পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা :
“মরণ জিনিসটাকে মানুষ খুব ভয়ানক জিনিস বলে মনে করে। এজন্যই মানুষ দুঃখ পায়। কিন্তু যে জিনিসটাকে কিছুতেই এড়ানো যাবে না, যে জিনিসটাকে প্রত্যেক মানুষের একদিন না একদিন আলিঙ্গন করতেই হবে তাকে ভয় করে লাভ কি? ” ফাঁসির তিনমাস আগে কারাগার থেকে নিজের মেজদিকে লেখা চিঠিতে এমনটাই লিখেছিলেন বিপ্লবী সূর্য সেন।এই কয়েকটি লাইনের প্রতিটি শব্দ জানান দেয়- কেন মৃত্যুহীন প্রাণ ছিলেন অগ্নিযুগের বীর শহীদ মাস্টারদা সূর্যসেন।

“ফাঁসির রজ্জু আমার মাথার উপর ঝুলছে। মৃত্যু আমার দরজায় করাগাত করছে। মন আমার অসীমের পানে ছুটে চলছে। এইতো সাধনার সময়।বন্ধুরূপে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার এইতো সময়।…এই সুন্দর পরম মুহুর্তে আমি তোমাদের জন্য দিয়ে গেলাম স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন। আমার জীবনের এক শুভ মুহুর্তে এই স্বপ্ন আমাকে অনুপ্রাণিত করছিল।” এই ছিল শহীদ মাস্টারদা সূর্যসেনের শেষ বাণী যা আজও,তাঁর ১২৯ তম জন্মদিনে আমাদের মনে আলোড়ন ফেলে।
১৮৯৪ সালের ২২ মার্চ,চট্টগ্রামের নয়াপাড়ায় আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল সেন পরিবারে যে শিশুর জন্ম হয়, তিনি তাঁর ৩৯ বছরের জীবনে অখণ্ড ভারতের প্রান্তিক এলাকা চট্টগ্রাম থেকে অত্যাচারী ইংরেজ শাসকদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে হয়ে উঠেছিলেন ব্রিটিশদের ত্রাস।ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বাংলার চরমপন্থী আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ছিলেন সূর্যসেন। খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে পরাধীন ভারতকে মুক্ত করার লক্ষ্যে তাঁর আদর্শে বহু কিশোর- কিশোরী তরুণ-তরুণী তাঁর আদর্শে হয়ে ওঠে দীক্ষিত। একনিষ্ঠ বৈপ্লবিক প্রচেষ্টায় স্বাধীনতাকামী যুবাদের সঙ্গে নিয়ে তিনি নাড়িয়ে দিয়েছিলেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যর ভিত।
আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে ডাকাতি,নাগরপাড়া পাহাড় যুদ্ধ,ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি(চট্টগ্রাম শাখা ) গঠন, চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন,চট্টগ্রামে অস্থায়ী সরকার গঠন, ব্রিটিশ ভারতের সঙ্গে সব সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে চারদিন চট্টগ্রামকে কার্যত ব্রিটিশ যোগাযোগ থেকে মুক্ত রাখা, জালালাবাদ যুদ্ধ,ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণ সংগঠিত করা ,একাধিক অত্যাচারী ইংরেজ রাজকর্মচারীকে নিধনকার্যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অংশগ্রহণ , এবং দু বছরের জন্য কারবাস ছাড়া ১৯৩৩ সালে ১৭ ফেব্রুয়ারীর আগে বারবার ছদ্মবেশ ধরে ব্রিটিশদের চোখে ধুলো দিয়ে একের পর এক বৈপ্লবিক অভিযানের খসড়া তৈরি করে,চরমপন্থী বিপ্লবে নেতৃত্বদান করেছিলেন শীর্ণ, খর্বকায় সূর্যসেন। অম্বিকা চক্রবর্তী, লোকনাথ বল, গণেশ ঘোষ প্রমুখ তাঁর সহযোগী ও শিষ্য ছিলেন। মহিলা বিপ্লবীদের তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামে ব্রতী করে তোলেন।তাঁর অনুগামীদের মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য ছিলেন প্রীতিলতা ওয়াদেদার ও কল্পনা দত্ত। শয়ে শয়ে যুবা তাঁর আদর্শে ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবে প্রাণের আহুতি দিয়েছিলেন যাদের জন্য চট্টগ্রামের নাম ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে উজ্জ্বল অক্ষরে লেখা আছে । অগ্নিযুগের বীর নেতা সূর্যসেনকে চট্টগ্রামের তো বটেই, তাঁর আন্দোলনের ব্যাপ্তির দিক থেকে ভারতের অন্যতম স্বাধীনতা সংগ্রামী নেতা বললেও অত্যুক্তি হয় না।
তাঁর বিপ্লব আন্দোলনের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেছিল বিপ্লবের ছোঁয়া থাকা বিভিন্ন বইপত্র পড়ার অভ্যেস । অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র সূর্য সেন বহরমপুর কে এন কলেজে স্নাতক স্তরে পড়ার সময় সতীশ চন্দ্র চক্রবর্তীর সংস্পর্শে আসেন যার ফলে তাঁর তরুণ বিপ্লবী মনকে বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়। বলা হয়, আনন্দ মঠ পড়ে তিনি চিরকুমার থাকার জন্য ব্রতী হন।বাড়ির চাপে বিয়ে দেওয়া হলেও কয়েকদিনের মধ্যে তিনি বৈবাহিক জীবন থেকে সম্পূর্ণ নিজেকে সরিয়ে নেন। ধরা পড়ার আগের দিনও সহযোদ্ধাদের শরৎচন্দ্রের পথের দাবী থেকে উদ্ধৃতি শুনিয়ে মন শক্ত করতে বলেছিলেন সূর্যসেন । আইরিশ আন্দোলনের পটভূমিকায় লেখা বিভিন্ন বই ছিল তাঁর অত্যন্ত প্ৰিয় । আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতা সংগ্রাম তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছিল। আইরিশ বিপ্লবীদের শপথবাক্য তাঁর মর্মে ছিল গাঁথা । তাঁর মৃত্যুর আগেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চয়নিকা ছাড়াও নিয়মিত গীতা পড়তেন। ফাঁসির কিছুদিন আগে জেলে তার গান শোনার খুব ইচ্ছা হলে এক রাতে কল্পনা দত্ত বিপ্লবী বিনোদবিহারীকে বিষয়টি জানান। বিনোদবিহারী চৌধুরী সে অর্থে গায়ক না হলেও রবিঠাকুরের “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে” গান শোনান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বই ও গান তাকে দিত শক্তি ও শান্তি।

