সময় কলকাতা ডেস্ক,১৮ আগস্ট : জন ক্লার্ক মার্শম্যান নামটি বাংলা ভাষা,সাহিত্য এবং সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অত্যন্ত স্মরণীয় নাম। তিনি ছিলেন একাধারে লেখক, সাংবাদিক,অধ্যাপক, ঐতিহাসিক, সাহিত্যিক ও অনুবাদক।তিনি বঙ্গেই কাটিয়েছেন জীবনের বেশিরভাগ সময়। মার্শম্যান ইংরেজ হয়েও ভারতবর্ষকে স্বদেশ মনে করতেন। ১৭৯৪ সালের ১৮ আগস্ট তারিখে ইংল্যান্ডের ব্রিস্টলে জন্মগ্রহণ করেছিলেন মার্শম্যান। এদেশের প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা থাকলেও বিভিন্ন বাংলা কাগজ ও পত্র-পত্রিকায় তাঁর উদ্দেশ্যে বিরূপ সমালোচনা হয় ও অনভিপ্রেত বিশেষণ বর্ষিত হতে থাকে। এক সময় ভগ্নহৃদয়ে ভারত ত্যাগের পরিকল্পনা করেন মার্শম্যান ।১৮৫৫ সালে তিনি ভারত ছেড়ে ইংল্যান্ডে ফিরে যান।
তিনি ইংল্যান্ড ফিরলেও তাঁর সঙ্গে ছিল ভারতের মাটিতে কাটানো তাঁর ৫৬ বছরের স্মৃতি। তাঁর বাবা জোশুয়া মার্শম্যান ছিলেন ধর্মপ্রচারক। মাত্র ৫ বছরে ছোট্ট জন ভারতে পা রেখেছিলেন। তাঁর বাবা পরের বছরে শ্রীরামপুরে দুটি বোর্ডিং স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। সে সময় থেকে বাঙালিদের সঙ্গে মিশে অনায়াসে বাংলা আয়ত্ত করে নেন জন।১৮১৮ সালে বাবার সঙ্গে জন ‘দিগদর্শন’ নামে বাংলা পত্রিকা প্রকাশ করেন যা সমাচার দর্পনের সাথে বাংলার সবচেয়ে পুরনো দুটি সংবাদপত্রের অন্যতম বলে বিখ্যাত। ১৮২১সালে শ্রীরামপুর মিশন ‘ফ্রেন্ড অফ ইন্ডিয়া’ নামে একটি ইংরেজি সংবাদপত্র প্রকাশ করতে থাকে।এটির সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন জন মার্শম্যান। ১৮৭৫ সালে ‘ফেন্ড অফ ইন্ডিয়া’ অপর একটি সংবাদপত্র ‘দ্যা ইংলিশম্যানের’ সঙ্গে যুক্ত হয়ে নতুন কলেবরে ‘দ্যা স্টেটসম্যান ‘ সংবাদপত্রের জন্ম দেয় যে পত্রিকাটি আজও বর্তমান। দ্যা স্টেটসম্যান পত্রিকার সঙ্গে মার্শম্যানের কোনও যোগ ছিল না। কারণ এই পত্রিকা সূচনার বহু আগেই তিনি ভারত ছেড়ে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান। তবুও সাংবাদিক হিসেবে তাঁর অবদান ভোলার নয়।
১৮৩৭ সালে তাঁর পিতা জোশুয়া মার্শম্যান প্রয়াত হন।পিতার মৃত্যুর পরে আর্থিক কারণে তিনি ভারত সরকারের বাংলা অনুবাদকের কাজ নেন আর এরপরই তৎকালীন শিক্ষিত বঙ্গ সমাজের একাংশ তাকে ব্রিটিশ সরকারের ভৃত্য , ভাড়াটিয়া প্রভৃতি বিশেষণে তাঁকে কঠোর সমালোচনায় বিদ্ধ করতে থাকেন। অপমান সয়ে ভারতপ্রেমী জন মার্শম্যান পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পুস্তক রচনার কাজে নিজেকে ব্যাপৃত রাখলেও ধীরে ধীরে ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে যেতে শুরু করেছিলেন।
এদেশের ভাষা সংস্কৃতি ও ইতিহাস নিয়ে অনেক পড়াশোনা করেছিলেন। এদেশের ইতিহাস নিয়ে তাঁর লেখা “হিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়া” এবং ” হিস্ট্রি অফ বেঙ্গল ” অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি বই l এছাড়াও তিনি ভূমি রাজস্ব বিষয়ক গ্রন্থ লিখেছিলেন। বাংলা ভাষায় তার ব্যুৎপত্তি ছিল । ১৮৪৪ সালে হিস্ট্রি অফ বেঙ্গল ইংরেজি ভাষায় লিখে পরবর্তীতে বইটি তিনি নিজেই বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন যদিও এই বই ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর সহ একাধিক লেখক অনুবাদ করেছেন। বাংলা ভাষায় অনুবাদ করা “বঙ্গদেশের পুরাবৃত্ত ” প্রকাশ পায় ১৮৫৯ সালে। ইংল্যান্ডে বসবাস কালেও ভারতকে ভোলেন নি তিনি। ব্যর্থ চেষ্টা করেছিলেন ভারতের কাউন্সিলর পদের প্রার্থী হতে। ১৮৬৮ সালে ভারত বিষয়ক গভীর জ্ঞানের জন্য ভারত সরকার তাঁকে ” ভারত তারকা ” উপাধিতে সম্মানিত করে। ১৮৭৭ সালের জুলাই মাসে ইংল্যান্ডের মাটিতেই প্রয়াত হন ভারত প্রেমী মার্শম্যান।।


More Stories
রবীন্দ্রনাথের পরলোক চেতনা ও প্রেতচৰ্চা
অভিনেতাদের কাছে সেরা-টুকু নেওয়ার মাস্টার আর্ট ছিল সত্যজিৎ রায়ের জানা
বাংলা নববর্ষের ইতিহাস