Home » বারাসাত লোকসভা কেন্দ্রে জিতবে কে?

বারাসাত লোকসভা কেন্দ্রে জিতবে কে?

পুরন্দর চক্রবর্তী, বারাসাত, সময় কলকাতা : “বাড়ির কাছে ধান গা , যার মার আছে ছা – ” আনুমানিক হাজার বছর আগে বাড়ির কাছে কৃষি ক্ষেত্রে চাষ করার সুফলের কথা বলেছিলেন ইতিহাস প্রসিদ্ধা নারী খনা। হাজার বছর পরে, প্রযুক্তির যুগে আর কে তোয়াক্কা করে খনার বচনের! ২০১৪ সালে কলকাতা থেকে পিসি সরকারের পরে এবার আবার খনার বচনকে তোয়াক্কা না করে কিছুটা দূর থেকে বারাসাতের নির্বাচনী ক্ষেত্রে ভালো ফলের আশায় প্রার্থী চয়ন করেছে বিজেপি। বনগাঁ দক্ষিণ কেন্দ্রের বিধায়ক পদ থেকে বারাসাতের তিনবারের সাংসদ তৃণমূলের কাকলি ঘোষ দস্তিদারের বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে গোপালনগরের বাসিন্দা বিজেপির স্বপন মজুমদার। ২০১৪ সালে,২০১৯ সালে বারাসাত লোকসভা কেন্দ্রে ভালো ফল হয়নি বিজেপির। ২০২৪ সালে কি হবে? নাকি বারাসাত লোকসভা কেন্দ্রে হ্যাট্রিকের পরে আরও একটি জয়ের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার? খনার বচনই কি ঠিক হবে?

খনার বচন আজ কেউ মানুন বা না মানুন, ৮০০-১২০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে  কোনও একসময় খনা যেখানে থাকতেন মনে করা হয় সেই দেগঙ্গা এলাকার গুরুত্ব অপরিসীম হয়ে উঠেছে বারাসাত লোকসভা কেন্দ্রের এবারের ভোটে। বারাসাত শহর থেকে সামান্য দূরে দেগঙ্গা  গেলেই আজও ইতিহাসপ্রসিদ্ধ খনা মিহিরের ঢিপি দেখা যায়। বারাসাত লোকসভা কেন্দ্রের ভোটচিত্র অনেকটাই নির্ভর করবে দেগঙ্গার উপরে। আবার হয়তো করবে না। কারণ দেগঙ্গা ছাড়াও তো ছটি বিধানসভা কেন্দ্র রয়েছে বারাসাতে। বারাসাত লোকসভা কেন্দ্রে কি হতে পারে তার আভাস পেতে এবার চোখ ফেরানো যাক অঙ্কে।

২০২১ সালের বিধানসভা ভোট দিয়ে শুরু করা যাক  যেবার বারাসাত লোকসভা কেন্দ্রের ৭ টি বিধানসভা কেন্দ্রের সবকটিতেই জয় পায় তৃণমূল।  বারাসাত লোকসভা কেন্দ্রে  ২০২১ সালে ১ লাখ ৯৭ হাজার ভোটে বিজেপির চেয়ে লিড  তৃণমূলের। বিধানসভা ভোট দিয়ে কতটা কি বোঝা যায় তার অঙ্ক পরে আসবে । বিগত লোকসভা ভোট গুলির দিকে প্রথমে নজর রাখা যাক।

