সময় কলকাতা ডেস্ক: মায়া সভ্যতা এক রহস্যময় প্রাচীন সভ্যতা। খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ সাল অর্থাৎ প্রায় ৪০০০ বছর আগে এই সভ্যতা পৌঁছে গিয়েছিল উন্নতির চরম শিখরে। কিন্তু কেমন ছিল তাদের জীবনযাত্রা? তাদের সভ্যতার উন্নতি ঘটলো কিভাবে? প্রযুক্তির ব্যবহার করতে শিখলো তারা কিভাবে? কোন কোন অঞ্চলে তাদের সভ্যতার বিস্তার লাভ ঘটেছিল? তারা ছিলেন জ্যোতিবিজ্ঞান এবং পরিসংখ্যানগত দিক দিয়ে কিভাবে তারা উন্নত হয়েছিল? তারা কি ভাষার ব্যবহার করতে শিখেছিল? এমন হাজারো প্রশ্নের ভিড় জমে থাকে একটা প্রাচীন সভ্যতাকে ঘিরে। কোন সভ্যতা উন্নতির চরম শিখরে তখনই পৌঁছায় যখন কর্ম এবং মননে তার বিকাশ ঘটে। মায়া সভ্যতা তেমনই একটা সভ্যতা যে সভ্যতার পরতে পরতে ছিল চিন্তার উন্মেষ এর ছাপ। ৪০০০ বছর আগের অদ্ভুত এক পাণ্ডুলিপির আবিষ্কার হয়। যে পান্ডুলিপি কোন বর্ণমালা বা অক্ষর দিয়ে তৈরি ছিল না। যে পান্ডুলিপি সাজানো হয়েছিল অসংখ্য ছোট ছোট ছবি পাশাপাশি এঁকে। ছবির মাধ্যমে ভাষার সৃষ্টি করা হয়েছিল । বিশেষজ্ঞরা গবেষণা করে এই পান্ডুলিপি থেকেই প্রথম সন্ধান পান মায়া বা মায়ান সভ্যতার। ওই পান্ডুলিপি থেকেই মায়া সভ্যতার প্রথম রহস্যের শুরু। গবেষকরা যত গবেষণা করেছেন খনন কার্য চালিয়েছেন ততই একের পর এক গবেষকদের সামনে এসেছে অসংখ্য রহস্যময় বিষয়।

মায়ারা আদতে ছিল মিশু আমেরিকা বা মধ্যম আমেরিকা সবচেয়ে পরাক্রমশালী প্রাচীনতম জাতি। মায়াদের বিস্ময়কর নির্মাণ আর জ্যোতির্বিজ্ঞানের আলোচনার আগে মায়াদের ভৌগলিক অবস্থান দেখে নেওয়া যাক। মায়ারা গুয়েতে মালা হান্ডুরাস ,এল সালভাদর ,মেক্সিকোর তাবাস্কো, চিয়াপাস সহ প্রায় ১৫০০ কিলোমিটার জুড়ে তাদের সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিল। মেক্সিকো গুয়াতে মালা হান্ডুরাস বেলিজ এবং এল সালভাদর এই ৫ দেশ নিয়ে প্রায় ৩ সহস্রাবদীর বেশি সময় জুড়ে গড়ে উঠেছিল মায়া সভ্যতা। যদিও এই অঞ্চলে মানুষের বসবাসের প্রমাণ পাওয়া যায়, ১১ হাজার বছর আগে থেকেই। পুরানো ওলমেক ও এজটেক সভ্যতার উপর গড়ে উঠেছিল মায়া সভ্যতা।
মায়াদের রাষ্ট্রের গঠনতন্ত্র এবং রাষ্ট্র পরিচালনার গঠনতন্ত্রই তাদের অন্যান্য জাতির থেকে অনেকটাই এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। বিভিন্ন প্রাচীন সভ্যতায় দেখা যায় সভ্যতার বিস্তার বিভিন্ন অঞ্চল জুড়ে হওয়ায় তারা সঙ্ঘবদ্ধ ছিল না কিন্তু মায়ারা ছিল সংঘবদ্ধ। সঙ্ঘবদ্ধ থাকার কারণেই অনেক শক্তিশালী জাতিরাও মায়া সাম্রাজ্যে প্রবেশ করতে পারেনি।
