পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা :
জরাজীর্ণ দশায় থাকা প্রাচীন অট্টালিকা সময়ের সাক্ষী আর তাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জড়িয়ে থাকে ইতিহাস । তারা ঐতিহ্য বহন করে হারিয়ে যাওয়া, ফেলে আসা অতীতের। ইট, কাঠ, বরগার মধ্যে লুকোনো আছে পুরোনো দিন। অথচ সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কালের গর্ভে হারিয়ে যেতে থাকে সময়ের সাক্ষী এই বিশাল অট্টালিকা, বাসগৃহ আর দালানগুলি । কোথাও এদের সরিয়ে, ভেঙে চুরে জায়গা করে নেয় বহুতল আবাসন। আজও কয়েকশো বছরের ইতিহাসের সাক্ষী যে গুটিকয়েক প্রাচীন ভগ্নপ্রায় অট্টালিকা মাথা উঁচু করে আছে মধ্যে বেশকিছু ক্ষেত্রে রয়েছে বিশেষত্ব। এদের মধ্যে রয়েছে কিছু বিখ্যাত, স্বনামধন্য মানুষের বাড়ি যা অবহেলায় জীর্ণ আর পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে যেমনটি খ্যাতনামা লেখক দীনবন্ধু মিত্রের বাসভবনের ক্ষেত্রে হয়েছে।
১০ এপ্রিল দীনবন্ধু মিত্রের জন্মদিন।আজ দীনবন্ধু মিত্রকে নিয়ে আলোচনা করার ফাঁকে জেনে নেওয়া দরকার তাঁর তাঁকে আমরা এতদিন কতটা স্মরণ করে এসেছি আর তাঁর স্মৃতিকে কতটুকু আমরা গুরুত্ব দিয়ে লালনপালন ও রক্ষণাবেক্ষণ করছি । আজ এও আলোচনা হওয়া প্রয়োজন যে হেরিটেজ হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও তাঁর বসতবাড়িটিকে বাঁচিয়ে রাখতে কতটা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে ।
নীলচাষের সময়ের চিত্র তুলে ধরা “নীলদর্পন”বইটির লেখক দীনবন্ধু মিত্রের বাড়িটি এখন কার্যত ভুতুড়ে পোড়োবাড়ি। বাড়ির গা বেয়ে নেমেছে গাছের ঝুরি। হেরিটেজ হিসেবে গণ্য হলেও দেখে বোঝার জো নেই।ঐতিহ্য বাহী হিসেবে তকমা পাওয়া বাড়িটি যেন এখন মৃত্যুর প্রহর গুনছে।বিশাল দরজাগুলো ক্ষয়ে গেছে এবং জানলায় এখন শুধুই আগাছা আর লতা-পাতা রয়েছে।অট্টালিকার সৌন্দর্য ময়লার স্তরে স্তব্ধ।।সর্বত্র যেন অবহেলার চিত্র।বনগাঁ মহকুমার অন্তর্গত গোপালনগর থানার চৌবেড়িয়া গ্রামে দীনবন্ধু মিত্রের (১৮৩০-৭৩) বাসভবনের অবশেষ পড়ে রয়েছে তেরো কাঠা (৯৩০০ বর্গফুট) জুড়ে।
একজন সমাজকর্মী ,একজন সমাজসেবক দীনবন্ধু মিত্র ছিলেন একজন সফল নাট্যকারও । ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে লেখা নাটক “নীলদর্পণ” এর লেখক হিসেবে তিনি বেশি পরিচিত। “নীলদর্পণ” নীল চাষীদের দুর্দশার কথা।বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় একবার বলেছিলেন যে দীনবন্ধু মিত্র প্রাপ্য তিনি কখনও পাননি।আজ, দেশ স্বাধীন হওয়ার ৭৫ বছর পর যে নাট্যকার তার “নীলদর্পণ” লিখে বাংলার সাহিত্য ও সামাজিক বৃত্তে ঝড় তুলেছিলেন – উত্তর চব্বিশ পরগনায় তাঁর বাসভবনটি অদেখা, অগোছালো এবং বেশিরভাগই অজানা।বনগাঁ শহর থেকে বাইশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চৌবেড়িয়া দীনবন্ধু মিত্রের জন্মস্থানের জন্য বিখ্যাত অথচ তাঁর খ্যাতি তাঁর বাসভবনটিকে হেরিটেজের মর্যাদা দিলেও কাজের কাজ এখনও কিছুই হয় নি।
