Home » ঋত্বিক ঘটক : জন্মশতবর্ষে নীলকন্ঠ বাগচীর খোঁজে

ঋত্বিক ঘটক : জন্মশতবর্ষে নীলকন্ঠ বাগচীর খোঁজে

পুরন্দর চক্রবর্তী ও অর্ঘ পাত্র, সময় কলকাতা :

নীলকণ্ঠ বাগচীর খোঁজে

ভাবো, ভাবা প্র্যাকটিস করো – তিনি, একমাত্র তিনি-ই একথা বলতে পারেন। তিনি নীলকণ্ঠ হয়ে বিষপান করতে পারেন। তিনি নীলকণ্ঠ বাগচী। তবে,  যুক্তি তক্কো আর গপ্পোর নীলকণ্ঠ বাগচীর খোঁজ পেতে বহু গভীরে যেতে হবে, ভাবা প্র্যাক্টিস করেও তাকে ভাবনায় সম্পূর্ণ ভাবে ছোঁয়া যেন আর যায় না।

অধুনা বাংলাদেশের রাজশাহীর মিয়াপাড়ার ঘোড়ামারা এলাকা। যেখানে একটি অতি প্রাচীন ভগ্নপ্রায় বাড়িতে এখন বিবর্ণ সময়ের দাগ, যেখানে প্রথম জীবন কেটেছে ঋত্বিক ঘটকের, সেখান থেকেই  নীলকন্ঠ বাগচী নামে অন্তরে বাহিরে এক বাঙালিকে খোঁজার পথের শুরু। সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন,
“ঋত্বিক মনেপ্রাণে বাঙালি পরিচালক ছিল, বাঙালি শিল্পী ছিল– আমার থেকেও অনেক বেশি বাঙালি। আমার কাছে সেইটেই তার সবচেয়ে বড়ো পরিচয় এবং সেইটেই তার সবচেয়ে মূল্যবান এবং লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য।” তাঁর ভাবনা ছড়িয়ে আছে এপার বাংলা – ওপার বাংলা ঘিরে অথচ দু বাংলার চৌহদ্দি ছাড়িয়ে তাঁর ভাবনা হয়ে উঠেছে শাশ্বত যার বিকাশ ঘটেছে তাঁর নির্মাণ করা চলচ্চিত্রে। তাঁর প্রতিটি চলচ্চিত্রে ভাবনার এতটাই রসদ, যা নিয়ে ভেবে চলে চলচ্চিত্রপ্রেমী দর্শক তবুও থই যেন মেলে না। কুল মেলে না অতলস্পর্শী ভাবনার গভীরতার যা ঋত্বিক ঘটকের জন্মশতবর্ষেও অক্ষত, অম্লান।

জন্মশতবর্ষে ‘ঋ’

ঋত্বিক ঘটক নামটা ভারতীয় চলচ্চিত্রের সঙ্গে কতটা সমার্থক তা নিয়ে আলোচনা চলতেই পারে । তৎকালীন বাংলা সাহিত্য থেকে শুরু করে ভারতীয় ‘নিউ ওয়েভ’ সিনেমা সব জায়গাতে তাঁর অবাধ বিচরণ। গননাট্যর প্রতিবাদী গান দিয়ে বা বামপন্থী ভাবনা দিয়ে শুধু নীলকন্ঠ বাগচিকে বা ঋত্বিক ঘটককে চেনা যাবে না । তাকে চিনতে হলে আরও ভাবা প্র্যাকটিস করতে হবে।

প্রথম থেকে শুরু করতে হলেও শেষে যেতে হবে। যেতে হবে যুক্তি তক্কো আর গপ্পো নিয়ে তাঁর দর্শনে যেখানে নায়ক নীলকণ্ঠ বাগচীকে একজন মদ্যপ, মোহমুক্ত বাঙালি বুদ্ধিজীবী হিসেবে দেখানো হয়েছে। ছবিটি ভারতে প্রথম নকশাল বিদ্রোহের পটভূমিতে তৈরি। ঘটক ব্যাখ্যা করেন, “এতে ১৯৭১ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পটভূমি চিত্রিত করা হয়েছে, যেমনটি আমি দেখেছি। কোনও আদর্শ নেই। আমি এটিকে একজন রাজনীতিবিদের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছি। আমার কোনও রাজনৈতিক মতাদর্শকে খুশি করার কথা নয়”। এই যে কাউকে না খুশি করে, তোয়াক্কা না করে নিজের যুক্তি, নিজের তর্ক আর নিজের গল্প বলা এখানেই অনন্য ঋত্বিক ঘটক।

