Home » দত্তপুকুরের শিবালয়ে বুড়িমার পুজো

দত্তপুকুরের শিবালয়ে বুড়িমার পুজো

পুরন্দর চক্রবর্তী, চুমকী সুত্রধর, শর্মি পাল, সময় কলকাতা, ২ অক্টোবর : দত্তপুকুরের শিবালয়ে বুড়িমার পুজো

দর্গাপুজো

জটাজূটসমাযুক্তামর্ধেন্দুকৃতশেখরাম্‌।
লোচনত্রয়সংযুক্তাং পূর্ণেন্দুসদৃশাননাম্‌।।
বাংলায় তর্জমা করলে বলা যায়, দেবী জটাজূটধারিণী, তাঁর শিখর অর্ধচন্দ্র দ্বারা ভূষিত, তাঁর পূর্ণচন্দ্রের ন্যায় কান্তিময় মুখমণ্ডল ত্রিনয়ন শোভিত। মা আসছেন আর মা দুর্গার আগমনী বার্তা ছড়িয়ে পড়ছে মর্ত্যলোকে। ছড়িয়ে পড়ছে শারদীয়া উৎসবের সৌরভ। বাঙালি মেতে উঠতে চলেছে দেবী দুর্গার পুজো ও উৎসব উদযাপনে। দুর্গাপুজো প্রাথমিক ভাবে কেবলমাত্র রাজা, জমিদার এবং বাবু তথা ধনী সম্প্রদায়ের বাড়িতে আয়োজিত হত। সেই কৌলিন্য আর ঐতিহ্য মেনে আজও অনেক রাজা, জমিদার বা ধনী বংশের বংশধরেরা আয়োজন করেন দুর্গাপুজো। এরকম অনেক বনেদি বাড়ির পুজো আজও ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বাংলার কোণে কোণে। তথাপি বহু পুজোর মাঝে বড্ড স্বতন্ত্র উত্তর চব্বিশ পরগনার দত্তপুকুরের শিবালয়ে বুড়িমার পুজো তথা রায়বাড়ির দুর্গাপুজো ও এই প্রাচীন বনেদি বাড়ির পুজোর ইতিহাস, ঐতিহ্য ও পুজো পালন পদ্ধতি।

 বাংলার প্রাচীন দুর্গাপুজো কোনটি, তা নিয়ে তর্ক-বিতর্কের অন্ত নেই। তবে দুর্গাপুজো নিয়ে যারা গবেষণা করেন, তাঁদের আধুনিকতম মত, অধুনা রাজশাহীর তাহেরপুরের রাজা বারোভূঁইয়ার অন্যতম রাজা কংসনারায়ণ ৮৮৭ বঙ্গাব্দে বা ১৪৮০ খ্রিস্টাব্দে দেবীদুর্গার প্রতিমা গড়ে প্রথম দুর্গাপুজো করেন। অর্থাৎ পুরাণে যাই বর্ণনা থাকুক না কেন, বাঙালির দুর্গাপুজোর ইতিহাস ৫৪২ বছরের পুরনো। বারোয়ারি পুজোর ইতিহাস বনেদি বাড়ির পুজোর তুলনায় অনেক কম প্রাচীন। বলা হয়, হুগলির গুপ্তিপাড়ায় ১৭৯০ সালে ১২ জন বন্ধু মিলে প্রথম যে দুর্গাপুজো করেন তাকে বারো -ইয়ারি পুজো বলা হত, যা থেকে বারোয়ারি পুজোর নামকরণ। তবে তার আগে থেকেই চলে আসছে বহু রাজা বা জমিদার বাড়ির পুজো। এরকম এক বনেদি বাড়ির পুজো হ’ল শিবালয়ের বুড়িমার পুজো বা রায় বাড়ির দুর্গাপুজো।

