Home » অভয়ার পানিহাটি ভোটে কার?

অভয়ার পানিহাটি ভোটে কার?

Oplus_131072

পুরন্দর চক্রবর্তী,সময় কলকাতা : পানিহাটির ভোট আবর্তিত হচ্ছে একটি কালো দিন ঘিরে। লোকসভা ভোটের তিন মাস পরের ঘটনা। ২০২৪ সালের ৯ আগস্ট। আরজি কর হাসপাতালের তরুণী চিকিৎসক যাকে অভয়া বলে চিনেছে রাজ্য ও দেশ , যার ধর্ষণ ও খুন কাণ্ডে শিউরে ওঠে সারা দেশ,  উত্তাল হয়ে ওঠে দেশ। দফায় দফায় আন্দোলন ও রাত দখল কর্মসূচি এই আন্দোলনকে আলাদা মাত্র দেয়। এই ঘটনায় গ্রেফতার করা হয় এক সিভিক ভলান্টিয়ারকে। দোষী সাব্যস্ত সিভিক ভলান্টিয়ার সঞ্জয় রায়কে আমৃত্যু কারাবাসের নির্দেশ দেয় আদালত। তবে তরুণী চিকিৎসক ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় প্রকৃত বিচার হয়নি বলে সাধারণ মানুষ, চিকিৎসকদের একাংশ এবং নির্যাতিতক্ষ থেকে বারবার দাবি করা হয়েছে। এর পেছনে প্রধান কারণগুলো হল অভয়ার খুনে তদন্তের গাফিলতি, প্রমাণের অভাব, এবং মূল অপরাধীদের আড়াল করার সন্দেহ। তরুণী চিকিৎসকের বাড়ি ছিল সোদপুরে যা পানিহাটি বিধানসভার অন্তর্গত। বঙ্গের ভোট আসতেই সবার চোখ এখন পানিহাটিতে। ২০২৬ সালের বঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে পানিহাটি বিধানসভার দিকে চোখ এখন বঙ্গ ছাড়িয়ে সারা ভারতের। সোদপুরের তরুণী চিকিৎসকের মা রত্না দেবনাথ এবার মেয়ের প্রকৃত বিচারের প্রত্যাশী হয়ে ভোটের ময়দানে। তিনি বিজেপির হয়ে এবারের বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন। প্রার্থী হওয়ার পরে অভয়ার মা রাজ্যের শাসক দল ও মুখ্যমন্ত্রীকে তীব্র ও ধারালো আক্রমণ করতে থাকেন। পাশাপাশি, যারা তাঁর মেয়ের হয়ে প্রথম থেকে রাস্তায় নেমেছিল, রাত দখল কর্মসূচির আহ্বান করেছিল, সেই বামফ্রন্টকেও ছেড়ে কথা বলেননি, বামেদের সুবিধাবাদী আখ্যাও দিয়েছেন।

অভয়ার হয়ে আন্দোলনের মুখ হয়ে ওঠার কলতান দাশগুপ্ত এবার পানিহাটির সিপিএম প্রার্থী। তৃণমূলের হয়ে এখানে লড়ছেন বিদায়ী বিধায়ক নির্মল ঘোষের ছেলে তীর্থঙ্কর ঘোষ। নির্মল ঘোষ পানিহাটি বিধানসভা কেন্দ্রে ২০১১ সাল থেকে টানা তিনবার জয়ী হয়েছিলেন। নির্মল ঘোষকেও তার পুত্রের প্রচারে দেখা যাচ্ছে। ২০২১ সালেও এই কেন্দ্রে তিনি বিজেপির সন্ময় ব্যানার্জিকে পঁচিশ হাজার ভোটে হারিয়ে দিয়েছিলেন এবং ৪৯ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধেও মহিলা চিকিৎসকের মৃত্যুর তদন্তকে প্রভাবিত করার অভিযোগ উঠেছিল। তীর্থঙ্করের বিরুদ্ধে সেরকম কোন অভিযোগ নেই। কার্যত নির্মল ঘোষের ছেলেকে ভোটের ময়দানে নামিয়ে নিষ্পাপ পবিত্র ভাবমূর্তি আরোপ করে আরজিকর কান্ড থেকে নিজেদেরকে সন্তর্পনে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে তৃণমূল।

এখন অভয়ার ঘটনায় এবারের পানিঘাটে নির্বাচনের প্রধান বিবেচ্য ও প্রধান ইস্যু। কার্যত, নারী সুরক্ষা এখানে এক ও অভিন্ন ইস্যু। অন্য সবকিছু ঢাকা পড়ে গেছে এখানের নির্বাচনে। রত্না দেবনাথ বার বার একটাই কথা বলে চলেছেন – ‘আমি জিতলে পানিহাটি জিতবে বাংলা জিতবে’