১৯৫১ সালে ছিন্নমূল চলচ্চিত্রে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করলেও আর একক পরিচালনার প্রথম চলচ্চিত্র ১৯৫২ সালের নাগরিক। গতানুগতিকতা ভাঙতে থাকা তখন থেকেই। তবে নাগরিক ১৯৫২ সালে মুক্তি পায়নি মুক্তি পেয়েছিল তার মৃত্যুর পরে ১৯৭৭সালে। এই যন্ত্রণা ও নীলকন্ঠ হয়ে তাকে পান করতে হয়েছিল। তাঁর প্রথম ডকুমেন্টারি ছবি ১৯৫৫ সালের ওঁরাও। আদিবাসীদের জীবন নিয়ে নির্মিত ওঁরাও চলচ্চিত্র। ‘অযান্ত্রিক’ মুক্তি পায় ১৯৫৮ সালে। অযান্ত্রিক যন্ত্র আর মানুষের ভালোবাসা। ‘অযান্ত্রিক’ সিনেমার নায়ক ড্রাইভার বিমলের নায়িকা তার গাড়ি। আলোড়ন সৃষ্টি করে তার পরের বছর  সালে মুক্তি পায় ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ । মূল গল্প শিবরাম চক্রবর্তীর। এই সিনেমা দেখায় তৎকালীন নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষদের অভাবের দৃশ্য। সিনেমাটোগ্রাফিতে ডিপ ফোকাসের ব্যবহার করে দেখিয়েছেন সমাজের ছিন্নমূল মানুষের কথা। ইংরেজি তে যাকে বলা যেতে পারে ‘লুম্পেনপ্রলেতারিএত’। ১৯৫৯ সালে ‘কত অজানারে’ নামের একটি সিনেমার কাজ অনেকদুর সম্পন্ন করেও সেস পর্যন্ত সম্পূর্ণ করে যেতে পারেননি। ক্রমে মুক্তি পায় ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘কোমল গান্ধার’, ‘সুবর্ণরেখা’, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’। প্রথম তিনটি চলচ্চিত্রকে ত্রয়ী বলা হয়।১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং দেশভাগের সময় নিজের অর্জিত অভিজ্ঞতা কোমল গান্ধার সহ তার একাধিক চলচ্চিত্রর নির্যাস। শক্তিপদ রাজগুরুর লেখা মেঘে ঢাকা তারা অবশ্যই জনপ্রিয়। ” দাদা আমি বাঁচতে চাই ” – দর্শকের চোখে আজও হয়তো জল এনে দেয় তবুও ঋত্বিক ঘটকের শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম হিসেবে বিবেচিত হয় শেষ দুটি চলচ্চিত্র। অদ্বৈত মল্লবর্মনের লেখা তিতাস একটি নদীর নাম শুধু একটি মালোপাড়ার কাহিনী নয়, নদীর পাড়ে হাজার হাজার মালোপাড়ার কাহিনী। অদ্বৈত মল্লবর্মনের লেখা যেন ছবির মত ফুটে উঠেছিল তিতাস একটি নদীর নামে। এই চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়ে ঋত্বিক ঘটক বলেছিলেন, ” অদ্বৈতবাবু যে সময়ে তিতাস নদী দেখেছেন, তখন তিতাস ও তার তীরবর্তী গ্রামীণ সভ্যতা মরতে বসেছে। বইয়ে তিতাস একটি নদীর নাম। তিনি এর পরের পুনর্জীবনটা দেখতে যাননি। আমি দেখাতে চাই যে, মৃত্যুর পরেও এই পুনর্জীবন হচ্ছে। তিতাস এখন আবার তারুণ্যে উজ্জীবিত। আমার ছবিতে গ্রাম নায়ক, তিতাস নায়িকা।” আর যুক্তি তক্কো আর গপ্পো নিয়ে যেকোনো বিশেষণে যে কম! এই চলচ্চিত্র ঋত্বিক ঘটকের, নীলকন্ঠ বাগচীর আত্মকথা, এক কথায় সেলফ পোর্ট্রেট। অশক্ত ভেঙে পড়া শরীরে, পুরা রাত্র এ বেঁচে থাকা এক বুদ্ধিজীবী বাঙালি শোনালেন নীলকণ্ঠের কথা আর বললেন, ” ভাবো ভাবা প্র্যাকটিস করো। ” বামপন্থী ভাবধারার নীলকন্ঠ, পুলিশের গুলিতে মারা গিয়েছিল। কিন্তু ঋত্বিক নামের নীলকন্ঠের মৃত্যু হয় না। মৃত্যুর ৪৯ বছর পরেও তিনি অমর।

৫০ বছরের জীবদ্দশায় একটি মানুষের ব্যাপ্তি কতটা হতে পারে? ঋত্বিক কুমার ঘটক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পেরেছিলেন ৮টি। স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, তথ্যচিত্র এবং প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছিলেন সবমিলিয়ে ১০টি। আরও অনেকগুলো কাহিনীচিত্র, তথ্যচিত্রের কাজে হাত দিয়েও শেষ করতে পারেননি। অধিকাংশ চলচ্চিত্রে বাণিজ্যিক সাফল্য না পাওয়ায়, চলচ্চিত্রকে জীবদ্দশায় মুক্তি পেতে না দেখার কষ্ট – সবই কুরে কুরে খেয়েছিল তাঁকে। তবুও আপোষ করেন নি ঋত্বিক। তিনি নীলকন্ঠ হয়ে রেখে গিয়েছেন শাশ্বত জীবন, রেখে গিয়েছেন ভাবনার খোরাক যা হাজার ভাবনার পরেও যেন নতুন করে ভাবায়। ৪ নভেম্বর তাঁর জন্মদিন, জন্মশতবর্ষ। সময় কলকাতার তরফে  ঋত্বিক ঘটককে – অমর নীলকণ্ঠকে শ্রদ্ধার্ঘ্য।।

About Post Author