃথিবীর চারপাশে একটি কক্ষপথে প্রবেশ করার পর, মহাকাশযানটি ধীরে ধীরে তার কক্ষপথ বিস্তার করার চেষ্টা করতে থেকে চাঁদের দিকে এগোতে থাকবে । চাঁদের নিকটবর্তী হয়ে চন্দ্রযান-৩ চাঁদের আকর্ষণের সঙ্গে সংগতি থেকে চন্দ্রপৃষ্ঠের কাছে যাবে। মহাকাশযানটি নিজের কক্ষপথ সংকুচিত করে তারপর এর মধ্যে থাকা ল্যান্ডার, যা এর ভিতরে রোভার বহন করছে- এই দুটো বিচ্ছিন্ন হবে। অতঃপর ল্যান্ডার চাঁদের পৃষ্ঠে অবতরণ করবে। উৎক্ষেপণ থেকে অবতরণ পর্যন্ত সময় লাগবে ৪১ দিন । চাঁদের পৃষ্ঠে চন্দ্রযান-৩ এর ল্যান্ডার ২৩ আগস্ট অবতরণ করার কথা।
চন্দ্রযান তিন অভিযানের সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, চন্দ্রযান ২ অভিযানে পাঠানো অরবিটরটি এখনও চাঁদকে প্রদক্ষিণ করে চলেছে। তাই এ বারের অভিযানে ইসরো আর কোনও অরবিটার পাঠাবে না চাঁদের কক্ষপথে। চাঁদের মাটিতে নামতে কক্ষপথে থাকা চন্দ্রযান-২ এর অরবিটারেরই সাহায্য নেবে, চন্দ্রযান-৩ এর সঙ্গে যাওয়া ল্যান্ডার আর তার ভিতরে থাকা রোভার। বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন গত বছর যা যা ভুল হয়েছিল তা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার উৎক্ষেপণ, কক্ষপথে প্রবেশ এবং সর্বশেষে চন্দ্রের দক্ষিণ মেরুতে অবতরণ -তিনটি ধাপ যেন সাফল্যমন্ডিত হয় তার কোনও কসুর রাখা হয়নি। তাদের অন্ধকার ও প্রাচীন অংশে অবতরণ করতে পারলে তবেই জলের সন্ধান সহ অন্যান্য বিবিধ লক্ষ্যে গবেষণা শুরু হবে। চতুর্থ দেশ হিসেবে চন্দ্রে সফল অবতরণ দেশকে এনে দেবে গৌরব।এখন কেবল সময়ের গণনা। সবকিছু ঠিকঠাক চললে ৪২ দিন অধীর আগ্রহে প্রহর গুনবে ভারতবাসী।।


More Stories
গ্রেফতার অজি ক্রিকেট তারকা ওয়ার্ণার
যুদ্ধের জাঁতাকলে ভারত
আবার বিজয়ী, ইতিহাস গড়ল ভারত