Home » সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার জনক হরিশ মুখার্জী

সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার জনক হরিশ মুখার্জী

পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা :

১৭৮৭ সালে এডমন্ড বার্ক সংবাদপত্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।ভারতীয় সংবাদপত্র আর সাংবাদিকতা দুই শতক পার করে এসেছে।ভারতীয় গণতন্ত্রে সংবাদমাধ্যমের তাৎপর্য ও স্বাধীনতা চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে গণ্য। দীর্ঘ পথ চলার মাঝে অনেক রূপান্তর এসেছে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতায়। তবুও আজও সংবাদপত্রের স্বাধীন ভূমিকার কথা উঠলে একটি মানুষের কথা প্রথমে উঠবেই।সংবাদমাধ্যমকে নিপীড়িত মানুষের মুখ করে তোলার প্রত্যাশার জন্ম তাঁর কলম থেকেই। তিনি হরিশ চন্দ্র মুখোপাধ্যায়।তার সম্পাদিত সংবাদপত্র ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ ছিল সংবাদজগতে এক বিপ্লব।

হিকিস বেঙ্গল গেজেট ১৭৮০ সালে প্রকাশিত হয়েছিল যা শুধু ভারতে নয়, সমগ্র এশিয়ায় প্রথম সংবাদপত্র ছিল। প্রথম বাঙালি সম্পাদক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে এসেছেন বেঙ্গল গেজেটির সম্পাদক গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য।কিন্তু সাধারণ মানুষের দুঃখ দুর্দশা, সামাজিক সমস্যা, সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনকে সংবাদ হিসেবে পরিবেশন করে হরিশ চন্দ্র মুখোপাধ্যায় ভারতে সর্বপ্রথম সংবাদপত্রের রাজনৈতিক ও সামাজিক অভিমুখ দেখান। তিনি ছিলেন ভারতীয় সংবাদপত্র জগতে পথপ্রদর্শক।তাই তাঁকে ভারতীয় সাংবাদিকতার জনক বলা হয়। মৃত্যুর আগের শেষ ছ’বছর সম্পাদনার মাধ্যমে তিনি হিন্দু প্যাট্রিয়টকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গোরা উপন্যাসে মহিম গোরার কথা বলতে গিয়ে ‘হরিশ মুখুজ্জে দি সেকেণ্ড্’ ‘ বলে বিঁধতে ছাড়ে নি। গোরা বা মহিম কাল্পনিক চরিত্র হলেও রক্তমাংসে গড়া হরিশ মুখোপাধ্যায় যে রবীন্দ্রযুগেও  অনেকটাই প্রভাব বিস্তার করেছিল তা পরিষ্কার হয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ গোরা উপন্যাস ঊনবিংশ শতকের আটের দশকে লেখা । হরিশ মুখোপাধ্যায় মাত্র ৩৭ বছর বয়সে প্রয়াত হন ১৮৬১ সালের ১৬ জুন। মৃত্যুর পরেও হরিশ মুখোপাধ্যায়ের প্রভাব ছিল অপরিসীম। দ্যা মডার্ন রিভিউয়ের সম্পাদক রামচন্দ্র চ্যাটার্জীকে ভারতীয় সংবাদপত্র জগতে প্রথম রাজনৈতিক ভাষ্যকার হিসেবে বর্ণনা করা হলেও হরিশ মুখার্জি ছিলেন ভারতীয় সাংবাদিকতার জনক।

প্রাক-স্বাধীনতা যুগে সম্পাদক ব্রিটিশ শাসনের ঘেরাটোপে কি অসাধারণ প্রভাব হরিশ মুখার্জী রেখেছিলেন তা কয়েকটি বিষয় থেকে পরিষ্কার হয়ে যাবে।তার আগে জেনে নেওয়া দরকার বিখ্যাত মানুষটির ব্যক্তি জীবন। তাঁর মধ্যে স্বদেশ প্রেম ও ভারতীয় হিসেবে আত্মসম্মান ছিল কৈশোর থেকেই। নিগার শব্দটি বলায় এক শ্বেতাঙ্গকে প্রহার করেছিলেন স্কুল জীবনে। পনেরো বছরেই স্কুলের পড়া শেষ করে কাজের সন্ধান শুরু করেন।মাত্র কুড়ি বছরে স্ত্রী ও সন্তান হারিয়ে দ্বিতীয় বিবাহ করলে সে সম্পর্ক সুখের হয় নি।ইতিমধ্যে বিল, চিঠিপত্র, পিটিশন, এবং বাংলা নথিপত্র ইংরেজিতে অনুবাদ করার মাধ্যমে তার কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। মিলিটারি অডিটর জেনারেল অফিসে কাজ পাওয়ার পরে ১৮৫২ সালে তিনি ব্রিটিশ ইন্ডিয়া অ্যাসোসিয়েশনে যোগ দেন – রাজনীতি, নেতৃত্ব, ইতিহাস এবং আইনে একজন দক্ষ ব্যক্তি হয়ে ওঠেন।১৮৫৫ সাল থেকে তিনি হিন্দু প্যাট্রিয়ট পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব নেন।