ইতিহাস

বহু বছর আগের কথা -তখনও বাংলায় ছিল রাজাদের পরাক্রম। এমনই এক সময়ে নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের পুত্র রাজা শিবচন্দ্র দেশভ্রমণ উদ্দেশ্যে নদীপথে যাত্রা করেছিলেন। সুবর্ণবতী বা সূক্ষ্মবতী যা এখন শুঁটি নদী সেই নদী পথে ভেসে চলেছিল রাজার তরী। নদীবক্ষ ধরে চলা রাজার নৌকাবিহার থেমে যায় দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায়, এক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে-ঘেরা দুর্গমস্থানে থামতে হয় তাঁকে। নৌকা থেকে নেমে সেস্থানের শোভায় মুগ্ধ হন রাজা শিবচন্দ্র। ঝড়-জলের সেই রাতে তিনি কাটান নদী তীরবর্তী অরণ্যসম ভুখণ্ডে। বর্ষণমন্দ্রিত সেই রাতেই তিনি স্বপ্নে দর্শণ পান নৃসিংহের আদলে মা-দুর্গার। দেবী তাঁকে আদেশ দিয়ে বলেন এখানেই তাঁর পুজো করতে। স্বপ্নে রাজা দেবীর যে রূপ দর্শণকরেছিলেন, পর্ণকুটির গড়ে তাঁরই আবাহন ও পুজো করেন রাজা শিবচন্দ্র। এখানে কিছুকাল বসবাসও করেছিলেন শিবচন্দ্র আর রাজার সাময়িক নিবাসস্থলকে ঘিরেই গড়ে উঠতে থাকে জনপদ। রাজা শিবচন্দ্রের প্রতিষ্ঠা করা পুজো বুড়িমার পুজো নামে পরিচিত। আজও নিজেদের রাজা শিবচন্দ্রের বংশধর দাবী করে শিবালয়ের রায় পরিবার নিষ্ঠা ভরে আয়োজন করে চলেছে দূর্গাপুজোর। একদা বনেদি পরিবারের সেই গরিমা আজ অস্তমিত হলেও কৌলিন্য কমেনি বুড়িমার পুজোর।

জনশ্রুতি ও ইতিহাসের মেলবন্ধন

রাজা শিবচন্দ্রকে নিয়ে অজস্র জনশ্রুতি আজও ফেরে দত্তপুকুরের শিবালয়ের লোকমুখে। বলা হয়ে থাকে, রাজা শিবচন্দ্রের নাম অনুসারে এই রাজপাটের নাম হয় শিবালয়। বারাসাত থেকে ১২ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে আমডাঙার দিকে একটু এগোলেই পড়বে সন্তোষপুরের মোড়, জাতীয় সড়ক ছেড়ে আপনাকে ডান দিকে দত্তপুকুরের দিকে এগোতে হবে। দু কিলোমিটার গেলেই শিবালয়ের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে রাস্তার ওপরেই দেখতে পাবেন বুড়িমার মন্দির। এখানেই এতদঞ্চলের অন্যতম জাগ্রত দূর্গাপুজো হয়ে আসছে যুগযুগ ধরে। পুজোর প্রাচীনত্ব নিয়ে ইতিহাস আর জনশ্রুতির ব্যবধান অনেকটাই। অনেকে অতিরঞ্জন করেন। বর্তমান বংশধররাও তার ব্যতিক্রম নন। তবুও শিবচন্দ্র প্রতিষ্ঠিত পুজোকে ঘিরে ইতিহাস আর গল্পকথার মিশেল পুজোর প্রাচীনত্বকে খর্ব করে না কোনোভাবেই। ঐতিহ্য এবং প্রাচীনত্বের বিচারে নদীয়ার রাজ পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত রায় পরিবারের বুড়িমার পুজো প্রকৃত অর্থেই অন্যমাত্রাবাহী। তবুও গরমিল রয়েছে ইতিহাস আর জনশ্রুতির। বুড়িমার মন্দির যা কিনা হালে তৈরি হয়েছে, তার প্রাকারগাত্রে লেখা আছে – ১৭১০ সালে প্রতিষ্ঠিত পুজো। অর্থাৎ ৩১৪ বছর আগের পুজো। ফলে অনেকেরই ধারণা, এই পুজো নবাবি আমলের গোড়ার দিকে। পরিবারের দাবি, এই পুজো সপ্তদশ শতকের এবং অন্তত সাড়ে তিনশো বছরের পুরনো। আর এখানেই ইতিহাসের সঙ্গে সংঘাত পরিবারের দাবি বা জনশ্রুতির। ইতিহাস বলছে, মাত্র ছ বছর রাজা ছিলেন শিবচন্দ্র। তাঁর রাজপাটের সময়কাল ১৭৮২-৮৮…অর্থাৎ জনশ্রুতি আর ইতিহাস যদি যোগফল ধরা যায়, তাহলে বলতে হয় এই পুজো অন্তত ২৩৬ বছরের প্রাচীন। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজ্যকাল (১৭২৮ -১৭৮২) ও শিবচন্দ্রের আনুমানিক জন্মসাল মাথায় রেখে শিবচন্দ্রের নৌকাবিহার কালকে তাঁর যুবরাজকালীন নদীযাত্রা ধরলেও তা কোনওমতেই ১৭৫০ সালের আগের হতে পারে না। পুজো অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগের হলেও পুজোর প্রাচীনত্ব কমবেশি ২৫০ বছরের। ভারতের স্বাধীনতার আগের সময়কালের মানুষ এখনও বেঁচে আছেন – তাঁরাই বলেন পিতামহ, প্রপিতামহদের কাছে তাঁরা শুনেছেন, রাজা শিবচন্দ্রের শুরু করা পুজোর ধারক ও বাহক রায় পরিবার, যাদের শিড়ায়-ধমনীতে নদীয়াধিপতি শিবচন্দ্রের রক্ত প্রবাহিত। পুজোর সময়কাল নিয়ে বিতর্ক থাকলেও পুজোর প্রাচীনত্ব নিয়ে মতানৈক্য নেই।

