পুরন্দর চক্রবর্তী, ১১ নভেম্বর : এসআইআর নিয়ে চৰ্চার মাঝখানে বারবার শোনা যাচ্ছে রোহিঙ্গাদের কথা। বঙ্গ বিজেপি দাবি করে চলেছে, রাজ্যের শাসকদলের ভোটব্যাঙ্ক বিদেশি অনুপ্রবেশের ফলে পুষ্ট যার একটা বিরাট অংশ রোহিঙ্গা। এসআইআর হলেই প্রচুর নাম কাটা যাবে, রোহিঙ্গা উৎখাত হবে আর বিপাকে পড়বে তৃণমূল। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই তথ্যকে আক্রমণ করে বলেছেন, বিহারে নির্বাচন কমিশন তো রোহিঙ্গা খুঁজে পায় নি তাও ৪৭ লক্ষ নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে। তাঁর প্রশ্ন,ক’জন রোহিঙ্গাকে খুঁজে পাওয়া গিয়েছে? এখানেই উঠে আসছে প্রশ্ন। কত লোকই বা রোহিঙ্গা হিসাবে বঙ্গে বা ভারতে বসবাস করছে? তারা কী ভোটার তালিকায় নাম তুলতে পেরেছিল? এসআইআর ও রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে তৃতীয় ও অন্তিম পর্বের প্রতিবেদন।
উল্লেখ্য যে, রোহিঙ্গা বিতাড়ণ মায়ানমার থেকে দীর্ঘ যুগ আগে শুরু হলেও ২০১৭ সালে তাদের দেশত্যাগ করার সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। বাংলাদেশ সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের শেষে বাংলাদেশের রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ছিল প্রায় ৮ লক্ষ ৮৭ হাজার। ভারত মায়ানমারের সঙ্গে সরাসরি সীমান্ত না থাকলেও বাংলাদেশ থেকে ভারতে রোহিঙ্গারা প্রচুর সংখ্যায় অনুপ্রবেশ করেছে এই সম্ভাবনায় কোনও অসংগতি নেই।
বর্তমান এসআইআর ও রোহিঙ্গা সমস্যা বোঝার আগে রোহিঙ্গাদের ভারতে অবস্থান বোঝা দরকার। সুপ্রিম কোর্টের একটি রায় তুলে ধরা প্রয়োজন। যে রায়ের ফলে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের অ-শরণার্থী মর্যাদা এবং ভারতের আইনি বাধ্যবাধকতা একটি ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে এ বছর মে মাসে। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জীবনযাত্রার অবস্থা এবং নির্বাসন সম্পর্কিত একটি মামলায়, *ভারত সরকার সুপ্রিম কোর্টকে বলেছিল যে তারা UNHCR-এর জারি করা শরণার্থী কার্ড বা রোহিঙ্গাদের শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না* প্রসঙ্গত UNHCR হল শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশন। United Nations High Commissioner for Refugees একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা, যার প্রধান কাজ হল শরণার্থীদের সুরক্ষা ও তাদের অধিকার রক্ষা করা। তবে ভারত সরকার সুপ্রিম কোর্টের এর বিরুদ্ধে প্রস্তাব এনে বলেছিল **ভারত ১৯৫১ সালের জাতিসংঘের শরণার্থী কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী নয় এবং তাই কোনও শরণার্থী সুরক্ষা প্রদান করে না।* এই বিষয়ে *ভারতের সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছে যে শুধুমাত্র ভারতীয় নাগরিকদেরই দেশে বসবাসের সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে।* *অতএব, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পরিস্থিতি বিদেশী আইনের আওতাধীন হওয়া উচিত যা জোরপূর্বক নির্বাসনের অনুমতি দেয়।**ভারতে রোহিঙ্গা সমস্যা মূলত মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় এবং মানবিক সংকটকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত হয়েছে। *ভারতে প্রায় ৪০,০০০ রোহিঙ্গা শরণার্থী* রয়েছে সংখ্যাটি অনেক বেশি বলেও বিভিন্ন স্তরে আশঙ্কা রয়েছে।ভারতে রোহিঙ্গা সমস্যার অন্যতম দিক হল শরণার্থীর মর্যাদা। ভারতে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আইনি মর্যাদা একটি বিতর্কিত বিষয় হয়ে থেকে গিয়েছে এবং রোহিঙ্গা সম্প্রদায় মনে করে ভারত রাষ্ট্র তাদের সঙ্গে অপরাধী মতো করে আচরণ । সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন ও প্রত্যাবর্তন নিয়ে যে তথ্য সামনে এসেছে সেখানে রোহিঙ্গাদের পক্ষে বলা হয়েছে
