সময় কলকাতা ডেস্ক,১৩ জুলাই : গ্রাম বাংলা কার দখলে থাকবে এ নিয়ে আগ্রহ ছিল । হিংসা অব্যাহত ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। নির্বাচনের ফলাফলও প্রকাশিত।একুশের বিধানসভার পর রাজ্যের ত্রিস্তর পঞ্চায়েত নির্বাচনেও নিজেদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য বজায় রাখল বাংলার শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস।কিন্তু কী ইঙ্গিত নিয়ে এসেছে এবারের পঞ্চায়েত ভোট? ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনের সঙ্গে তুলনা করলে অবশ্যই বিরোধীদের শক্তিবৃদ্ধির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কীসের ইঙ্গিত দিচ্ছে এবারের পঞ্চায়েত নির্বাচনের ফলাফল? বিগত পঞ্চায়েত নির্বাচনের সঙ্গে তুলনা করলেই চিত্র অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে যাবে।যদিও শাসক দলের অস্বস্তির বিষয়টি বুঝতে হলে আরও কিছুটা গভীরে যেতে হবে।
প্রথমেই আসা যাক এবছর ত্রিস্তর পঞ্চায়েতের ফলাফলে। ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনের সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণে গিয়ে দেখা যাক ঠিক কী চিত্র ধরা পড়েছে এবার গ্রাম পঞ্চায়েতের ফলাফলে? ২০১৮ গ্রাম পঞ্চায়েতে মোট আসন ৬৩২২৯। এরমধ্যে তৃণমূল পেয়েছে ৪২ হাজার ৬২২ টি আসন। বিজেপি পেয়েছে ৯৭৭৭ টি আসন।সিপিএম পেয়েছে ২৯৮৮টি আসন। কংগ্রেস পেয়েছে ২৫৭৬ টি আসন। অন্যান্যরা পেয়েছে ২৫৭৯ টি আসন। এবার আসা যাক তুলনায়। ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে লড়াই হয়েছিল প্রায় ৪৮৬৫০ টি আসনে। এরমধ্যে গ্রাম পঞ্চায়েতে তৃণমূল কংগ্রেস একাধিপত্য জাহির করেছিল।তৃণমূল কংগ্রেস গ্রাম পঞ্চায়েতে পেয়েছিল ৩৮১১৮ টি আসন। বিজেপি পেয়েছিল ৫৭৭৯ টি আসন। বামেরা পেয়েছিল ১৭১৩ টি আসন। কংগ্রেস পেয়েছিল ১০৬৬ টি আসন। গ্রাম পঞ্চায়েতে অন্যদের দখলে ছিল ১৯৬০ টি আসন। অর্থাৎ দুটি পঞ্চায়েত নির্বাচনের তুলনায় এসে যদি শুধুমাত্র গ্রাম পঞ্চায়েতের নিরিখে চর্চা করা যায় তাহলে দেখা যাবে পাব প্রায় ১৫০০০ আসন সংখ্যা বেড়েছে এবং প্রতিটি রাজনৈতিক দলের আসন সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।এবার আসা যাক, পঞ্চায়েত সমিতির তুলনামূলক আসন বিশ্লেষণে। ২০২৩ সালে পঞ্চায়েত নির্বাচনে পঞ্চায়েত সমিতির মোট ৯৭৩০ টি আসনের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেস ৭২৬৮ টি আসন পেয়েছে। বিজেপি পেয়েছে ১,০১০টি আসন। সিপিএম পেয়েছে ১৭৯টি আসন। কংগ্রেস পেয়েছে ২৭৮ টি আসন। কী ছিল ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে পঞ্চায়েত সমিতির ফলাফল? তৃণমূল সেবার পায় ৮০৬২ টি আসন। বিজেপি পেয়েছিল ৭৬৯ টি আসন।