মিত্রদের পুরোনো বাড়িটি ভাঙা বৈঠাখানা (ড্রয়িং রুম), কুলুঙ্গি (বাঁকা দেয়াল) এবং একটি জরাজীর্ণ সিঁড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।যে বাড়িটি ধ্বংসের অপেক্ষায় রয়েছে সেটি দীনবন্ধু মিত্রের দাদা রামজয় মিত্রের শ্বশুর তৈরী করেছিলেন।দীনবন্ধুর পিতা কালাচাঁদ মিত্র এবং তাঁর পূর্বপুরুষরা গোবরডাঙ্গার নিকটবর্তী গোইপুর গ্রাম থেকে এসেছিলেন।দীনবন্ধু মিত্র স্থানীয় পাঠশালায় প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন।আজ সেখানে দীনবন্ধু মিত্রের নামানুসারে হয়েছে উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান।প্রতি বছর স্থানীয় বাসিন্দা ও দীনবন্ধু মিত্র মেলা কমিটি নাট্যকারের স্মরণে মেলার আয়োজন করত যা বিগত দুবছরধরে করোনাকালে বন্ধ। স্থানীয় বাসিন্দারা বিশ্বাস করেন যে মিত্রের গৌরবময় উত্তরাধিকার সংরক্ষণের জন্য আরও কাজ করা দরকার।
কিছু স্থানীয় বাসিন্দা এবং বিভতিভূষণ মেলা কমিটির সদস্য, যাদের কাছে দীনবন্ধু মিত্রের গৌরব বর্ণনা করার মতো প্রচুর তথ্য রয়েছে তারা বলেন , “সরকারের অবিলম্বে মিত্রদের বাসভবনটি সংস্কার করা উচিত।”
দীনবন্ধু মিত্রের কিছু বংশধর যারা এখন কলকাতায় বাস করেন অথবা চৌবেরিয়াতে থাকেন তারা সর্বসম্মতভাবে অভিযোগ করেছেন , “অনেক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে কিন্তু কেউ তাদের কথা রাখেনি।”
দীনবন্ধু মিত্রের চতুর্থ প্রজন্মের বংশধর সঞ্জিত মিত্র বলেছেন, “হেরিটেজ হয়েছে, এবার বাড়িটির সংস্কার করা উচিত এবং তার পরে লাইব্রেরি এবং যাদুঘর স্থাপন করা যেতে পারে।” সঞ্জিত মিত্র মনে করেন একমাত্র মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পারেন তাঁর সংস্কৃতি মনস্কতা দিয়ে বাড়িটিকে পূর্ণসংস্কার করাতে। ” তাঁর ওপরেই আমাদের ভরসা রয়েছে, মুখ্যমন্ত্রীই পারেন তাঁর স্মৃতি বিজড়িত বাড়িটি বাঁচিয়ে রাখতে ,, ” জানালেন সঞ্জিত মিত্র।

চৌবেরিয়ার মিত্র পরিবার এও দাবি করে যে দীনবন্ধু মিত্র সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য অধ্যায় স্কুল ও কলেজে পাঠ্য বইয়ের মধ্যে চালু করা উচিত।”আমাদের সাংস্কৃতিক মূলকে শক্তিশালী করতে তাদের দীনবন্ধু মিত্রকে জানতে দিন,” সঞ্জিত মিত্র যোগ করেন।একইসঙ্গে মিত্র পরিবারের জোরালো দাবি, সরকার দীনবন্ধু মিত্রের জন্মদিন পালনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিক।”মিত্র একজন সমাজ সংস্কারক এবং শিক্ষাবিদ ছিলেন। আমরা চাই বারাসতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয় তার নামে নামকরণ করা হোক,” যোগ করেছেন সঞ্জিত মিত্র।
রাজ্য সরকার একদা যথেষ্ট উদ্যোগী হয়েছিল । অন্যদিকে যখন হেরিটেজ কমিশনের ধারণাটি ছিল ঐতিহাসিক তাৎপর্যপূর্ণ , তখন ঐতিহাসিক অখণ্ডতা বা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অনুসারে মিত্রের বাড়িটি ঐতিহ্য হিসাবে তালিকাভুক্ত করার যোগ্য কিনা তা নির্ধারণ করার কাজ সময় মেনে এগিয়েছে । অবশেষে ইতিহ্য বা হেরিটেজ হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও বাড়িটিতে প্রাণসঞ্চারের উদ্যোগ এখনও ফলপ্রসূ হয় নি। দীনবন্ধু মিত্রের জন্মদিন বছরের একটি তারিখ হয়ে রয়ে গিয়েছে, অবহেলায় রয়েছে তাঁর স্মৃতিধন্য বাড়িটি।।


More Stories
বাংলা নববর্ষের ইতিহাস
আরেক অভিনেতা প্রণবের অকালপ্রয়াণ
বেজি কি সাপের বিষে কাবু হয় না?