১৯৩৩ সালে ধরা পড়ার পরে ব্রিটিশ সরকার তাঁর ফাঁসির আদেশ দেয়। ১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি মধ্যরাতে নির্মম অত্যাচারের পরে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় তাঁকে ও তারকেশ্বর দস্তিদারকে ফাঁসি দেওয়া হয়। ফাঁসির পরে সূর্যসেনের দেহ তাঁর পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয় নি। যতদূর জানা যায় , বঙ্গোপসাগরে সূর্য সেনের দেহ ভাসিয়ে দেওয়া হয়।
একথাও বহুশ্রুত যে,এক কয়েদি মেথরের মাধ্যমে জেলে আটক বিপ্লবী কালীকিঙ্কর দে’র কাছে সূর্য সেন পেন্সিলে লেখা “আমার শেষ বাণী-আদর্শ ও একতা” লিখে পাঠিয়েছিলেন।তাঁর শেষ বার্তায় তিনি স্মরণ করেন তার স্বপ্নের কথা যা কিনা স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন ও যে জন্য জীবনভর উৎসাহ ভরে ও অক্লান্তভাবে পাগলের মত তিনি ছুটেছেন। শেষ ইচ্ছায় তিনি স্বাধীনতাসংগ্রামীদের জন্য বার্তা পাঠিয়েছিলেন “ভারতের স্বাধীনতায় যে সব দেশপ্রেমিক তাঁদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের নাম রক্তাক্ষরে অন্তরের অন্তরতম প্রদেশে লিখে রেখো”। দেশ তাঁর মত নিবেদিতপ্রাণ বীর সন্তানদের চেষ্টায় স্বাধীনতা পেয়েছে বহুদিন হ’ল।তাঁর স্বপ্ন, তাঁর শেষ ইচ্ছে তাঁর সঙ্গীরা পালন করলেও আজকের দিনে তাঁর মত বীর দেশনায়কদের কতটা মনে রাখা হচ্ছে, সে প্রশ্নের উত্তর পাওয়া খুব শক্ত।।


More Stories
বাংলা নববর্ষের ইতিহাস
আরেক অভিনেতা প্রণবের অকালপ্রয়াণ
বেজি কি সাপের বিষে কাবু হয় না?