বামেদের ঝুলিতে যায় ১২৯ টি আসন। কংগ্রেসের পঞ্চায়েত সমিতিতে প্রাপ্ত আসন ১৩৩। অন্যরা পেয়েছিল ১২১ টি আসন। জেলা পরিষদের তুলনামূলক পর্যালোচনায়।২০২৩ সালে জেলা পরিষদের ৭৭৩টি আসন পেয়েছে শাসক তৃণমূল। পরের স্থানটি বিজেপির। তারা পেয়েছে ২৯ টি আসন। সিপিএম ২টি আসন ও কংগ্রেস ১১ টি আসন পেয়েছে। জেলা পরিষদে অন্যরা পেয়েছে ২ টি আসন। কী ছিল ২০১৮ নির্বাচনের চিত্র? ৭৯৩ আসন পেয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস। বিজেপি ২২ টি আসন পেয়েছিল। বামেদের আসন ছিল ১টি, কংগ্রেসের আসন ছিল ৬টি, অন্যরা পেয়েছিল ২টি আসন। জেলা পরিষদের চিত্র থেকে অত্যন্ত পরিষ্কার আসনের সংখ্যাগত তারতম্য ঘটেনি। অর্থাৎ জেলা পরিষদে বিরোধীদের আসন হাতে গোনা। ২০১৮ সালে জেলা পরিষদে ৮০০ র কাছাকাছি আসন পাওয়া তৃণমূল কংগ্রেস এবারও তাদের আসন সংখ্যা মোটের ওপরে ধরে রেখেছে। ২০১৮ সালে বিজেপি, বাম, কংগ্রেস ও অন্যান্যরা মিলে হাতেগোনা ৩১ টি আসন পেয়েছিল। এবারও ছবি বদলায়নি।অন্যান্য দলকে নিয়েও জেলা পরিষদে বিজেপি, কংগ্রেস ও বামেদের আসন মাত্র ৪৪। পাঁচ বছরে ত্রিস্তর পঞ্চায়েতের জেলা পরিষদের ফলাফলের নিরিখে কোন ইঙ্গিতবাহী পরিবর্তন নেই। তৃণমূলের একাধিপত্যের ট্রেডিশন চলছে।
এ কথা ঠিক যে, গ্রাম পঞ্চায়েত ও পঞ্চায়েত সমিতির পঞ্চায়েত সমিতির আসনে বিরোধীদের কিছুটা হলেও সংখ্যাবৃদ্ধি হয়েছে। কিন্তু পাশাপাশি একথা মাথায় রাখতে হবে যে, এবারে গতবারের তুলনায় বেশি আসনে ভোট হয়েছে যা কিনা প্রায় সবমিলিয়ে ১৫০০০ -এর কাছাকাছি। শাসকদলের প্রধান বিরোধী তিনটি রাজনৈতিক দলের আসন বেড়েছে। সিপিএম,কংগ্রেস ও বিজেপি তিনটি রাজনৈতিক দলের গ্রাম পঞ্চায়েতে আসন বেড়েছে যথাক্রমে ১ হাজার থেকে প্রায় ৪ হাজার। অন্যদিকে তৃণমূলও নিজেদের আসন বাড়িয়ে নিয়েছে প্রায় সাড়ে চার হাজার।ফলে আসন সংখ্যার নিরিখে ও কেবলমাত্র সংখ্যাতত্ত্বিক আলোচনায় বলা যেতে পারে যে, পাঁচ বছরের অন্তরে হওয়া দুটি পঞ্চায়েত নির্বাচনের তুলনামূলক বিশ্লেষণে তৃণমূলের উল্লসিত হওয়াই স্বাভাবিক এবং আতঙ্কিত হওয়ার কোনও জায়গা নেই। সার্বিকভাবে এরকম বলাও যেতে পারত। তবুও অশনি সংকেত থেকেই যাচ্ছে শাসক দলের কাছে। কোন তথ্যের ভিত্তিতে ও কি কারনে দুশ্চিন্তার ভাঁজ দেখা দিতে তৃণমূলের নীতি নির্ধারকদের কপালে?
নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ পঞ্চায়েত ভোটে এখনও প্রাপ্ত হিসেব অনুযায়ী ভোট শতাংশের নিরিখে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। ২০১৮ সালের চেয়ে অবশ্যই বিরোধীদের আসন বাড়লেও তৃণমূল তাদের প্রাধান্য কায়েম রেখেছে। কিন্তু যা ভোট পড়েছে, ফলাফল গণনার দুদিন পরে,প্রাপ্ত ফলের নিরিখে সেই ভোটের শতাংশগত হিসাবে তৃণমূলের গ্রাফ কিছুটা হলেও নিম্নগামী।তৃণমূলের ভোট শতাংশ দাঁড়িয়েছে ৫১.১৪। এরপর রয়েছে বিজেপি। তবে তারা অনেকটাই পিছিয়ে। ভোট শতাংশের নিরিখে তাদের ঝুলিতে রয়েছে ২২.৮৮ এর অঙ্ক। এরপরই রয়েছে সিপিআইএম ও তারপর কংগ্রেস। এই অংক নিশ্চিতভাবে কিছুটা হলেও পাল্টাবে। তবুও প্রাপ্ত ফলাফলের নিরিখে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করার ক্ষেত্রে, যদি ২০১৮ সালের নির্বাচনের দিকে নজর রাখা হয় তাহলে গ্রাম বাংলার ৭২ শতাংশ ভোট পড়েছিল তৃণমূলের ঝুলিতে। ১৩ শতাংশ ভোট ছিল বিজেপির। বাম ও কংগ্রেসদের ঝুলিতে ছিল যথাক্রমে ৬ ও ৫ শতাংশ ভোট। অর্থাৎ একথা অত্যন্ত সুস্পষ্ট যে, প্রায় কুড়ি শতাংশ মানুষের আশীর্বাদ ভোট বাক্সে হারাতে চলেছে তৃণমূল। যদিও বিরোধীদের একজোট হয়ে লড়াই করার কোনও সমীকরণ সুস্পষ্টভাবে সামনে আসেনি কারণ বিরোধীরা জানে সার্বিকভাবে একজোট হলে নির্বাচনী ইস্যুর চেয়ে ধর্মভিত্তিক ভোট বিভাজনে ফায়দা হতে পারত তৃণমূল কংগ্রেসের। আর এখানেই উঠছে প্রশ্ন। আইএসএফ প্রথম পঞ্চায়েত নির্বাচনে প্রচুর আসন না পেলেও সাড়াজাগানো ফল করছে, রয়েছে মানুষের সমর্থন। সংখ্যালঘু বেল্টগুলিতে জায়গায় জায়গায় আইএসএফ ও তৃণমূল কংগ্রেস সম্মুখ সমরে ভিড়েছে যার প্রতিফলন যেমন ভোটের বাক্সে দেখা গিয়েছে, তেমনই দেখা গিয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতায় ও অশান্তির চিত্রে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙ্গড় ও উত্তর ২৪ পরগনার আমডাঙ্গা ব্লকের গ্রাম পঞ্চায়েত গুলি তৃণমূল ও আইএসএফের রাজনৈতিক ভাবে নিজেদের অধীনে আনার প্রচেষ্টার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। সংখ্যালঘু ভোট বিভাজন অবশ্যই দুশ্চিন্তা বাড়াতে পারে তৃণমূলের। যেমনটা হিন্দু ভোট নিজেদের দিকে টানার ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও সফল বিজেপি। আসন খুব বেশি না বাড়লেও শতাংশগত ভোটের নিরিখে তৃণমূলকে কিছুটা হলেও ধাক্কা দিয়েছে বিজেপি যা পরিসংখ্যান থেকে অত্যন্ত পরিষ্কার।
