Home » আদিবাসী মন্ত্রে পুজো: উমা এল না

আদিবাসী মন্ত্রে পুজো: উমা এল না

সময় কলকাতা ডেস্ক, ১৯ অক্টোবর: দুর্গাপূজো বর্তমান যুগে আনুমানিক ষোড়শ শতকে শুরু হলেও দুর্গাপুজোর রমরমা বৃদ্ধি পায় খ্রীষ্টীয় অষ্টাদশ শতক থেকে। লর্ড কর্নওয়ালিস প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তর সময় থেকে জমিদাররা সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হতে থাকেন। ইতিহাস বলে, ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে উপনিবেশিক ও জমিদারি শাসন বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলে আদিবাসীরা যা সাঁওতাল বিদ্রোহ নামে পরিচিত। আদিবাসীদের দেশপ্রেম ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের পথ সুগম করেছিল। আদিবাসী মন্ত্রে সর্বজনীন পুজো বিংশ শতকের গোড়া থেকে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে। তারও বহুকাল আগে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামার দেবী দুর্গার পুজোর সুচনা হয় আদিবাসীদের মধ্যে। দুর্গাপুজো বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়লেও আর্থিক কারণে এরকমই প্রাচীন একটি দুর্গাপুজোর ঐতিহ্য বিলুপ্তির পথে। এবছর পূজো হচ্ছেও না।

   “জাগো রক্তবীজনিকৃন্তিনী, জাগো                                     মহিষাসুরবিমর্দিনী,
       উঠে শঙ্খমন্দ্রে অভ্রবক্ষ শঙ্কাশননে চণ্ডী।”

মল্লিকা সেনগুপ্ত লিখেছিলেন “আশ্বিনের এক প্রাগৈতিহাসিক সকালে শ্রীরামচন্দ্র যে দুর্গার বোধন করেছিলেন স্বর্গের দেবপুরুষগণ যুদ্ধে পরাজিত হয়ে যে রণদেবীকে অসুর নিধনে পাঠিয়েছিলেন। সেই দুর্গাই একুশ শতকে নারীর ক্ষমতায়ন।” আর অত্যাশ্চর্যভাবে দুর্গাপুজোর বোধনে মল্লিকা সেনগুপ্ত দুর্গা সোরেন মিশে রয়েছেন বীরভূমের রামপুরহাটের সুলঙ্গা এলাকার দুর্গা মূর্মুর সঙ্গে। হতে পারে প্রত্যন্ত গ্রাম অথচ এখান থেকেই স্বাধীনতার রক্তবীজ ছড়িয়ে পড়েছিল বঙ্গ ও দেশজুড়ে আর ব্রিটিশ ও জমিদারদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামার আগে সুলঙ্গা গ্রামে আদিবাসী ভাষায় মন্ত্র উচ্চারণের মধ্য দিয়ে দুর্গা পূজার আয়োজন করেছিলেন দুর্গা মুর্মু। সঙ্গে ছিলেন ব্রজ মুর্মু এবং বেশ কিছু আদিবাসী মানুষ যারা স্বাধীনতা আন্দোলনে হাঁপিয়ে পড়ার প্রেরণা নিয়েছিলেন দুর্গা পুজো থেকে, দুর্গা পুজো ও দেশ মাতৃকার আরাধনা একাকার হয়ে গিয়েছিল সুলঙ্গা গ্রামে বহু যুগ আগে।

আরও পড়ুন   দুর্গাপুরের দুর্গাঃ শহরের ক্যানভাসে গ্রামের দুর্গা

কোনও সনাতন ধর্মীয় ব্রাহ্মণ নয়, উপবীত ধারণ করে পুজো করেছিলেন, আদিবাসী মানুষ।আদিবাসী মন্ত্রে হয়েছিল দেবীর আরাধনা। অথচ সেই ঐতিহ্যবাহী পুজো থমকে এসে দাঁড়িয়ে আছে আর্থিক কারণে। গ্রাম জুড়ে বিষাদ, এলাকা জুড়ে বিষাদ।মঙ্গলকাব্যে দেবীর কাছে ঈশ্বরীর প্রার্থনা ছিল “প্রণামিয়া পাটনী কহিছে জোড় হাতে/ আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।’ কিন্তু প্রকৃতির বিরূপতায়, ধরণীগর্ভ থেকে সোনার ফসল না ফলায় আর্থিক ভাবে রুগ্ন গ্রামটিতে আঁধার নেমেছে। উৎসবহীন গ্রামটির মন খারাপ।হয়তো পাশের কোনও গ্রামে দুর্গা দর্শনে যাবে এগ্রামের দুর্গারা।এখন একটাই সরকার মুখ তুলে চাইলে, সদয় হলে, আবার দুর্গার মৃন্ময়ী মূর্তির আরাধনায় মেতে উঠতে পারবে চিন্ময়ী দুর্গারা।

আরও পড়ুন    গোস্বামীখন্ডের দুর্গাপুজো ও নারী স্বাধীনতা

গ্রামবাসীদের, গ্রামের দুর্গাদের কায়মনোবাক্যে এখন একটাই কামনা, দেবীপক্ষে তাঁরা আবার আরাধনা করতে চান মায়ের। আদিবাসী মন্ত্রে দুর্গাপুজোয় আদিবাসী গ্রামটিতে যেন জেগে ওঠেন দুর্গতিনাশিনী মা। শরৎকালের নীল আকাশ আর আকাশে ছড়িয়ে আছে পেঁজা তুলোর মত মেঘ, ঝরে পড়ছে শিউলি ফুল, কাশ ফুলে দোলা লাগছে- এ আমাদের উৎসবের সময়, আনন্দের লগ্ন। অথচ বীরভূমের প্রত্যন্ত সুলঙ্গা গ্রামে আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে বিষাদের রেনু। প্রতিবছরের মত এবছর উৎসবের আনন্দে মেতে উঠতে পারছেন না সেই গ্রামের দুর্গারা, দুর্গা মুর্মু ও আদিবাসীদের হাত ধরে শুরু হওয়া দুর্গাপুজো। উৎসবে মেতে ওঠার ইচ্ছে থাকলেও আর্থিক প্রতিবন্ধকতা বাদ সেধেছে। সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে, দেবী শঙ্কা নাশ করবেন – আগামী দিনে আবার তারা পুজোর আয়োজনে মেতে উঠবেন, আগামীর স্বপ্ন দেখার মধ্যেই এবার কাটবে সুলঙ্গার দুর্গা মুর্মুর পরবর্তী প্রজন্মের দুর্গাপুজো।

About Post Author