২০১৯ সালে বারাসাতের তৃণমূলের সাংসদ ৬ লক্ষ ৪৮ হাজার ৪৪৪ ভোট পেয়ে নিকটতম বিজেপি প্রার্থী মৃণাল কান্তি দেবনাথকে হারিয়ে দেন। তিনি পেয়েছিলেন ৫ লক্ষ ৩৮ হাজার ভোট। ফারাক ৭.৯০ শতাংশের। তবে বারাসাত সাংগঠনিক জেলা  বিজেপির বিরাট একটি অংশের মতে, সেবার প্রার্থী বাছাই নাকি ভালো হয় নি! কেউ তাঁকে চিনত না। দিলীপ ঘোষের সৌজন্যে নাকি টিকিট পাকা হয়েছিল। কেউ কেউ বলে থাকেন , ২০১৪ সালের প্রার্থী ভালো ছিলেন। একডাকে সবাই চিনত। জাদুকর তিনি।যেখানে যেতেন তিনি, তাঁর সঙ্গে তিন কন্যার কেউ না কেউ সঙ্গে থাকত। মানুষের ঢল ছিল। তা তিনিও তৃতীয় হন, কারণ বামেদের শক্তি তখনও খর্ব হয় নি উত্তর চব্বিশ পরগনা বা বঙ্গ জুড়ে। তাছাড়া আবার উঠে আসে  সঠিক প্রার্থী মনোনীত না  করার কথা।  প্রার্থী রাজনৈতিক পরিমন্ডলের নন। সেবার, বাম প্রার্থী ফরওয়ার্ড ব্লকের মোর্তজা হোসেন ৩ লাখ ৫২ হাজার ভোট পেয়ে বারাসাতের সাংসদের চেয়ে ১ লক্ষ ৭২ হাজার ভোট কম পেয়ে দ্বিতীয় হন । বিজেপি অবশ্য জাদুকর পিসিসরকারের আমল থেকেই ভোট বাড়াতে আরম্ভ করে বারাসাত সংসদীয় ক্ষেত্রে। তবুও তিনবারের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারের মার্জিন কিছুতেই লাখের নিচে নামে নি। বাম বা রাম কিছুতেই দমানো যায় নি তাঁকে । ২০০৯ সাল থেকে টানা জিতেই চলেছেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার। এবার নতুন অঙ্ক। বলা হচ্ছে, তৃণমূলের ভোট বাক্সে ফাটল ধরাতে হাজির আইএসএফ। তাঁর বিরুদ্ধে বিজেপি প্রার্থী “আপাদমস্তক রাজনৈতিক ” স্বপন মজুমদার। বিজেপির বেশির ভাগ কর্মী সমর্থক একমত, বারাসাত লোকসভা কেন্দ্রে  বিজেপিকে আটকাতে খুব নাকি বেগ পেতে হবে কাকলি ঘোষ দস্তিদারকে। জেতাই দুরূহ। সত্যি কি তাই?

তার্কিকরা বলতেই পারেন, এবার ফাঁদে পড়েছে তৃণমূল। বলার তথ্য তাঁদের হাতে মজুত। তাঁরা উদাহরণ টানছেন আইএসএফ প্রার্থী তাপস ব্যানার্জী অশোকনগরে বিধায়ক হওয়ার লড়াইয়ে ভোট টেনেছিলেন ৪৫০০০। রয়েছে দেগঙ্গা বিধানসভা ক্ষেত্র যেখানে সারা রাজ্যের মধ্যে অন্যতম সবচেয়ে শক্তিশালী সংগঠন আইএসএফের।  সেখানে আইএসএফ প্রচুর ভোট পাবে। পেয়েওছিল। ২০২১ সালে ৬৭০০০ ভোট পান আইএসএফের প্রার্থী করিম আলি। তবে তৃণমূলের রহিমা মন্ডলের কাছে তাঁকে হারতে হয় ৩৩,০০০ ভোটে। বারাসাতের বেশ কিছু অংশে সংখ্যালঘু ভোট আছে। সেখানে আইএসএফ শক্তি বাড়িয়ে চলছে। তাপস ব্যানার্জী বলছেন, তিনি জিততে নেমেছেন, সাড়াও পাচ্ছেন। আর বিজেপি বলছে, তিনবার সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারের ভোট বিধানসভা নির্বাচনে অশোকনগর আর দেগঙ্গা মিলিয়ে অনেকটাই কেটেছে আইএসএফ । দেগঙ্গায় ২০১৯ সালে ৭৪ হাজারেরও বেশি লিড নিয়েছিলেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার। তাই বিজেপির অঙ্ক অনুযায়ী, আইএসএফ বিধানসভার মত ১ লাখের বেশি ভোট টানতে পারলেই কেল্লা ফতে। বিজেপির চোখে সরলীকরণ, আইএসএফ এবার তৃণমূলের ভোট কাটতে এসেছে। হয়তো এসেছে, কিন্তু যাঁরা একথা বলছেন তাঁরা দেখছেন না হয়তো বিজেপির ভোট কাটা যাওয়ার অস্ত্রও মজুত।

