চুমকি সূত্রধর, সময় কলকাতা,১৫ ফেব্রুয়ারিঃ কেন্দ্রের পর এবার নজর রাজ্যের বাজেটে। বুধবার অর্থাৎ আজ রাজ্যের বাজেট পেশ। রাজ্যের অর্থ বিভাগের রাষ্ট্রমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য এদিন দুপুর ২টো নাগাদ বিধানসভায় ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষের বাজেট পেশ করতে চলেছেন। বাজেট নিয়ে পরামর্শ দিয়েছেন রাজ্যের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী ও আর্থিক উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারম্যাটন অমিত মিত্র। স্টার্টআপ এবং উৎপাদন খাতে বরাদ্দ, জনকল্যাণমুখী প্রকল্পে বরাদ্দ থেকে রাজ্যের কোষাগার-কি কি চমক থাকতে পারে এবারের বাজেটে? কৌতুহল কিন্তু তুঙ্গে।উল্লেখ্য, আয়ের সঙ্গে ব্যয় সামাল দিতে যে রাজ্যগুলির ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা, সেই তালিকায় উপরের দিকেই আছে পশ্চিমবঙ্গ। বিভিন্ন সময়েই কেন্দ্রীয় বঞ্চনার বিরুদ্ধে সরব হতে দেখা গিয়েছে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। বারবার অভিযোগ তুলেছেন টাকা দিচ্ছে না কেন্দ্র। এর ওপর লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, স্বাস্থ্যসাথী সব বিভিন্ন জনকল্যাণমুখী প্রকল্প সহ বিভিন্ন ধরনের ভাতা দিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে বিপুল টাকা ব্যয় করতে হয়। তার উপর সরকারি কর্মচারীদের মহার্ঘভাতা দেওয়ার দায় তো মাথার উপর ঝুলছেই। আদালত নির্দেশ দিলে এই খাতেই এককালীন ৪০ হাজার কোটি টাকার বোঝা চাপতে পারে রাজ্যের ঘাড়ে।

এসবের মাঝেই সামনে পঞ্চায়েত ভোট। আর বছর ঘুরতেই রয়েছে লোকসভা নির্বাচন। এই দুই মহারণের আগে মানুষের মন জয় করতে এই বাজেট একটা বড় ফ্যাক্টর। স্বাভাবিকভাবেই সমস্ত প্রকল্পের মাধ্যমে মানুষের পরিষেবা চালু রাখতে বাড়তি আয় তো প্রয়োজন। কিন্তু আয় বাড়ানোর নয়া পথ যেমন সীমিত, তেমনই রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। এই পরিস্থিতিতে রাজ্যের অর্থনীতিকে সচল রাখতে কি কি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারে রাজ্য, সেদিকেই নজর রাজ্য তথা দেশবাসীর।

এক নজরে দেখে নেওয়া যায়, কি কি বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়া হতে পারে এবারের বাজেটে?
১.’দিদির দূত’ দের কাছে রাস্তার দাবি
বাজেটে তহবিলের কথা ঘোষণা হতে পারে,কেননা সামনেই পঞ্চায়েত ভোট। তার আগে খাতা পেনসিল দিয়ে ‘দিদির দূত’দের গ্রামে পাঠিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানেই দেখা গেল, তাদের সেই খাতা ভরে গেছে ‘পথের দাবি’তে। কোথাও নতুন রাস্তার দাবি, কোথাও দাবি ভাঙা রাস্তা সারানোর। উল্লেখ্য, আগে গ্রামে নতুন রাস্তা তৈরি ও পুরনো রাস্তা সংস্কারের একটা বড় টাকা পাঠান কেন্দ্র। যোজনা কমিশনের সুপারিশ মেনে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় দিল্লিই অনেকটা দায়িত্ব নিত। দ্বিতীয় ইউপিএ জমানায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন শরিক নেত্রী, তখন এই খাতে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পেয়েছিল বাংলা। কিন্তু সেই পর্ব এখন অতীত। গ্রামীণ সড়ক নির্মাণে অনিয়মের ধুয়ো তুলে আপাতত বরাদ্দে রাশ টেনে রেখেছে দিল্লি। এই পরিস্থিতিতে, নবান্নের সামনে দুটি বিকল্প থাকতে পারে। এক, দিল্লির বরাদ্দের অপেক্ষা করা। দুই, অর্থসংস্থানের জন্য নিজেদেরই চেষ্টা করা। বেশ কিছুদিন আগেই আলিপুরদুয়ারের সভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী কেন্দ্রকে তোপ দেগে জানিয়েছিলেন, জনকল্যাণমুখী কাজে কেন্দ্র বরাদ্দ না দিলেও এ রাজ্যে উন্নয়ন কোনওভাবে থমকে থাকবে না। ১৫ ফেব্রুয়ারি রাজ্য বাজেট পেশ হবে। সেই বাজেটে গ্রামের রাস্তার জন্য বড় অঙ্কের বরাদ্দ করতে পারেন মুখ্যমন্ত্রী। বাজেটে তহবিলের কথা ঘোষণা হতে পারে।