হরিশ মুখার্জীর রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি হিন্দু প্যাট্রিয়ট-এর মাধ্যমে যে সার্বিক যুগান্তর আনে।এই ইংরেজি সাপ্তাহিক বড়বাজার অঞ্চলের বিত্তশালী লগ্নিকারী মধুসূধন রায়ের স্বত্বাধিকারে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৫৩ সালে।হরিশচন্দ্র যখন এই পত্রিকায় লেখা ও সম্পাদনার দায়িত্বে নিযুক্ত হন তখন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর যে হিন্দু বিধবাদের জন্য পুনর্বিবাহ প্রবর্তনের জন্য আন্দোলন চলছে। তার সমর্থনে এগিয়ে আসেন হরিশ মুখার্জী।নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় তিনি তাঁর কলম ধরেন। হরিশচন্দ্রের কাছে সামাজিক সমস্যা,রাজনীতি ও সাংবাদিকতা ছিল অবিচ্ছেদ্য।হিন্দু প্যাট্রিয়ট দ্বারা উত্থাপিত বিষয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিষয়-ই ছিল নারী শিক্ষা এবং বিধবা পুনর্বিবাহ। কাগজে কলমে বিধবা পুনর্বিবাহ এবং নারী শিক্ষাকে বৈধকরণকে সমর্থন করেছিল এই সংবাদপত্র।এখানে বেথুনের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে আহ্বান জানানো হয় – যিনি কলকাতায় মহিলাদের জন্য একটি ধর্মনিরপেক্ষ স্কুল শুরু করেছিলেন। সেই সময়ে, নারী শিক্ষাকে হিন্দুদের, বিশেষ করে ব্রাহ্মণদের ধর্মীয় বিশ্বাসের বিরোধী হিসাবে দেখা হত।বিদ্যাসাগর, হরিশচন্দ্র এবং দ্বারকানাথের মতো উদারপন্থীরা এটিকে সমর্থন করলেও, গোঁড়া সমাজ প্রতিক্রিয়া জানায়: “কলিযুগের (অন্ধকারের যুগ) যা কিছু অবশিষ্ট ছিল, তা এসে গেছে।”

 

এখানে উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক, দ্বারকানাথ ঠাকুরের মত বিত্তশালী বুদ্ধিজীবীরা যেকোনো সামাজিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে অগ্রণী হলেও ক্ষেত্রবিশেষে নীলকরদের একটি শ্রেণীর স্বার্থরক্ষা করতেন কারণ যখনই জমিদার সম্প্রদায়ের ওপরে আঘাত এলে তাঁদের স্বার্থ ক্ষুন্ন হত।নীলচাষীদের দুর্দশা যেমন দিনবন্ধু মিত্রের নীল দর্পনে প্রকাশ পেয়েছে, তেমনই অত্যাচারিত মানুষদের বিদ্রোহ ও প্রতিবাদের ভাষা তুলে ধরেছে হরিশ মুখার্জীর লেখায়। শেষ পর্যন্ত, নীলকরদের বিরুদ্ধে রায়তদের কর্তৃক আরোপিত অভিযোগের তদন্তের জন্য একটি তদন্ত কমিশন গঠনের জন্য হরিশ্চন্দ্রের দাবি গৃহীত হয়। হরিশ মুখার্জী মনে করতেন ‘ রাজনৈতিক জ্ঞান ও ক্ষমতা ‘ হীন কৃষকদের নৈতিক শক্তিকে সমর্থন না করা পাপ। আমৃত্যু এই সংগ্রামকে তাঁর সর্বশক্তি দিয়ে রসদ যুগিয়েছিলেন তিনি। নিপীড়িত, প্রান্তিক, নিরক্ষর মানুষের আন্দোলনকে ভাষা দিয়েছিলেন তিনি। যে আন্দোলন বাংলার ধনী ও উচ্চবিত্তদের মোটেই প্রভাবিত করে নি, সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে কার্যত এককবলে সেই আন্দোলনের কথা একটানা প্রকাশ করে ব্রিটিশ শাসনের ভিত কোথাও যেন নাড়িয়ে দিয়েছিলেন ভারতীয় সংবাদপত্রের জনক হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়।।

About Post Author