পুজো ও প্রথা

 বুড়িমার পুজোর সঙ্গে প্রথাগত পুজোর অনেক ক্ষেত্রেই অমিল। দেবীমূর্তি থেকে পূজা পালনের রীতির অনেকক্ষেত্রেই গতানুগতিকতার সংজ্ঞা ভেঙেছে প্রাচীন এই পুজো। সবিস্তারে বিষয়টি তুলে ধরা যাক।
কথিত আছে, দেবীকে নৃসিংহ রূপে স্বপ্নে দেখেছিলেন মহারাজা শিবচন্দ্র রায় আর সেই নৃসিংহ রূপেই পূজিতা হতেন দেবী.. দেবী দশভুজা হলেও দুটি হাতই শুধু দৃশ্যমান, অন্য আটটি হাতের অবস্থান গুপ্ত যা লুকোনো থাকে চুলের মধ্যে। শিবালয়ে সিংহবাহিনী দেবীমূর্তি নন, দেবী অশ্বে অধিষ্টিতা। এরকম প্রথা চলে আসছে যুগ-যুগান্ত ধরে। কিংবদন্তী অনুসারী শিবচন্দ্রে নৃসিংহ রূপে দেবীকে যেমন দেখেছিলেন, সেভাবেই তাঁকে আজও পুজো করা হয় …

পরম্পরা

ঐতিহ্য মেনে বংশানুক্রমে পুজো হয়ে আসছে সম্প্রতি গড়ে ওঠা দেবীদালানে। পর্ণকুটিরে পুজোর সূচনা করেছিলেন রাজা শিবচন্দ্র রায়, এমনই কথিত। এরপরে বহু যুগ পার করে আসা একচালার পুজো আজ দেবী দালানে হওয়ায় কিছু নতুনত্ব এসেছে। শুরু হয়েছে নিত্যপুজো। দূর্গাপুজোতে পরিবর্তন কার্যত একটাই। ছাগবলি বন্ধ হয়ে নিরামিষ বলি শুরু হয়েছে কয়েক দশক আগেই। কিন্তু সাবেকি প্রথা প্রায় সকলই বহমান। আজও জন্মাষ্টমীর পরে দেবী কাঠামো গড়ে প্রতিমা নির্মাণ শুরু হয়। মহানবমীর এক পক্ষ কাল আগেই চণ্ডি পুজোর মধ্যে দিয়ে আরতি দিয়ে শুরু হয় দেবীর আরাধনা।

