পুরন্দর চক্রবর্তী,সময় কলকাতা, ১৬ এপ্রিল : কে বলেছে বিগত নির্বাচনগুলির সংখ্যা তাত্ত্বিক হিসাব প্রধান রাজনৈতিক দলগুলিকে ভাবায় না! অনেক প্রার্থী পিছিয়ে থেকে শুরু করে ভাবতে থাকেন যে বিগত ভোটের সঙ্গে এবারের ভোটে জনাদেশের আমূল পরিবর্তন হবে। কিছু ক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবেই সমীকরণ বদল হয় কিন্তু ভোটের আগে সে নিশ্চয়তা খুব কম সময়ই পাওয়া যায়। আর তাই ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মাত্র ৫৭ ভোটে জয়ী হয়েও বিধায়ক পদে ইস্তফা দেওয়া নিশীথ প্রামানিক এবার তাঁর পুরনো বিধানসভা কেন্দ্র দিনহাটা পরিবর্তন করে ভোটে দাঁড়িয়েছেন মাথাভাঙ্গা কেন্দ্র থেকে। দিনহাটা কেন্দ্র একটি বরাবরের নজরকাড়া কেন্দ্র, এখানের ভোটারদের যথেষ্ট পরিস্থিতি-সচেতন বলা যেতেই পারে। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি বেশ কয়েকজন সাংসদকে ভোটের ময়দানে প্রার্থী হিসেবে নামায়। নিশীথ প্রামাণিক ছাড়াও একাধিক সাংসদকেও ঐ নির্বাচনে বিধানসভায় প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য নামানো হয়েছিল। বঙ্গে বার্তা দেওয়ার ছিল যে রাজ্য সরকার ও শাসকদলের বিকল্প শক্তি ও মুখ বিজেপির হাতে রয়েছে। নিশীথ প্রামানিক দিনহাটা কেন্দ্রে নগণ্য ভোটে জিতে বিধায়ক না থাকতে চেয়ে নিজের সাংসদ পদ ধরে রাখেন এবং বিধায়ক পদ থেকে ইস্তফা দেন। ফলে ৬ মাসের মধ্যে আবার ভোটের সামনে পড়ে দিনহাটা। হয়তো দিনহাটার জনগণ গিনিপিগ হতে চাননি এবং স্বল্প সময়ের মধ্যে ভোটের খাঁড়া নেমে আসায় তারা বিজেপির ওপরে ক্ষুব্ধ হন। দিনহাটার ভোটাররা উপনির্বাচনে তাদের ঘরের লোক উদয়ন গুহকে বিপুল ভোটে জিতিয়ে আনেন। ২০২১ সালে উপনির্বাচনে ৮৪ শতাংশ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন উদয়ন গুহ । আসন পুনরুদ্ধার করে তৃণমূল এখন প্রশ্ন হচ্ছে এবার তৃণমূল এই আসন ধরে রাখতে পারবে কিনা! দিনহাটায় উদয়ন জিতবেন তো??
২০২৪ সালে দিনহাটায় নথিভুক্ত ভোটারের সংখ্যা ছিল ৩,০৭,৫৮৫ জন। এদের মধ্যে ৮০% এর বেশি ভোটার গ্রামীণ ভোটার। বাংলাদেশের লালমনিরহাট অঞ্চল এবং বাংলাদেশ সীমান্ত এখান থেকে খুব কাছে – কোচবিহার শহর খুব দূরে নয়। শহর গ্রাম এবং সীমান্ত মিলেমিশে একাকার দিনহাটায়। স্বাভাবিকভাবেই মিশ্র সংস্কৃতির ছাপ রয়েছে এখানে।
দিনহাটা বিধানসভা কেন্দ্রের বিধানসভা নির্বাচন ভিত্তিক পর্যালোচনা করতে গেলে এই কেন্দ্রের ইতিহাস নিয়ে বলার বলার কিছুই নেই। ১৯৬২ থেকে কমল গুহর রাজত্ব শুরু হয়েছিল, এখন তার পুত্র উদয়ন গুহ স্বমহিমায় বিরাজ করছেন। বাবা বিধায়ক হয়েছেন আটবার যার মধ্যে একবার নিজের দল গড়ে তিনি জয়ী হয়েছিলেন, পুত্র বিধায়ক হয়েছেন চারবার। যে কেন্দ্রে পিতা পুত্র ১২ বার বিধায়ক হন সেই বিধানসভা কেন্দ্রের ইতিহাস নিয়ে বলার বিশেষ কিছুই থাকে না। এক কথায় বলতে হয় গুহ গড়। বর্তমানের উদয়ন গড়ে বিজেপির প্রার্থী হয়েছেন অজয় রায় । অন্য একাধিক দল থাকলেও প্রশ্নের অবকাশ নেই এই কেন্দ্রে মূল লড়াই তৃণমূল বনাম বিজেপি। এখন বিষয় হল – বিজেপির অজয় রায় এবার কি ২০২১ সালের মত বঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের মত আরেকবার নিশীথ অধিকারী হয়ে উঠতে পারবেন? উদয়ন গুহ অবশ্য নিশিত অধিকারীর মাথাভাঙ্গা কেন্দ্রে চলে যাওয়াকে ভোটের আগে নিজের জয় বলে দেখছেন। ঠোঁট কাটা এবং বিতর্কিত বলে বঙ্গের রাজনীতিতে পরিচিত উদয়ন গুহ অবশ্যই ভোটের মধ্যে একটা বড় ফ্যাক্টর মনে করছেন নির্বাচন কমিশন এবং এস আই আর কে। তিনি নির্বাচন কমিশন কে দোষারোপ করছেন এবং প্রশ্ন তুলেছেন যে – এক লক্ষ কুড়ি হাজার ভোটার কি করে বাদ পড়ে কোচবিহার জেলায়? এখানে কি হিন্দুরাও অনুপ্রবেশকারী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? তিনি তবুও আত্মবিশ্বাসী -উদয়ন বলছেন “২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে ন’টি আসনের মধ্যে পাঁচটি আসনে আমরা বিধানসভায় এগিয়ে ছিলাম। কোচবিহার জেলায় মোট ন’টি বিধানসভা আসন। সাতটি কোচবিহারে, মেখলিগঞ্জ জলপাইগুড়ি লোকসভায় এবং তুফানগঞ্জ আলিপুরদুয়ার লোকসভায়।এই ন’টির মধ্যে পাঁচটিতে লোকসভা ভোটে এগিয়ে ছিলাম। এবার তার থেকে উপরে যাব, এটা বলতে পারি।” উল্লেখযোগ্যভাবে এই পাঁচটি কেন্দ্রের মধ্যে অন্যতম কেন্দ্র হলো দিনহাটা বিধানসভা কেন্দ্র। তবুও এস আই আর নিয়ে কাঁটা রয়েছে, উদয়ন গুহ বলছেন বঙ্গে রেফারিই খেলতে নেমে গিয়েছে। উদয়ন গুহের মতে, “যার নিরপেক্ষভাবে কাজ করার কথা, সে একটা দলের হয়ে বল নিয়ে বিরোধীদের গোলের দিকে ছোটার চেষ্টা করছে। তার মানে ১২ জনের বিরুদ্ধে তৃণমূলকে লড়তে হচ্ছে। “উদয়ণ এসআইআরকে ভোটের আগের রিগিং বলে আখ্যা দিয়েছেন। তবুও তিনি বলছেন দশ জন মিলেও ১১ জনের ফুটবল টিমকে হারানো যায় এবং তাই এখানে হবে। তিনিও জিতবেন। সীমান্ত সমস্যা রয়েছে এই কেন্দ্রে যা নিয়ে সরাসরি বিএসএফকে দায়ী করেছেন উদয়ন গুহ। তিনি বলেছেন, গরু তো আর ছুঁড়ে এক দেশ থেকে অন্য দেশে ফেলা যায় না। এছাড়াও এই কেন্দ্রে রয়েছে বাকি থাকা উন্নয়নের প্রশ্ন । উদয়ন গুহ বলেছেন উন্নয়নের কোনো শেষ নেই, উন্নয়ন প্রভূত হলেও উন্নয়ন চলবে।
বিজেপির প্রার্থী অজয় রায় আবার বলছেন, এবার নির্বাচনে প্রতি কেন্দ্রে প্রার্থী নরেন্দ্র মোদি। দিনহাটা কেন্দ্রেও রয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। অজয় রায়ের নিজের উপরে ভরসা খুব বেশি না থাকাই স্বাভাবিক । পড়ুয়া বিবাদে দিনহাটা বিজেপি শাখা ক্ষতবিক্ষত। বিজেপি জেলা কমিটির স্থায়ী সদস্য তথা ছিটমহল আন্দোলনের অন্যতম মুখ দীপ্তিমান সেনগুপ্ত আগেই জানিয়েছিলেন , নির্দল প্রার্থী হয়ে দূরবিন চিহ্নে লড়বেন বিজেপির প্রাক্তন মণ্ডল সহ-সভাপতি অনিমেষ বর্মণ। বিজেপির বিক্ষুব্ধ নেতা দীপ্তিমানের মন্তব্য, ‘‘বিজেপি যে প্রার্থীকে দাঁড় করিয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই। লোকসভা নির্বাচনে কিংবা বিধানসভা নির্বাচনে যারা প্রার্থী হয়েছেন, তাঁদের কেউ হামলায় অভিযুক্ত, কারও ডাকাতিতে নাম জড়িয়েছে। তাঁদেরই প্রার্থী ররা হয়েছে।’’ তিনি আরও জানান, এ নিয়ে একাধিক বার নেতৃত্বকে জানিয়েও কোনও ফল হয়নি। দিনহাটা থেকে অজয় রায়কে প্রার্থী করা হয়েছে যা বিজেপির অনেকেই মানেননি।
তৃণমূলের গোষ্ঠী কোন্দল কি নেই? যথেষ্ট মাত্রায় রয়েছে, উদয়ন গুহর ভাইপো বিজেপিতে যোগদান করেছেন, ভিন্ন মেরুর চোরাস্রোত রয়েছে। এসআইআরের ধাক্কা লাগার আশঙ্কা রয়েছে নির্বাচনী ফলাফলে।
তবুও বিস্তর এগিয়ে উদয়ন গুহ। হাওয়ার অভিমুখ বলছে, কোচবিহারের ৯টি আসনের কটি আসনে তৃণমূল জিতবে তা নিয়ে যতই পর্যালোচনা চলুক, দিনহাটাতে উদয়নের জয় নিয়ে বাজি ধরতে হয়তো খুব বড় ভোট তাত্ত্বিক হওয়ার প্রয়োজন নেই ।
More Stories
চিকিৎসকের বঙ্গসংস্কৃতির উদযাপন নববর্ষে
রাহুল কি মমতাকে ভয় পাচ্ছেন?
মধ্যমগ্রামে রথীন ঘোষ ম্যাজিক কি অব্যাহত?