Home » স্মরণের এই বালুকাবেলায়

স্মরণের এই বালুকাবেলায়

পৌলমী কবি গঙ্গোপাধ্যায়, সময় কলকাতা :

“আমি ঝড়ের কাছে রেখে গেলাম আমার ঠিকানা ”

প্রেমেন্দ্র মিত্রের ভাষায় ‘ঝড় যেমন করে অরণ্যকে’ তেমন করেই যেন বাংলা ছাড়িয়ে আসমুদ্র হিমাচল জানে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে।সাদা ধুতি, শার্ট, পরিহিত লম্বা সুঠাম চেহারার মানুষটির ইচ্ছে ছিল ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার । কিন্তু সুরের সাগরে ডুব দিয়ে শেষ পর্যন্ত ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া হল না ধুতি-শার্টের! তবে, সত্যিই কি তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং শেখেননি? না , তা একদমই বলা যায় না! সঙ্গীতের যান্ত্রিকীকরণ, মেকানিক্স, প্রকৌশল ও নির্মাণে
তাঁর জুড়ি মেলা কিন্তু ভার। সঙ্গীত শিক্ষায় দীক্ষিত হলেন কার্যত আত্মশিক্ষায়। গাইতে শুরু
করেই সুর তৈরির নেশায় পড়লেন। আর এখানেই গানের প্রকৌশলে তিনি সার্থক ইঞ্জিনিয়ার।এখানেই প্রশ্ন। সুর কি তাহলে সৃষ্টি হয়? না কি, সব সুর হয়েই আছে? শুধু খুঁজে নিয়ে নতুন চেহারা দেওয়া!

নদী,পাহাড়,ফুল, বিদ্রোহ, প্রার্থনা, প্রেম, যন্ত্রণা, সকাল,রাত্রি, রবীন্দ্রনাথ সব রয়েছে তাঁর সৃষ্টিতে। রয়েছে সুর, স্বর, উপসুর, কম্পাঙ্ক সবকিছুই । ‘পারমুটেশন-কম্বিনেশন’-এর রসায়ন জানা শান্ত মানুষটি সেখান থেকেই সুরের ইতিহাস তৈরি করেন। তাঁর গানের রসায়নে বয়ে যায় সুরের সুরধ্বনি।

বন্ধু সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের চেষ্টাতেই প্রথম গানের জগতে পদার্পণ। নবম শ্রেণিতে আকাশবাণী দিয়ে শুরু। অন্যদের সুরে কিছু গান করার পর নিজের সুরে ‘কথা কোয়ো না কো, শুধু শোনো’। তারও পরে বন্ধু অমিয় বাগচীর কথা আর নিজের সুরে ‘আজ কোনও কথা নয়’, যে সুরের চলনে যেন রবীন্দ্রনাথও রয়েছে বেশিরভাগ জায়গায়। এখানেই হেমন্ত মুখোপাধ্যায় স্বতন্ত্র।

হেমন্ত-উত্তম জুটির রসায়নে বা বাংলা-হিন্দি ছবিতে তাঁর অমোঘ কণ্ঠটিই ছিল রোমান্টিকতার ব্ল্যাঙ্ক-চেক এবং ‘সিগনেচার’। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, অতুলপ্রসাদ বা সলিল, রাহুল, হেমন্ত প্রত্যেকেরই সুরের ধরণ আলাদা। কিন্তু তা যদি বহু দিন বেঁচে থাকে, তখন বিশ্বাস করতেই হয়, বিষয়টার মধ্যে কিছু একটা আছে!‘সিগনেচার’ এটাই। এবং ‘সিগনেচার’ তৈরি করা সহজ নয়।

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মেলোডির বিজয়কেতন উড়েছে দশকের পর দশক। বেসিক রেকর্ড থেকে রুপোলি পর্দা। পুরুষকণ্ঠে, এবং সঙ্গীতায়োজনে। ‘নাগিন’ ছবিতে সাপুড়ে বিনটা!সে সুরে কে কে বাজিয়েছিলেন, তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও সুর-সঙ্গীতায়োজনের ভাবনাটা হেমন্তেরই। তার জনপ্রিয়তা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, গুজব ছড়িয়েছিল ও গান শুনলেই নাকি সাপ আসতো প্রেক্ষাগৃহে। আদতে ছিল সাপুড়ের বিনে হৈমন্তী ধুন! ‘