প্রথমত, বাম ভোট ফ্যাক্টর। তাঁরা হয়তো দেখছেন, হয়তো দেখছেন না। কাকলি ঘোষ দস্তিদার ২০১৯ সালে নিজের কথা তৃণমূলের ভোট ২০১৪ সালের চেয়ে ৫.০৮ শতাংশ বাড়িয়ে ফেলেছিলেন। তবুও ব্যবধান কমেছিল। বামেদের ভোট ১৯ শতাংশ ভোট কমে, বিজেপির বাড়ে ১৫ শতাংশ। এবার বাম সব জায়গায় গা ঝাড়া দিয়ে উঠছে। ফরওয়ার্ড ব্লকের প্রার্থী সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মী, মানুষ হিসেবেও সৌজন্যবান। তবে এখন আর ফরওয়ার্ড ব্লকের সেই রমরমা নেই বারাসাতে। সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের মত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের  নিজের এলাকায় ফরওয়ার্ড ব্লকের শক্তি কমেছে। বারাসাতে তবুও প্রধান বাম শক্তি হিসেবে সিপিএম রয়েছে তাদের সঙ্গে। কিছু ডেডিকেটেড ভোটার রয়েছে। সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের সভায়, মিছিলে যেরকম লোকই হোক না কেন ২০২৬ এর সেমিফাইনাল হিসেবে বারাসাতের বাম সমর্থকরা ২০২৪ এর ভোট কে দেখছেন। আর বামেদের ভোট বাড়লে বিজেপির অস্বস্তি বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। রাম থেকে বামে ভোট ফিরবে, বলছেন বারাসাতের সিপিএমের বেশ কিছু প্রথম সারির নেতা। তবে তাঁরা এও মানছেন যে, জেতার জায়গায় তারা নেই। তাদের আশা, আট শতাংশে আটকে থাকবে না বাম ভোট যা হয়েছিল ২০১৯ সালে। বারাসাতে বামেদের দারুণ ফল যে হবে না – তা তাদের প্রার্থী নিয়ে জটিলতা থেকে সুস্পষ্ট। বাম থেকে বিজেপিতে গিয়েও ফাঁকতালে প্রার্থীপদ পেয়ে গিয়েছিলেন প্রবীর ঘোষ। শেষমেশ সম্মান বাঁচাতে সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়কে প্রার্থী করা হয়। বিজেপির লাভ হত বামপ্রার্থী হিসেবে প্রথমে টিকিট পাওয়া প্রবীর ঘোষ প্রার্থী হলে। সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় চেনা রাজনৈতিক মুখ। কিছু ভোট তিনি পাবেন যা নিশ্চিতভাবেই পেতেন না প্রবীর ঘোষ। প্রার্থীর মুখ, প্রার্থীর ওজন অবশ্যই ফ্যাক্টর , মানছেন বারাসাতের সাধারণ মানুষ।

প্রার্থী ” ফ্যাক্টর ” হবেন বিজেপির ক্ষেত্রেও, তাদের প্রার্থী স্বপন মজুমদারের ক্ষেত্রেও । আগের দুবারের চেয়ে “জোরালো রাজনৈতিক প্রার্থী ” ও বনগাঁ দক্ষিণ কেন্দ্রের বিধায়ক বলছেন তিনি লক্ষাধিক ভোটের কাকলি ঘোষ দস্তিদার কে হারাবেন। কোন মন্ত্রবলে জিতবেন তিনি ? কোন ইস্যুতে বিঁধেছেন তিনি তৃণমূলকে? কোন অস্ত্রে হারাবেন তিনবারের সাংসদকে?