ঐতিহাসিকদের মতে প্রায় কুড়ি হাজার বছর আগে আদিম মানুষরা গুহাচিত্র আঁকতে শিখেছিল। তখন থেকেই কার্যত মানুষের ইতিহাসের শুরু আর তার আগের কাল প্রাগৈতিহাসিক কাল। গুহাচিত্র আঁকা শিখলেও তখনও মানুষ ভাষার প্রয়োগ শিখিনি। আকার ইঙ্গিত ইশারায় মানুষ তাদের ভাব ব্যক্ত করত। জন্তু-জানোয়ারদের হাত থেকে বাঁচার জন্য তারপর মানুষ শিখল পাথরের ব্যবহার যে যুগকে বলা হয় প্রস্তর যুগ। ডারউইন সহ একাধিক বিজ্ঞানী ঐতিহাসিকের মতে মানুষ যেদিন থেকে ভাষার ব্যবহার এবং আগুনের ব্যবহার শিখলো ।সেদিনই কার্যত মানব সভ্যতার ইতিহাসের মাইল ফলক। মায়া সভ্যতার পান্ডুলিপিতে প্রায় ৮০০টি ছবির ব্যবহার করা হয়েছে। যার মাধ্যমে মায়ারা সৃষ্টি করেছিল ব্যাবিলনের হাম্বু রাব্বি র নিয়মাবলী বা পিরামিডের দেওয়াল চিত্রের মত হিয়েরোগ্লিফিক্স। এ তো গেল মায়াদের ভাষার উন্নতি সাধন। মায়ারা কৃষিকাজ গৃহস্থলী কাজের জন্য বাসনপত্রের ব্যবহারও শিখে গিয়েছিল। তাদের সভ্যতা গড়ে উঠেছিল মূলত নদীকেন্দ্রিক হয়ে। কারণ কৃষি কাজ এবং নৌ পরিবহনের জন্য নদীর ব্যবহার সে যুগেই শিখেছিল মায়ারা। যদিও সে যুগেও নদীর ব্যবহার শিখেছিল আরও বহু সভ্যতা সিন্ধু সভ্যতা ,মিশরীয় সভ্যতা, গ্ৰীক সভ্যতা, ব্যাবিলন সভ্যতা ,ইনকা সভ্যতা ,চৈনিক সভ্যতা। মায়ারা তাদের মধ্যে ছিল আরেকটু প্রাচীন তবে নদীর ব্যবহার রপ্ত করায় ধীরে ধীরে মায়া সভ্যতা অন্যান্য সভ্যতাকে পিছনে ফেলে এগিয়ে গিয়েছিল।
ধর্ম এবং দেব দেবীর প্রতি মায়াদের ছিল অগাধ বিশ্বাস। মায়ারা জ্যোতি বিজ্ঞানে অগাধ উন্নতি সাধন করেছিল। মায়াদের এক যুগ হল ৫২০০ বছর নিয়ে। মায়াদের হিসাব অনুযায়ী ৩১১৪ বছর আগে যুগ শুরু হয়েছিল এবং সেই যুগ মায়াদের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ২০১১-১২ সালে শেষ হয়ে যায়। মায়েদের ক্যালেন্ডার ২০১২ সালের শেষ হওয়ার কারণেই অনেকেই গুজব রটাতে থাকেন মায়া সেসময় সংখ্যাতত্ত্বের সাহায্যে হিসাব করে বলে গিয়েছিলেন মহাপ্রলয় আসন্ন যদিও তার বৈজ্ঞানিক ভিত্তিক পাওয়া যায়নি। মায়েদের সৃষ্টিতত্ত্ব অনুযায়ী পৃথিবীর সমতল চতুষ্কোণ এবং চারকোণকে ধরে রেখেছে চারজন দেবতা। মায়ারা মনে করতো পৃথিবী অনেকটাই কুমিরের পিঠের আকৃতির। বিভিন্ন রঙের সাহায্যে তারা পৃথিবীর আকৃতি বর্ণনা করে গিয়েছিল। মায়া জ্যোতির বিজ্ঞান অনুযায়ী পৃথিবীর পূর্ব কোন লাল রঙের পশ্চিম কোন কালো উত্তর কোন সাদা এবং দক্ষিণ কোণ হলুদ আর কেন্দ্রের রং হলো সবুজ। মায়ারা মনে করত আকাশকে ধরে রেখেছেন চারজন শক্তিশালী “বাকার” দেবতা। মায়ারা বিশ্বাস করতো স্বর্গ আর মর্তের অস্তিত্ব। তাদের মতে স্বর্গ ছিল ১৩ স্তর বিশিষ্ট আর মর্ত্য ছিল ৯ স্তরের।
মায়রা সে যুগে জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং জ্যোতির গণনা নিয়েও গবেষণা করতেন। মায়েদের ক্যালেন্ডারে ২৬০দিনের দিনচক্রের হদিশ পাওয়া গিয়েছিল।২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দুটি ম্যুরাল খণ্ড মায়া ক্যালেন্ডারের প্রাচীনতম ব্যবহারের প্রমাণ বহন করে। ক্যালেন্ডারের তারিখ “৭ হরিণ বর্ণনা করা হয়েছিল। মায়ার আর সে যুগেও পষ মন্দির, পিরামিড, মান মন্দির নির্মাণ করেছিল। মান মন্দিরের নির্মাণ থেকেই বোঝা যায় সে যুগে মায়ারা জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা চালাতেন। আর এখান থেকে প্রশ্ন উঠে কিভাবে তারা সে যুগে এত উন্নতি করেছিল?