 স্বতন্ত্র ধারা

শিবালয়ের পূজো অনেক দিক থেকেই অন্য মাত্রার। বুড়িমার পুজোর যে দিক উল্লেখের দাবি রাখে তা হল দণ্ডিকাটা। এখানে দণ্ডি কাটেন শতাধিক মানুষ। বুড়িমার দেবী খুব জাগ্রত -এই বোধ থেকে দণ্ডিকাটার প্রথাও কালে কালে বহু মানুষের মধ্যে প্রসার লাভ করেছে। এই পরিবারের সদস্যরা জানান যে মনস্কামনা পূর্ণ করতে বুক থেকে রক্ত দেবীকে উৎসর্গ করে থাকেন মানুষ। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক বড় উদাহরণ বুড়িমার পুজো। আজও এলাকার সংখ্যালঘুদের অবারিত দ্বার দেবীর পুজোয়, যে সম্প্রীতির কারণ খুঁজতে ঢুকতে হবে আরেকটি লোকশ্রুতিতে। একদা জনৈক রহমত আলী অসুস্থ অবস্থায় দেবী দর্শণ পেয়েছিলেন। সুস্থ হয়ে পরবর্তীতে তিনি তার পুত্রদের নাম হিন্দু বা অন্য ধর্মমত অনুসারে রেখেছিলেন। রহমত আলীর প্রত্যক্ষ দেবীজ্ঞানে ঘটেছিল ধর্মীয় মেলবন্ধন। তিনি আজ নেই তথাপি তার বাড়ির সামনে একবার থেমে যায় নিরঞ্জনের আগে বিসর্জনের শোভাযাত্রা।

 অনন্য ঐতিহ্য

বুড়িমা দূর্গাপুজোর সর্বজনীন সুপ্রাচীন ঐতিহ্যর প্রমাণ রয়েছে নিরঞ্জনেও। দত্তপুকুর এলাকায় দত্তবাড়ির দূর্গাপুজো সহ একাধিক প্রাচীন দূর্গাপুজো হয়। প্রায় তিন শতাব্দী প্রাচীন পুজো বলে দাবি করা হয় দত্তবাড়ির পুজো। তথাপি পরম্পরা মেনে দত্তপুকুর অঞ্চলে বুড়িমার পুজোর ঐতিহ্যকে সম্মান জানিয়ে আসার পরম্পরা বহমান । আজও রাজা শিবচন্দ্রর সূচনা করা পুজোর প্রতিমা নিরঞ্জন না হলে কোনো প্রতিমা নিরঞ্জনের রেওয়াজ নেই দত্তপুকুরে। আজ সুক্ষবতী/ সুবর্ণবতী নদী মজে এক খালের আকার নিয়েছে। বর্তমানকালে শুঁটি নদী নামে পরিচিত মৃতপ্রায় নদীতে নিরঞ্জন হয় দেবীর। আবার প্রতীক্ষা চলে একটি বছর ধরে মায়ের আগমণের।

উপসংহার

 বঙ্গের অন্যতম বনেদি বাড়ির পুজো – বুড়িমার দূর্গাপুজোয় দূর দূরান্ত থেকে মানুষ আসেন। আসেন হাজারে হাজারে মানুষ। এমনকী, করোনা কালেও উৎসবে ভাটা পড়েনি। বিগত দুবছর আরো লোক বেড়েছে। জাঁকজমক নয়, বনেদিয়ানা ও ঐতিহ্যে নজর কাড়তে বাধ্য শিবালয়ের দুর্গা পুজো।

দত্তপুকুরের শিবালয়ে বুড়িমার পুজো #দত্তপুকুরের শিবালয়ে বুড়িমার পুজো

About Post Author