এখন এটাই লাখ টাকার প্রশ্ন তিনি জিতবেন তো? তাঁর মেয়ের সহকর্মী ও সহপাঠী চিকিৎসক এবং মেয়ের হয়ে রাস্তায় নামাপ বামেদের আক্রমণ করে দেবনাথ পরিবার ইতিমধ্যেই একাংশের কাছে বিতর্কের সৃষ্টি করেছেন। রত্না দেবনাথ ও দেবনাথ পরিবারের বক্তব্যে বামফ্রন্ট এবং অভয় আন্দোলনের শরিকদের একাংশ ক্ষুব্ধ। তাঁর মেয়ের জন্য সমব্যথী ও সহমর্মী একশ্রেণীর মানুষের ভাবাবেগ কিছুটা হলেও আহত হয়েছে। ফলশ্রুতি ভোট বাক্সে বেশ কিছু ভোট ইতিমধ্যেই হারানোর আশঙ্কা তৈরি করেছেন রত্না দেবনাথ। সাধারণ মানুষদের একাংশ মনে করছেন বিজেপির হয়ে ভোটে না দাঁড়ালেই পারতেন রত্না দেবনাথ, কারণ অনেকের মতেই সিবিআই তদন্ত কমিটির কাজ যথেষ্ট সন্তোষজনক ছিল না। খোদ অভয়ার পরিবার সিবিআই তদন্তের গতি এবং কিছু প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল এবং পুনরায় তদন্তের দাবি জানিয়েছিল। উল্লেখযোগ্যভাবে এই তদন্ত কমিটির শীর্ষে থাকা ভি চন্দ্রশেখরকে ২০২৬ সালে রাষ্ট্রপতি পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়। অতঃপর কেন্দ্রের শাসক দলের টিকিটে অভয়ের মা ভোটের ময়দানে নামায় কেউ কেউ বলেছিলেন তিনি নির্দল প্রার্থী হলে ভালো হত, তবে একথাও অনেকে বলেছেন বিজেপির হয়ে লড়াই না করলে বিচার পেতেন না। নানা মুনির নানা মত – ভোটে কি হয় বোঝা দায়। যে দল অভয়ার হয়ে প্রথম আন্দোলনে নেমেছিল এবং অভয়ার মায়ের বিরুদ্ধে যে দল এখন সম্মুখ সমরে সেই বামেদের পানিহাটির প্রার্থী কলতান দাশগুপ্ত এ প্রসঙ্গে কী বলছেন?

কলতান অভয়ার মায়ের বিরুদ্ধে নয় বিজেপির নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কথা যতই বলুন, কলতানকে ভোটের ময়দানে প্রত্যক্ষভাবে লড়াই কিন্তু অভয়ের মায়ের বিরুদ্ধে করতে হচ্ছে। আর বিজেপি বনাম বামপন্থীদের পানিহাটিতে আক্রমণ প্রতি আক্রমণের মধ্যে অক্সিজেন পাচ্ছেন তীর্থঙ্কর। তার প্রচারে অভিনবত্ব রয়েছে, অভয়ার মত সংবেদনশীল ব্যাপারে অতি সতর্কতা রয়েছে। ভোটের শেষ লগ্নে এসেও পানিহাটি কোন দিকে তা বোঝা দায়। বিজেপি যেভাবে লোকসভা ভোটে সন্দেশখালিকে প্রধান ইস্যু করেছিল, একইভাবে পানিহাটিকে বিজেপি বঙ্গের ভোটে শক্তির উৎস করেছে। নরেন্দ্র মোদি পানিহাটিতে এসেছেন, প্রচার করেছেন।

রত্না দেবনাথের জন্য মানবিকতার স্বার্থে বেশ কিছু ভোট পড়তেই পারে এবং বাম আদর্শ এবং ব্যক্তিগতভাবে কলতানকে পছন্দ করা মানুষরাও অভয়া ইস্যুতে বামপন্থী ভোট দিতে পারেন। অভয়া কাণ্ডই যদি শেষ পর্যন্ত প্রধান বিবেচ্য হয়, সেক্ষেত্রে তৃণমূলের পক্ষেও ভোট পড়বে না এমন নাও হতে পারে। বেশ কিছু ঘটনা ও বক্তব্য তৃণমূলের বিপক্ষে গেলেও রাজনীতি কর্তৃপক্ষদের সুচারুভাবেই এক্ষেত্রে মোকাবিলা করছেন মমতা ও অভিষেক।

তীর্থঙ্কর তৃণমূলের ঢাল মাত্র। আরজিকর কাণ্ডের পরেও নারী সুরক্ষার ক্ষেত্রে বঙ্গকে বিক্ষিপ্ত ঘটনা ছাড়া মহিলাদের জন্য অত্যন্ত নিরাপদ মনে করা মানুষের সংখ্যা যথেষ্ট মাত্রায় আছে কিনা বোঝা যাবে ভোটের ফল প্রকাশের পরে। অসহায় এক তরুণীর নৃশংস হত্যা নিয়ে চলতে থাকা, আবর্তিত হতে থাকা রাজনীতি পানিহাটিতে মানবিক কি বার্তা দেয় সেটাই দেখার।

 

About Post Author