সবমিলিয়ে,একুশের বিধানসভার পর রাজ্যের ত্রিস্তর পঞ্চায়েত নির্বাচনেও নিজেদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য বজায় রেখেছে বাংলার শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। রাজ্যের ৩ হাজার ৩১৭টি গ্রাম পঞ্চায়েতের মধ্যে তৃণমূল জয়ী হয়েছে ২ হাজার ৬৪১ টিতে। শতাংশের হিসেবে ৭৯.৭১ অর্থাৎ প্রায় ৮০ শতাংশ গ্রাম পঞ্চায়েত শাসকদলের দখলে। বিজেপি জিতেছে ২৩০টি আসনে। কংগ্রেসের ঝুলিতে ১১ টি এবং বামেরা জিতেছে ১৯ টি। নির্দল সহ অন্যান্যরা জিতেছে ১৪৯টি আসনে। ত্রিশঙ্কু রয়েছে ২৬৭ টি গ্রাম পঞ্চায়েত। ৩৪১ টি পঞ্চায়েত সমিতির মধ্যে ৩১৩ টি তৃণমূলের দখলে। ৭ টিতে বিজেপি এবং বামেরা ২ টিতে। তবে, দেখা নেই কংগ্রেসের। এদিকে, রাজ্যের ২০ তো জেলা পরিষদেই তৃণমূলের জয়জয়কার। এই জয়জয়কারের মধ্যেও কোথাও একটা অস্বস্তি রয়েই যাচ্ছে। ২০০৮ সালে তৎকালীন শাসক দল বামেদের দুর্গ পতনের ইঙ্গিত মিলেছিল। ২০০৮ সালে ও হিংসা ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল, ২০২৩ সালেও উঠছে একই অভিযোগ। শাসক দলের বিরুদ্ধে বঙ্গে অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। তবুও ২০০৮ সালের পঞ্চায়েত ভোটে তৎকালীন শাসক তৎকালীন শাসক বামেদের ৪৯ শতাংশ মানুষ ভোট দিলেও কংগ্রেস ও তৃণমূল এবং তাদের মধ্যে হওয়া জোট তাদের শক্তি বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিয়েছিল। সেবার তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছিল ২৪ শতাংশর কিছু বেশি ভোট। তাদের সঙ্গে সেসময়ের কংগ্রেসও ভালো ফল করেছিল। উল্লেখযোগ্যভাবে সেবার অনেক বেশি আসন দখল করেছিল বিরোধীরা যার মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের উত্থান ত্রিস্তর পঞ্চায়েতের সর্বত্র চোখে পড়েছিল। ২০২৩ সালে বিরোধীদের সার্বিকভাবে সাফল্য চোখে পড়ছে না তথাপি তার মধ্যেও সেভাবে আসন না পেলেও উত্থানের ইঙ্গিত দিয়েছে আইএসএফ। শতাংশগত ভোটের নিরিখে বিজেপি কিছুটা দাগ কেটেছে যদিও আসন সংখ্যার নিরিখে গেরুয়া শিবির খুব বেশি ডালপালা ছড়াতে পারেনি। এ কথাও ঠিক দীর্ঘ ১২ বছর রাজ্যে শাসন করার পরে সাধারণ মানুষের মধ্যে শাসক দলের বিরুদ্ধে কিছুটা হলেও ক্ষোভ,অভিযোগ জন্মায়। তার মধ্যেও তৃণমূল তাদের একাধিপত্য অন্তত আসন সংখ্যার নিরিখে বজায় রেখেছে। তথাপি গ্রাম বাংলার মানুষের আশীর্বাদ কিছুটা হলেও কমেছে শতাংশগত ভোটের নিরিখে তেমনটা বলাই যায়। পঞ্চায়েত নির্বাচন শাসকবিরোধী রাজনৈতিক দলদের সেরকম ইঙ্গিতবাহী উত্থান না থাকলেও শাসকদলের সামান্য হলেও দুশ্চিন্তা থেকেই যাচ্ছে।।


More Stories
মোথাবাড়ি কাণ্ডের অশান্তির নেপথ্য “খলনায়ক” মোফাক্কেরুল ইসলাম গ্রেফতার কিসের ইঙ্গিত?
বকেয়া ডিএ-র সুখবর : কবে টাকা পাবেন সরকারি কর্মী ও পেনশনভোগীরা?
এবারের ভোট বাংলার আত্মাকে রক্ষা করার লড়াই, ব্রিগেডে বললেন প্রধানমন্ত্রী