কিছু রোহিঙ্গা স্বেচ্ছায় মিয়ানমারে ফিরে যেতে ইচ্ছুক, কিন্তু তাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে যদিও কেন্দ্র এবং সুপ্রিম কোর্ট একযোগে রোহিঙ্গা ইস্যুতে তাদের অবস্থান প্রকট করে দিয়েছে।
কিছু মানবাধিকার সংস্থা ভারতে রোহিঙ্গা বন্দীদের অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ করেছে, যার মধ্যে আটক এবং মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার বিষয়গুলি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। রোহিঙ্গা সমস্যা ভারত সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে বিতর্ক ও ভিন্ন মত সৃষ্টি করেছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে
জাতিগত ও সাংস্কৃতিক বিভেদও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে । তথ্যভিজ্ঞ একটি মহলের মতে – কিছু ক্ষেত্রে, রোহিঙ্গাদের আগমন স্থানীয় জনগণের মধ্যে জাতিগত ও সাংস্কৃতিক বিভেদ তৈরি করতে পারে। তাছাড়া,সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবের দিক থেকেরোহিঙ্গা শরণার্থীদের বাসস্থান, খাদ্য, স্বাস্থ্য এবং শিক্ষার মত মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য পর্যাপ্ত সংস্থান না থাকায়, এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই সমস্যা তৈরি করেছে।
নিরাপত্তার উদ্বেগ একটি বিষয়। কারণ সুশৃংখল এবং নীতিপরায়ণ বলে কোনো অভিধানেই রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে উল্লেখ নেই। অপরাধের ক্ষেত্রেও তাদের ট্রাক রেকর্ড মোটেই উজ্জ্বল নয়। বাংলাদেশে নেশার দ্রব্য, মাদক পাচার, চুরি এবং যৌন অপরাধে রোহিঙ্গাদের পরিসংখ্যান খুবই খারাপ। ভারতে ও এই বিষয়ে রোহিঙ্গাদের মোটেই সুনাম নেই। কিছু মহল থেকে তাই রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবেও দেখা হয়।
এই সমস্যা সমাধানে, ভারত সরকার বিভিন্নক্ষেত্রে কিছু কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে
শরণার্থীদের ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা প্রদান। যদিও ভারত রাষ্ট্র অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে শরণার্থীদের অভ্যর্থনা করতে তারা বাধ্য নয়। রোহিঙ্গাদের অবৈধ অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও তাদের প্রত্যাবর্তনের জন্য আলোচনা করা প্রয়োজন এমনটাই দাবি করা হয়েছে।শরণার্থীদের মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।তবে, এই সমস্যাটি এখনও একটি জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যার জন্য মানবিক, আইনি, এবং নিরাপত্তা বিষয়ক সমন্বিত পদক্ষেপও প্রয়োজন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে এ নিয়ে কোন আলোচনা হয়নি। সে অর্থে সফলভাবে হয়নি কোনো সর্বদলীয় বৈঠক। এই বিশাল সংখ্যক রোহিঙ্গাদের নিয়ে রাষ্ট্র তথা কেন্দ্র এবং বিভিন্ন রাজ্য ও রাজ্যের শাসক দলগুলি একযোগে আগামী দিনে কী পদক্ষেপ নেবে তা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটে নি। রোহিঙ্গাদের সমস্যা এখনো সর্বত্র বিশ বাঁও জলে।
সর্বশেষ প্রশ্ন তবুও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশে রোহিঙ্গা সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে পথ যদি এসআইআর হয়, সেক্ষেত্রে রোহিঙ্গারা ২০০২ সালে ভোটার তালিকায় নাম না থাকার কারণে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। অতঃপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক এদের ক্ষেত্রে কী ভূমিকা নেবে? ভোটাধিকার হীন হিসেবে দেশে বসবাসকারীদের কিভাবে চিহ্নিত করা হবে এবং রোহিঙ্গাদের খুঁজে আলাদা করে তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে? নেই রাজ্যের বাসিন্দারা সুনাগরিক বা অপরাধী হলে কী করবে রাষ্ট্র?


More Stories
হুমায়ুন বিজেপির লোক : মিমের তত্ত্বের প্রভাব কতটা পড়বে?
ধর্মই ক্ষমতার উৎস : গীতাপাঠ ও বাবরি মসজিদ
হুমায়ুন ও বাবরি মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর : বিজেপি-তৃণমূল ও ভোট রাজনীতি