সময় কলকাতা ডেস্ক, ১০ অগাস্ট : যে প্রশ্ন বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর অত্যাচার দিয়ে শুরু হয়েছিল জ্যোতিকা জ্যোতির প্রতিবাদ যেন সেই প্রশ্নকে আরও নতুন মাত্রা দিল। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে অন্য সব ধর্মগ্রন্থ গুলিকে বাদ দিয়ে কেবলমাত্র কোরাণের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশের অভিনেত্রী জ্যোতিকা জ্যোতি। তিনি বলেছেন, বৈষম্য বিরোধী সরকারের গোড়াতেই রয়েছে বৈষম্য। উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা মন্ডলীতে রয়েছেন দুজন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ। তথাপি শুধুমাত্র কোরাণ ব্যবহার করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে, ধর্মাচরণ প্রসঙ্গে বৈষম্য বিরোধী ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি কোন দিকে থাকবে?
এই প্রশ্নগুলি উঠছে কারণ এই প্রশ্ন ইতিমধ্যে অনেকটাই মান্যতা পেয়েছে।বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘ বা রাষ্ট্রপুঞ্জ (UN )জাতিসংঘের কর্মকর্তা বলেছেন, সংখ্যালঘুদের হত্যাকাণ্ডের যেকোনও তদন্তে তারা সহায়তা করবে। পাশাপাশি, ভারত সীমান্ত ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণের জন্য কমিটি গঠন করেছে।জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মুখপাত্র শুক্রবার বলেছেন যে বাংলাদেশে বর্তমানে চলতে থাকা হিংসার আবহে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর হামলার বিরুদ্ধে জাতিসংঘ পাশে রয়েছে।
মনে রাখা দরকার যে দেশে অন্ততপক্ষে ১ কোটি ৪৬ লক্ষ একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাস তারা কতটা সুরক্ষিত থাকবে তা নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন শুরু হয়েছে। বর্তমানে পাকিস্তানের বা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাস যতই কম থাকুক, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় কখনই সুরক্ষার জন্য কাতর কণ্ঠে আর্তি জানায় নি, যা সাম্প্রতিক সময়ের বাংলাদেশের একটি স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।মুহাম্মদ ইউনূসকে খোলা চিঠি পাঠিয়েছে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ ও বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ। চিঠিতে বলা হয়েছে, গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ৪ দিনে দেশের ৫২টি জেলায় সাম্প্রদায়িক হয়েছে। এ সময় অন্তত ২০৫টি সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। যে কারণে সংখ্যালঘুদের মধ্যে গভীর শঙ্কা, উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক মন্দির হামলার পর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, অনেক মহিলা নিগৃহীত হয়েছেন। কয়েকটি স্থানে হত্যার ঘটনাও ঘটেছে। অন্য সংখ্যালঘুরাও আক্রান্ত হয়েছে। ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা হওয়ার আবেদন রাখা হয়েছে কিন্তু যার কাছে পরিষদ আবেদন করেছে তাঁর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে কোরআন ব্যতীত অন্যান্য ধর্মীয় গ্রন্থ থেকে পাঠ না করার বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন পরিষদের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজল দেবনাথ। তবে মুহাম্মদ ইউনুস ইতিমধ্যেই সংখ্যালঘুদের উপরে অত্যাচার অবিলম্বে বন্ধ করার দাবি জানিয়েছেন নইলে তিনি পদত্যাগ করবেন এমন বার্তাও দিয়েছেন।
অন্যদিকে, যতই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার থাকুক,শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় দাবি করেন, বিএনপি-জামাত জোট বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা দিতে পারবে না। তাঁর মতে,পুলিশের ওপর হামলা, সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ -এসবই সন্ত্রাসী সংগঠন ও বিদেশি শক্তির পক্ষ থেকে উস্কানি দেয়ার ফলাফল। হাসিনা পুত্র যা বলেছেন তার নির্যাস আপাতত মৌলবাদীদের হাতে বাংলাদেশের রাশ যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ধর্মনিরপেক্ষ দেশ গুলিতে একটি কথা বারবার বলা হয়, প্রত্যেকটি মানুষের নিজস্ব ধর্মাচরণ করার মৌলিক অধিকার রয়েছে। ইতিমধ্যে দেশের মধ্যেই ক্ষোভ সঞ্চার হতে শুরু করেছে একজন উপদেষ্টা কে নিয়ে । ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবে সুপ্রতিম চাকমার বিরুদ্ধে ক্ষোভ দেখাতে সরকারি অতিথি ভবনের বাইরে মানববন্ধন করে একদল ছাত্র-ছাত্রী।বাংলাদেশের ধর্মাচরণ যে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের যে দুটি দফতরের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত তাঁদের অন্যতম ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী বা নৃগোষ্ঠীর নাগরিকরা প্রতিবাদ জানিয়েছেন। উল্লেখযোগ্য ভাবে, বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীতে সংখ্যাধিক্য রয়েছে চাকমাদের। চাকমাদের অধিকাংশ মানুষই এখনও আদি বৌদ্ধ ধর্ম পালন করে থাকে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মৌখিকভাবে আপত্তির কারণ সুপ্রদীপ চাকমা আওয়ামী লীগের আমলে বহাল হওয়া আমলা। তবুও এটাই বাস্তব যে, অন্তর্বর্তী কালীন সরকারের তাদের স্বার্থ রক্ষাকারী প্রতিনিধিকে মেনে নিতে পারতেন না ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী। স্বাভাবিকভাবেই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার মর্যাদা নাও পেতে পারে এমনটাই আশঙ্কা করছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সমাজ।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে স্থান পেয়েছেন প্রখ্যাত আলেম আ ফ ম খালিদ হোসেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম আলেম উপদেষ্টা ও ধর্ম বিষয়ক উপদেষ্টা তিনি। তিনি ইসলামী পন্ডিত হিসেবে পরিচিত। মাদ্রাসা থেকেই তিনি শিক্ষা সম্পূর্ণ করেন। ধর্ম বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি তাঁর দৃষ্টি কি রকম হবে তা আগাম বলা খুব কঠিন। তবুও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ইউনুস এক্ষেত্রে কি পদক্ষেপ নেন তাও সময় স্থির করে দেবে।

ইতিমধ্যেই যেহেতু ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের মধ্যে রোপন হওয়া ও বপন হওয়া বিদ্বেষ চরমে তাই আওয়ামী লীগের আমলে নিজেদের সুরক্ষিত মনে করা সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এখনও নিশ্চিত হতে পারছে না। দুর্গাপূজো সমাগত। ধর্ম যার যার, উৎসব সবার – তত্ত্বটি অন্তর্বর্তী কালীন সরকারের আমলে কতটা রক্ষিত হয় সেটাও এখন দেখার।।
আরও পড়ুন প্রশাসক হিসেবে কতটা সফল হবেন মুহাম্মদ ইউনুস?


More Stories
বাংলা নববর্ষের ইতিহাস
জয়শ্রীরাম বললেই রোগীর পাঁচশো টাকা ছাড়- বিতর্ক চিকিৎসকের সিদ্ধান্তে
গ্রেফতার অজি ক্রিকেট তারকা ওয়ার্ণার