মায়া সভ্যতার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য হল এই চিচেন ইটজা। স্থানীয় ভাষায় একে এল কাস্টিলো-ও বলে অনেকে। এই মন্দিরের অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল গুরুত্বও বিশেষ তাত্পর্যপূর্ণ। পিরামিডের আকারে নির্মিত এই উপাসনাস্থলের প্রতিটি দিকে ৯১টি করে সিঁড়ি রয়েছে। এখানে মোট সিঁড়ির সংখ্যা ৩৬৫। অর্থাত্ বছরের প্রতিটি দিন সিঁড়ির এক একটি ধাপের সঙ্গে সমার্থক।
মেক্সিকোর পূর্ব সমুদ্রতটে ইউকাটান পেনিনসুলায় টুলুম অবস্থিত। সভ্যতার পশ্চিমাংশে বর্তমানে মে
ক্সিকোর শিয়াপাস অঞ্চলে অবস্থিত তৎকালীন মায়া সাম্রাজ্যের অন্যতম নিদর্শন পালেংক। মায়া সভ্যতার সবচেয়ে প্রাচীন এবং উৎকর্ষতার অনন্য নমুনা উক্সমাল । উক্সমাল শব্দের অর্থ ‘তিন সময়ে নির্মিত’। মায়া সভ্যতার সবচেয়ে পরিচিত ও দীর্ঘতম স্থাপত্য এটি। উন্নত এক সভ্যতা ক্রমে ক্রমে পতনের দিকে এগিয়ে গিয়েছিল কেন? এ কেনর উত্তর নিয়ে একাধিক বিশেষজ্ঞের একাধিক মত। অনেকে মনে করেন ধ্রুপদী যুগের শেষে মায়া সাম্রাজ্যে রোগ মহামারী আর ব্যাধি থাবা বসিয়েছিল অনেকটাই ফলে জনসংখ্যা কমতে শুরু করেছিল। তার ফলেই সাম্রাজ্যের পতন হয়। আবার কিছু কিছু ঐতিহাসিকের মতে অতিমাত্রায় পশুনিধন বৃক্ষ নিধন প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে নষ্ট করে ফেলেছিল আর সে কারণেই কোন ভূমিকম্পের ফলেই মায়া সাম্রাজ্যের পতন হয়েছিল। সম্প্রতি বিজ্ঞানীদের মতে মায়া সাম্রাজ্যের পতন হয়েছিল মূলত জলের অভাব থেকে। প্রবল খরার কারণে পৃথিবী থেকে মুছে গিয়েছিল মায়া সাম্রাজ্য। মায়া সাম্রাজ্যের পতনের কারণ যাই হোক এ কথা বলা যেতেই পারে আজ থেকে চার হাজার বছর আগে পৃথিবীর বুকে এমন এক সভ্যতা ছিল যে সভ্যতায় ছিল আধুনিকতা উন্নত প্রযুক্তি, উন্নত রাষ্ট্র ব্যবস্থা আর চিন্তার বিকাশ। সে যুগের মানুষ আর তাদের চিন্তাভাবনা আজও আমাদের প্রভাবিত করে।


More Stories
নেতা নয় নায়ক, যমের অরুচি, ঋতব্রতকে ভয়ঙ্কর আক্রমণ শতরূপের
কেক কেটে ঈদ উদযাপন
বউ বদল : ময়নাগুড়িতে স্বামী-স্ত্রীর বদলাবদলি নাকি বদলা ?