মোটরবাইকে সওয়ার সুচিত্রা-উত্তম আর ‘পথ যদি না শেষ হয়’ দর্শক-শ্রোতাদের মনে আজও অমলিন। ‘উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেন যেমন জুটি হিসেবে বাংলা সিনেমায় মায়াজাল বিছিয়েছিলেন, তেমনই হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় জুটি বাংলা সঙ্গীজগতকে সুরমূর্ছনায় ভরিয়ে দিয়েছিলেন। সেই সুরের ঝরনা ধারা থেকে আজও বাঙালি বেরিয়ে আসতে পারেনি। একদিকে সুচিত্রা-উত্তম, অন্যদিকে সন্ধ্যা-হেমন্তের যুগলবন্দিতে যে ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছিল, তা বাংলা সংস্কৃতি জগতে অমর অক্ষরে লেখা থাকবে চিরকাল।

হেমন্ত-সন্ধ্যার দ্বৈত-কণ্ঠে এই পথ য়দি না শেষ হয়, রাগ যে তোমার মিষ্টি আরও, আজ কৃষ্ণচূড়ার আবীর নিয়ে, ওরে বাতাস ফুল শাখাতে দিসনে আজি দোল রে, ওই দুষ্টু চোখের মিষ্টি হাসি, এই ছন্দে ছন্দে ভরা গন্ধে গন্ধে ঝরা আজও সমান জনপ্রিয়। আর হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরেও সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় অজস্র গান গেয়েছেন, কেন এ হৃদয় চঞ্চল হল, কী মিষ্টি দেখো মিষ্টি এ সকাল, আজ চঞ্চল মন যদি, প্রভূজি তুমি দাও দর্শন, তুমি কত সুন্দর, তির বেঁধা পাখি আর গাইবে না গান- এমন অজস্র গান গেয়েছেন তিনি। উদাহরণ অজস্র। যেমন, কিশোরকুমার আর সুধা মলহোত্রের গাওয়া ‘কস্তি কা খামোশ সফর’ গানটি । এ সুরের সাম্পান একান্ত ভাবে বঙ্গীয়। সুরে দাঁড় উঠছে, দাঁড় পড়ছে।

‘বন্ধু তোমার পথের সাথীকে চিনে নিও ’, ‘কোয়েল পুকারে’, ‘এই রাত তোমার-আমার’, ‘ও রাতকে মুসাফির’, ‘বসে আছি পথ চেয়ে’, ‘এই তো হেথায় কুঞ্জছায়ায়’— দীর্ঘ মেলোডি যাত্রার পাশাপাশি হেমন্ত আরও অনেক কিছু করেছিলেন। অর্থহীন সমালোচনাকে গুরুত্ব না দিয়ে বাঙালির ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন রবীন্দ্রগান, সলিল-জাদুতে গেয়েছেন ইতিহাসপ্রতিম গণগান। এবং বাংলা উচ্চারণ শিখিয়েছেন বাঙালিকে।

কোন বন্ধনীতে রাখা যাবে হেমন্ত মুখেরজীকে গণগানের বয়ানে? প্রাণের আরামে? রবীন্দ্রগানে? না কি রোমান্টিক গোত্রে— সিদ্ধান্ত নেওয়া অসম্ভব। তিনি প্রকৃত শিল্পী, যার কোনও আলাদা বন্ধনী থাকতে পারে না।সাধে কি আর পঞ্চাশ এবং ষাটের দশকের হিন্দি ছবির জনপ্রিয় অভিনেত্রী শাকিলা একবার বলেছিলেন, “হেমন্তদার গলায় সন্ধ্যাবেলার গঙ্গার ঢেউয়ের নীরবতা রয়েছে।”

” স্মরণের এই বালুকাবেলায় চরণচিহ্ন আঁকি,
তুমি চলে গেছো দূরে”, গানের শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায় আজও শ্রোতাদের কাছ থেকে দূরে যান নি। আজও বাঙালি জীবনের সঙ্গে শাখায় প্রশাখায় জড়িয়ে আছেন, জড়িয়ে আছেন ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে।সঙ্গীতপ্রেমী বাঙালি তাই তাঁর জন্মের ১০২ বছর পরেও জন্মতিথিতে, স্মরণ করে তাঁকে আর গুনগুন করে ওঠে “কাছে রবে,কাছে রবে, জানি কোনওদিন হবে না সুদূর”।।

About Post Author