সময়ের সাথে সাথে বিজেপির  ভোট বেড়েছে। জাতীয়তাবাদ , যুদ্ধ ও রাষ্ট্রের সুরক্ষার তত্ত্ব ছেড়ে হিন্দুত্বকে সামনে রেখে কিছু ভোট অবশ্যই আসতে পারে যা রামনবমীর মিছিল  পরিষ্কার করে দিয়েছে। ২০১৯সালের মত বিজেপি হাওয়া না থাকলেও একশ্রেণীর মানুষের কাছে কেন্দ্রীয় সরকারের স্থায়িত্বের প্রশ্ন এরসঙ্গে যোগ হয়েছে। তৃণমূলের দুশ্চিন্তা বাড়তে পারত, তবে প্রার্থী অবশ্যই বড় ফ্যাক্টর। কি বলছেন স্বপন মজুমদার? তাঁকে ঘিরেই বা কি চৰ্চা?

বিজেপি প্রার্থী স্বপন মজুমদার বলছেন, তৃণমূল দুর্নীতিগ্রস্ত দল। দুর্নীতির প্রশ্নে তৃণমূলকে বিঁধতে গিয়ে সরাসরি কাকলি ঘোষ দস্তিদারকে আক্রমণ করেছিলেন বিজেপি প্রার্থী। একাধিক জায়গায় তাঁর মন্তব্য বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। ইতিমধ্যেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধেও লাগাম ছাড়া ভাষা সন্ত্রাসের অভিযোগ স্বপন মজুমদারের বিরুদ্ধে তুলেছে তৃণমূল। অতঃপর পাল্টা রাজনৈতিক আক্রমণের পথে যান তিনবারের সাংসদ। কাকলি ঘোষ দস্তিদার জানিয়েছিলেন, রাজনৈতিক সৌজন্যের অভাব রয়েছে বিজেপি প্রার্থীর।  মধ্যমগ্রামে এক সাংবাদিক সম্মেলনে , রীতিমত ক্ষুব্ধ হয়ে নাম না করেই স্বপন মজুমদারকে কাউন্টার অ্যাটাক করেন তিনি । কাকলি ঘোষ দস্তিদার জানান , তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী  বিজেপি প্রার্থী দু-কান কাটা। কারণ দুর্নীতির কথা যিনি বলেন স্বয়ং তাঁর বিরুদ্ধে  বিরাট অভিযোগ। তাই তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীর সম্পর্কে মাদক পাচারের দায়ে  জেল খাটার কথা উল্লেখ করতেও ভোলেননি কাকলি ঘোষ দস্তিদার। বিজেপির প্রার্থীর  শিক্ষাগত ক্ষেত্রেও কারচুপির অভিযোগের প্রচারের বিষয়ও মনে করিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। কাকলি ঘোষ দস্তিদার এতসব বলতেই পারেন কারণ তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ স্বপন মজুমদার। কিন্তু যখন বিভিন্ন চায়ের দোকানে আলোচনায় , সোশ্যাল নেটওয়ার্ক সাইটে, অপর রাজনৈতিক দলগুলির কাছেও স্বপন মজুমদার ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের পাত্র হয়ে ওঠেন তখন প্রার্থী হিসেবে তিনি তো ‘ম্যাটার’ করেনই। প্রার্থী হিসেবে তাঁর গ্রহণ যোগ্যতার প্রশ্নে বিজেপির গোষ্ঠী- কোন্দল সরিয়ে রেখেও স্বপন মজুমদারকে সাধারণ মানুষ ইতিমধ্যেই ব্যাকফুটে রেখেছে। কাকলি ঘোষ দস্তিদারের বক্তব্যে   কোথাও যেন সিলমোহর পড়ে যায় সাধারণ মানুষের আলাপচারিতায়  ও ভোট নিয়ে আড্ডায়। তাহলে কি এগিয়ে আছেন বারাসাতের তিনবারের তৃণমূল সাংসদ?

বারাসাত লোকসভা কেন্দ্রে কোন অঙ্ক কাজ করবে কাকলি ঘোষ দস্তিদারের অনুকূলে তাও চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক। প্রথমত প্রার্থী হিসেবে ধারেও ভারে কাকলি ঘোষ দস্তিদার প্রতিদ্বন্দ্বীদের  চেয়েও অনেকটাই এগিয়ে। সুবক্তা, সংসদে তৃণমূলের অন্যতম মুখ  নিজের লোকসভা ক্ষেত্রে প্রচুর কাজ করেছেন। জল, আলো, রাস্তা সবদিকেই বারাসাতে কাজ হয়েছে। এমপিল্যাডের টাকা  ১০০ শতাংশই খরচ করেছেন তিনি।  পনেরো বছর ধরে তাঁর সংসদ থাকাকালীন বারাসাত সংসদীয় ক্ষেত্রে প্রভূত উন্নয়ন হয়েছে একথা সাধারণ মানুষ স্বীকার করতে আপত্তি করেন না । বিপক্ষের হাতে সেরকম মজবুত অস্ত্রও কিছু নেই উন্নয়নের প্রশ্নে। এরসঙ্গে এবারের ভোটেই প্রথম প্রভাব পড়তে চলেছে লক্ষীর ভান্ডার প্রকল্পে মানুষের তৃণমূলের দিকে ভিড়ে যাওয়ার। তৃণমূলের গরিষ্ঠ অংশ মনে করছে, অন্য সব প্রকল্পের চেয়ে লক্ষীর ভান্ডার প্রকল্পে  মানুষের উপরে প্রভাব ফেলতে বাধ্য। আমজনতার আশীর্বাদের সম্ভাবনার  সাথে যোগ হয়েছে বারাসাত লোকসভা কেন্দ্রের প্রতিটি বিধানসভা অঞ্চলে দক্ষ নেতা থাকায়। রথীন ঘোষ,সুজিত বসু, নারায়ণ গোস্বামী, তাপস চ্যাটার্জীর মত পোড় খাওয়া নেতা এবং তাঁদের সৈনিকরা রয়েছেন যেরকম নেতার অভাব বিজেপিতে। সবচেয়ে বড় কথা, চোরা স্রোতও নেই তৃণমূলে।

এবার ফেরা যাক, আইএসএফে। আইএসএফ শাসক দলের চিরাচরিত ভোট ব্যাঙ্কের  ভোট কেটে ফতুর করবে তৃণমূলকে, দেগঙ্গায় ভয়ানকভাবে ক্ষতি হবে তৃণমূলের- রাজ্যে  শাসক দল বিরোধী এই তত্ত্বের আলোচনায় ফেরা যাক ।  আলোচনা করা যাক আনিসুর রহমানের কথা যিনি দেগঙ্গায় বিদেশ  নামে পরিচিত এবং রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত প্রভাবশালী।শোনা যায়, আনিসুর রহমান বিদেশ কথা দিয়েছেন তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বকে, দেগঙ্গা আগের মত করেই ধরে রাখবে তৃণমূল। দেগঙ্গার কথা মাথায় রেখে, আইএসএফের ক্রমবর্ধমান শক্তিকেও  হিসেবে রেখে, অনেক আগে থেকেই ঘর গোছাতে শুরু করেছিল তৃণমূল। তৃণমূল ও বিদেশ লক্ষ্য স্থির করেছেন, দেগঙ্গার ৯টি গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে অন্তত গড়ে পাঁচ হাজার করে লিড থাকবে তৃণমূলের। অর্থাৎ অন্তত ৪৫ হাজার।  দেগঙ্গার রাজনীতি সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল একাধিক মহলের ধারণা,  রহিমা মন্ডল তৃণমূলের হয়ে তেত্রিশ হাজারে জিতেছিলেন দেগঙ্গায়, ব্যবধান তার চেয়ে বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা। রইল অশোকনগরের কথা। সেখানে,তাপস ব্যানার্জী তাঁর ক্ষমতা বলে তৃণমূলের ভোট কাটবেন নাকি বিজেপির ভোট কাটবেন তা নিয়ে ইতিমধ্যেই দ্বন্দ্বে পড়ে গিয়েছে বিজেপি। অশোকনগরেও লিভ নিচ্ছে  তৃণমূল।

