সময় কলকাতা ডেস্ক, ২১ সেপ্টেম্বর : নূর জাহানের বাংলা অর্থ জগতের আলো। মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের দ্বিতীয়া স্ত্রী মেহেরুন্নিসাকে অসমুদ্র হিমাচল চেনে নূর জাহান নামে। সম্রাট ও তাঁর পত্নীর ভালোবাসা ও বিরহ অনেক কিংবদন্তির জন্ম দিয়েছে। সেই একই ভালোবাসা আর বিরহ ফুটে উঠেছে আরেক নূর জাহানের কণ্ঠে। ভালোবাসা আর বিরহ – সুরে সুরে ছড়িয়ে পড়েছে গজল হয়ে, তাঁর কণ্ঠস্বরের মধ্যে দিয়ে।তামাম ভারতীয় উপমহাদেশ তাঁর গজলে মোহিত হয়ে থেকেছে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে। কিংবদন্তি হয়ে উঠেছেন। তিনিও গজলের সম্রাট যদি মেহেদী হাসানকে বলা হয়, তাহলে অবশ্যই গজলের সম্রাজ্ঞীর তাজ পরাতে হবে নূর জাহান কে।

ভারতীয় উপমহাদেশে, মূলত অবিভক্ত ভারতে গজল অত্যন্ত জনপ্রিয় আজও। ওয়াঘা সীমান্তের ওপারে পাকিস্তান, এপারে ভারত – আজও অসম্ভব জনপ্রিয় গজল। গজলের কথা বললে ভারতের বেগম আখতার, জগজিৎ সিং, তালাত আজিজ, পঙ্কজ উধাস, পিনাজ মাসানি, চিত্রা সিং থেকে হরিহরণ প্রমূখের যেমন নাম ওঠে আসে – তেমনই পাকিস্তানের নূর জাহান, মেহেদী হাসান,ফরিদা খানম, আমানত আলি খান, গুলাম আলী,আবিদা পরভিন সহ একাধিক গায়ক-গায়িকার নাম উঠবে। দু দেশের গজল গায়ক- গায়িকাদের মধ্যে একটি বিরাট ফারাক লক্ষ্য করা যায়। পাকিস্তানের গজল গায়ক গায়িকারা অনেক বেশি রাগ নির্ভর গজল গাইতে অভ্যস্ত। বেগম আখতারের পরবর্তী সময় থেকে ভারতের গজল গায়ক-গায়িকারা রাগ নির্ভরতা বেরিয়ে এসে গজল পরিবেশন করতে থাকেন। তবে ভারত বা পাকিস্তানের গজল কখনই দেশকাল ও কাঁটাতারের বিভেদ মানে নি।নূর জাহান আবার ছিলেন অবিভক্ত ভারতের বাসিন্দা, তিনি দেশভাগের পরে পাকিস্তানে থাকতে শুরু করেন। তবুও ভারতে তাঁর জনপ্রিয়তায় সামান্যতম ভাটা পড়ে নি।

আল্লাহ রাখী ওয়াসাই ছিল তাঁর জন্মসূত্রে পিতৃপ্রদত্ত নাম। পরবর্তীতে অভিনয় ও গানের জগতে তিনি পরিচিত হন নূর জাহান নামে। ১৯২৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর অবিভক্ত ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের কসুরে একটি সংগীতানুরাগী পরিবারে জন্ম নূরজাহানের। বেঁচে থাকলে তাঁর বয়স এখন হত ৯৮। তিনি অভিনেত্রী হিসেবে অবিভক্ত ভারতে একাধিক চলচ্চিত্রে প্রভাব ফেলেছিলেন। তিনি ছিলেন অভিনেত্রী-গায়িকা। পরবর্তী সময়ে অভিনয় জগত থেকে সরে এসে গায়িকা হিসেবেই তিনি আলো ছড়াতে থাকেন। ভারতে গানের সম্রাজ্ঞী লতা মঙ্গেশকার হলে পাকিস্তানের গানের সম্রাজ্ঞী ছিলেন ছিলেন নূরজাহান। তিনি পাকিস্তানে মালিকা-ই-তারান্নুম বা সুরের রানী খেতাব লাভ করেছিলেন। তিনি প্রকৃত অর্থেই ছিলেন সুরের রানী। তিনি হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের পাশাপাশি সংগীতের অন্যান্য ধারায় অসামান্য। তাঁর দিল ধড়কনে কা সবাব ইয়াদ আয়া, তুম আয়ে হো, বা আঁখ সে দূর না হো,আশিয়ানে কী বাত প্রভৃতি অসংখ্য গজল আজও লোকমুখে ফেরে। মির্জা গালিবের দিলএ নাদান বা দিল হি তো হ্যায় -এর মত সর্বকালের সেরা সায়রীগুলিকে তাঁর গায়কী দিয়ে তিনি অন্য মাত্রা দিয়েছিলেন। বহু চলচ্চিত্রে তিনি প্লে ব্যাক সিঙ্গার থেকেছেন, চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন। দীর্ঘ ছয় দশক ধরে ভারত ও পাকিস্তানের বিভিন্ন ভাষায় ভারত ও পাকিস্তানের বিভিন্ন ভাষায় যথা পাঞ্জাবী, পশতু, সিন্ধী এবং ফার্সি ও উর্দু ভাষায় প্রায় ১৮ হাজারের উপরে গান রেকর্ড করেছেন- তবুও তাঁর চলচ্চিত্রের গান, পাঞ্জাবি ভাষায় লোকসঙ্গীতের পাশাপাশি মূলত তার অসামান্য গজলের জন্য আজও তাঁর মাথায় শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা।২০০০সালে প্রয়াত হন তিনি।গজলের রানী বা সম্রাজ্ঞী বলতে এককথায় তাঁকে ছাড়া কাউকে ভাবা যায় না আজও।।


More Stories
বাংলা নববর্ষের ইতিহাস
আরেক অভিনেতা প্রণবের অকালপ্রয়াণ
বেজি কি সাপের বিষে কাবু হয় না?