২.প্রাধান্য পাবে গ্রামীণ সেক্টর
সামনেই পঞ্চায়েত ভোট। এবারের বাজেট হবে ভোটমুখী। বাড়ি বাড়ি পরিশ্রুত পানীয় জল, বাড়ি, কৃষি সহ একাধিক ক্ষেত্রে নয়া ঘোষণা থাকতে পারে এবারের বাজেটে।
৩.কর্মসংস্থানে জোড়, স্টার্ট আপ নিয়ে আশাবাদী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য!
শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির অভিযোগে বিদ্ধ রাজ্যের শাসকদল। বারবার বিরোধীদের আক্রমণের মুখে পড়ছে রাজ্যের শাসকদল। এই পরিস্থিতিতে রাজ্যের বাজেটে কর্মসংস্থানে আরও জোড় দেওয়া হতে পারে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
৪.শিল্পের জন্য নতুন নীতির ঘোষণা হতে পারে
২০২৩-২৪ সালের বাজেটে শিল্পের জন্য নয়া কিছু নীততি ঘোষণা করতে পারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। পড়ে থাকা জমিকে আইনের মাধ্যমে ফিরিয়ে রাজ্যের হাতে নেওয়ার পরিকল্পনাও থাকতে পারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের।
৫.ক্ষুদ্র শিল্পে জোড়
রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের উন্নতিতে এবং সব ধরনের মানুষের কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে চমকপ্রদ বরাদ্দ ঘোষণা করতে পারে রাজ্য সরকার।

৬.চুক্তিভিত্তিক কর্মচারীদের বেতন বাড়তে পারে
বহুদিন ধরেই বেতন পাওয়ার এবং বৃদ্ধির দাবিতে নিজেদের আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন আশাকর্মী, আইসিডিএস কর্মী সহ অন্যান্য চুক্তিভিত্তিক কর্মীরা। এবারের বাজেটে তাঁদের জন্য কিছু চমক থাকতে পারে বলেই মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল।
৭.ডিএ নিয়ে নয়া চমক থাকতে পারে রাজ্যের বাজেটে
মহার্ঘ ভাতার দাবিতে আন্দোলনে তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি। তিলোত্তমা থেকে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ডিএ-র দাবিতে আন্দোলনে সামিল সরকারি কর্মীরা। এই পরিস্থিতিতে ডিএ নিয়ে চমক থাকতে পারে এবাবের বাজেটে।
৮.চমক থাকতে পারে রেশন প্রকল্পেও
২০২২ সাল শেষের আগেই আমজনতার জন্য সুখবর দিয়েছিল কেন্দ্র। ২০২৩-এর ডিসেম্বর পর্যন্ত বিনামূল্যে রেশন দেবে কেন্দ্রীয় সরকার, এমনটাই ঘোষণা কেন্দ্রীয় খাদ্যমন্ত্রীর। যদিও, বেশ কিছুদিন আগেই রেশন নিয়েও কেন্দ্রকে আক্রমণ শানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি জানিয়েছিলেন, কেন্দ্রীয় বাজেটে খাদ্যের সাবসিডি তুলে দিয়েছে প্রায়। জনগণ যাতে আর রেশন না পায়। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এবারের বাজেটে রেশন প্রদান নিয়ে বেশ কিছু ঘোষণা করতে পারে রাজ্য।

৯.স্বাস্থ্যখাতে থাকতে পারে নয়া চমক
স্বাস্থ্যখাতে নয়া চমক থাকতে পারে এবারের বাজেটে। নতুন মেডিক্যাল কলেজ হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকলেও এবারের বাজেটে বেশ কিছু হাসপাতালে পরিকাঠানোর উন্নতিতে বেশ কিছু বরাদ্দ ঘোষণা হতে পারে এবারের বাজেটে। বরাদ্দ থাকতে পারে মহিলাদের চিকিত্সা পরিষেবার উন্নতির ক্ষেত্রেও।
১০.আয় বাড়াতে কর বৃদ্ধির ঘোষণা হতে পারে ?
বারবার কেন্দ্রের বিরুদ্ধে রাজ্যের বরাদ্দ আটকে রাখার অভিযোগ তুলেছে রাজ্য। রাজনৈতিক মহলের মতে, আর্থিক দিক থেকে এই মুহূর্তে যে খুব একটা স্বচ্ছল রয়েছে রাজ্য সরকার, তা মোটেই নয়। বারবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে বিভিন্ন দফতরের মন্ত্রীরা যোগাযোগ করছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের সঙ্গে। তবুও সেরকম আশানুরুপ ফলাফল মেলেনি বলেই জানা গিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আয় বৃদ্ধিতে কি কর বৃদ্ধির ঘোষণা করতে পারে রাজ্য সরকার, সেদিকেই কিন্তু তাকিয়ে মানুষ। যদিও, বেশ কিছুদিন আগেই কেরল সরকার আয় বাড়াতে কর বৃদ্ধির ঘোষণা করে কার্যত জনবিক্ষোভের মুখে পড়েছে। বহুদিন রাজ্যের সিপিএম পরিচালিত রাজ্য সরকারকে এমন প্রতিবাদের মুখে পড়তে হয়নি। বিরোধীদের প্রতিবাদের মুখে বিধানসভার অধিবেশন সাময়িক স্থগিত করে দিতে হয় দক্ষিণী রাজ্যটিকে। সরকার বিরোধী আন্দোলনের মূলে আছে রাজ্যের আয় বাড়াতে বাজেটে সেস এবং কর বৃদ্ধির ঘোষণা। কেরল সরকারের বক্তব্য, নিরুপায় হয়ে কর বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। আয় না বাড়ালে রাজ্য অচল হয়ে পড়বে। যদিও, যুক্তরাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোতে রাজ্যের হাতে কর বাড়ানোর ক্ষমতা অনেকটাই কম। এই পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গ কি করতে পারে, সে দিকেই তাকিয়ে মানুষ।


More Stories
শ্লীলতাহানির অভিযোগে গ্রেফতার জয়প্রকাশ
বিরোধী দলনেতার স্বীকৃতি তৃণমূল থেকে বহিস্কৃত ঋতব্রতকে
অভিষেকের দুয়ারে ইডি