পরিশেষে,সমীকরণ দিয়ে শুরু করে সমীকরণ দিয়েই উপসংহারে আসা যাক। দেগঙ্গা আবার স্বাস্থ্যকর লিড এনে দিলে,   হাবড়া , বিধাননগর বিধানসভা ক্ষেত্র কাকলি ঘোষ দস্তিদারকে বেশ খানিকটা দুশ্চিন্তায় ফেললেও তার জয়ের পথে কোনও অন্তরায় হবে না। মনে রাখা দরকার,২০২১ সালে হাবড়ায় জ্যোতিপ্ৰিয় মল্লিকের জয় সহজ হয়নি। হাবড়ায় বিজেপির সংগঠনও ভালো। কুমড়ো কাশিপুর সহ হাবড়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বিজেপির ভোটব্যাঙ্ক খুব মজবুত। হাবড়ায় বিজেপি বেশ ভালো লিভ পেলে অবাক হওয়ার কিছুই নেই। আবার সংগঠনহীন বিধাননগরে ভালো ফল করতে চলেছে বিজেপি । তবে, অন্য বিধানসভা কেন্দ্রগুলি খুব স্বস্তিবয়ে নিয়ে আসবে না  বিজেপির কাছে।

বারাসাত বিধানসভা এলাকার মধ্যে বারাসাত পুরসভা এলাকায় তৃণমূল -বিজেপি যতই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হোক -তৃণমূলের খুব একটা পিছিয়ে পড়ার সম্ভাবনা কম। অন্যদিকে বামনগাছি অংশে, ৪০টি বুথের মধ্যে ২১ টি সংখ্যালঘু  অধ্যুষিত বুথ থাকায় বিজেপির লাভের গুড়ে বালি। মধ্যমগ্রাম অনেকেই আনপ্রেডিক্টেবল মনে করলেও তৃণমূল লিড নেবে সেখানেও।  সেখানে ৩৭ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোট রয়েছে সেখানে কেমিয়া খামার পাড়া বা এরকম বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ভোটবাক্সে রাজ করবে তৃণমূল। মধ্যমগ্রামে স্বয়ং  কাকলি – রথীন রয়েছেন। দেগঙ্গায় মোটামুটি লিড পেলেই মধ্যমগ্রাম এবং অবশ্যই রাজারহাট -নিউটাউন কাকলি ঘোষ দস্তিদারের জয়ের পথ মসৃন করে দেবে তা একরকম নিশ্চিত। রাজারহাট নিউ টাউনের  বিজেপির জোরদার সংগঠনও তৃণমূলের লিড  রুখতে যে যথেষ্ট নয় তা তৃণমূলের পাশাপাশি বিজেপি এক শ্রেণীর নেতাও বিশ্বাস করেন।

রাজনৈতিক মহল মনে করছে , কাকলি ঘোষ দস্তিদার যতই বলুন, লক্ষাধিক ভোটে জয়ী হবেন, এবার জয়ের মার্জিন যথেষ্ট কমার আশঙ্কা রয়েছে। অথচ বাস্তব হল, হাবড়া এবং বিধাননগর বাদ দিলে বাকি পাঁচটি বিধানসভা ক্ষেত্রে তৃণমূল যথেষ্ট ভালো ফল করতে চলেছে। মার্জিন সামান্য কমতে পারে, তথাপি মার্জিন আবার লক্ষে ঠেকলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। মার্জিন যাই হোক, তিনবারের সাংসদ স্থির নিশ্চিত পায়ে আরেকটি জয়ের দিকে এগোচ্ছেন।তৃণমূলের ভালো ফলের অন্যতম কারণ কাকলি ঘোষ দস্তিদার ও স্বপন মজুমদারের প্রচারের স্ট্রাটেজিগত ফারাক। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত  অঞ্চলে হইচই করে প্রচার বাড়াতে চেয়েছে বিজেপি যা আখেরে সংখ্যালঘু অঞ্চলে তৃণমূলের ভোট এককাট্টা করেছে । বিজেপি জোর দিয়েছে তাদের মজবুত অংশে আরও বেশি করে প্রচারে এবং দুর্বল অংশে অবহেলা করছে তারা। কাকলি ঘোষ দস্তিদার স্বয়ং তৃণমূলের দুর্বল এলাকায় ডোর টু দোর মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন। খনার বচন বারাসাত লোকসভা কেন্দ্রের ভোটে সম্ভবত ঠিক হতে চলেছে। বারাসাতে এসে ভোটে খুব একটা সুবিধা হয়তো হবে না স্বপন মজুমদারের।।

About Post Author