Home » স্তনের রক্তাক্ত ইতিহাস : জানেন কি, দিতে হত স্তনকর?

স্তনের রক্তাক্ত ইতিহাস : জানেন কি, দিতে হত স্তনকর?

পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা :গল্প নয় সত্যি।স্তন ঢেকে রাখলেই নারীকে দিতে হত ব্রেস্টট্যাক্স বা স্তনকর।কেরলের এক বিস্তীর্ণ অংশে মহিলাদের স্তন ঢেকে রাখার ওপরে নিষেধাজ্ঞা বলবৎ ছিল শতাধিক বছর ধরে ।নিয়ম ছিল -স্তন প্রদর্শন করে সম্মান জানাতে হবে উচ্চবর্ণের মানুষদের। কেরলে ত্রিভাঙ্কুর রাজের আমলে চালু হয় এরকমই বর্বর বর্বর প্রথা। আইন হয়ে ওঠে যে স্থানীয় এঝাওয়া ও নাদের সম্প্রদায় সহ দলিতদের শরীরের উপরিভাগে রাখা যাবে না এক চিলতে বস্ত্র।অষ্টাদশ শতকে ত্রিভাঙ্কুর রাজার জারী করা প্রথা অনুযায়ী দলিত সম্প্রদায়ের মহিলাদের স্তন উন্মুক্ত রেখে ঘুরতে হত ।স্তন ঢাকতে চাইলে দিতে হত “ট্যাক্স ” যাকে কেরলে বলা হত ‘মুলাক্করম ‘বা স্তনকর ।

যার স্তন যত আকারে বৃহৎ তার ওপরে আরোপিত হবে তত বেশি কর। ব্রাহ্মণ ও রাজন্যবর্গের জন্য এই কর প্রযোজ্য ছিল না ।করের বোঝা এতটাই বেশি ছিল যা দেওয়া দরিদ্র দলিত সম্প্রদায়ের পক্ষে ছিল কার্যত অসম্ভব।আর এরই বিরুদ্ধে আজ থেকে প্রায় দুশো বছর আগে এঝাওয়া সম্প্রদায়ের দলিত এক নারী ঘটান যুগান্তকারী বিপ্লব।ধারালো অস্ত্র দিয়ে নিজের স্তন কেটে কলাপাতায় করে তুলে দেন শুল্ক আদায় করতে আসা রাজকর্মীদের হাতে। আর এই বিদ্রোহের বীজ ছড়িয়ে পড়ে দলিত দের মধ্যে।দীর্ঘ বিপ্লবের পরে আইন করে সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয় স্তনকর।

‘মুলাক্করম’ বা স্তনকর যেমন ছিল দলিত মহিলাদের স্তনের ওপরে আরোপিত কর তেমনই দলিত পুরুষদের গোঁফের ওপরেও সেসময় আরোপিত ছিল কর। ‘থালাকরম’ নামক কর দিতে গোঁফের জন্য ।পুরুষরা আরোপিত করের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে না পারলেও তেজস্বিনী এক নারী ঘটান বিপ্লব।

বর্বর  সামাজিক করপ্রথার বিরুদ্ধে যে নারী নিজের রক্ত দিয়ে এই বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন তাঁর নাম নাঙেলি।ত্রিভাঙ্কুরের চারথালার এক দরিদ্র দলিত এঝাওয়া সম্প্রদায়ের তরুণী নাঙেলি আলোড়ন ফেলে দেন তাঁর দুই স্তন কেটে শুল্ক সংগ্রাহকদের হাতে তুলে দিয়ে । নাঙেলির কাহিনী এখন ইতিহাসের পাতায়। মনু এস পিল্লাই তাঁর ত্রিবাঙ্কুর রাজ পরিবার নিয়ে নথিতে যে ইতিহাস গ্রন্থবদ্ধ করেছেন সেখানে উল্লেখ আছে নাঙেলির। স্কুলপাঠ্য পুস্তকেও ঠাঁই পেয়েছে নাঙেলির বিপ্লব।

তথাকথিত নিম্নবর্ণের কৃষক সম্প্রদায়ের নারী নাঙেলির জন্ম আনুমানিক অষ্টাদশ শতকের সত্তরের দশকে।তখন পুরোমাত্রায় চালু স্তন কর।বিবাহিতা নাঙেলি বক্ষ-আবরণ দিয়ে স্তন ঢেকে কাজে যেতেন।বিষয়টি ত্রিভাঙ্কুরের আইনরক্ষকরা ভালো চোখে নেন নি।তাঁরা নাঙেলির ওপরে চাপ বাড়াতে থাকেন। রাজা ও রাজকর্মীদের চোখ রাঙানিকে উপেক্ষা করতে থাকেন কৃষ্ণবর্ণের তরুণী।স্বভাবতই নিম্নবর্গের এক মহিলার আইনভঙ্গ করার ফলে বিষনজরে পড়ে রাজরোষে পড়েন নাঙেলি।

এরকমই এক পরিপ্রেক্ষিতে চাপের মুখে নাঙেলি কার্যত ঐতিহাসিক বিপ্লব ঘটান ঊনবিংশ শতকের গোড়ায়। আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া নারী নাঙেলির ওপরে চাপ চরমে উঠলেও নতিস্বীকার করতে নারাজ ছিলেন নাঙেলি। তাঁর বক্তব্য ছিল – স্তন তাঁর, তা খুলে রাখবেন না ঢাকবেন সিদ্ধান্ত নেবেন স্বয়ং তিনি ।কিন্তু এই যুক্তি মানতে নারাজ ছিল ত্রিভাঙ্কুরের রাজার পারিষদবর্গ। নাঙেলির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।১৮০৩ সালে চাপ চরমে ওঠে। নাঙেলি বেছে নেন চরম পথ।তাঁর বাড়িতে স্তনকর ” মুলাক্করম” নিতে হাজির হয় শুল্ক সংগ্রাহকরা। দরজার বাইরে অপেক্ষায় থাকা শুল্ক সংগ্রাহকদের বলপ্রয়োগের অপেক্ষা না করে ঘরের ভেতরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কেটে ফেলেন তাঁর দুই স্তন।অতঃপর কর্তিত স্তনযুগল কে কলাপাতায় মুড়ে তুলে দেন শুল্ক আদায়কারীদের হাতে। নারীর মর্যাদা রক্ষায় তাঁর পদক্ষেপ আলোড়ন ফেলে ত্রিভাঙ্কুর ছাড়িয়ে কেরল জুড়ে।

কথিত আছে,স্তন কাটার পরে রক্তক্ষরণে মৃত্যু হয় নাঙেলির। সহমরণে যান তাঁর স্বামী।কিছু ঘটনার ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ঐতিহাসিকরা। মনু এস পিল্লাইয়ের মত গ্রন্থকারদের কেউ কেউ বলেছেন, স্তন বৃহৎ হলেই কর যে বাড়ত এরকম কোনো নির্দেশ ছিল না। তথাপি মিথ হয়ে ওঠা নাঙেলির কাহিনীকে বাস্তব বলেই মানা হয়। নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো নারীদের মুখ ছিলেন তিনি।সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের বিপ্লবের নথিতে স্থান পেতে বাধ্য নাঙেলির দৃষ্টান্ত। ১৯২৪ সালে আইন করে বন্ধ করা হয় স্তনকর। বলাবাহুল্য, নিজের বক্ষযুগল কেটে ত্রিভাঙ্কুর রাজের প্রবর্তিত ‘স্তনকর’ আইন প্রত্যাহারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে গেছিলেন নাঙেলি।।

About Post Author