পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা, ৩০ জুন : বারাসাত পুরসভার কার্যত অচলাবস্থা। বারাসাতবাসীর নাগরিক পরিষেবার কী হবে? প্রায় একযোগে বারাসাত তৃণমূল পরিচালিত পুরসভার নির্বাচিত কাউন্সিলরদের সঙ্গে চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, প্রাক্তন চেয়ারম্যান পদত্যাগ করলেন। এখন মহকুমা শাসক এবং অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসারের মুখাপেক্ষী বারাসাতের নাগরিকবৃন্দ । এমতাবস্থায় বড় প্রশ্ন, নাগরিক পরিষেবার বিষয়টির কী হবে! মানুষ পরিষেবা পাবেন তো? বারাসাতের মহকুমা শাসকের মনোনীত অ্যাডমিনিস্ট্রেটর ও একসিকিউটিভ কী ভাবে বারাসাত পুরসভা পরিচালিত করেন তা দেখার। তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, রাস্তাঘাট, আবর্জনা, জমা জল নিয়ে মানুষ কোথায় দরবার করবেন? বারাসাতের সাধারণ মানুষ নাগরিক পরিষেবা পেতে কার কাছে যাবেন? আগামী দিনে শংসাপত্র, রেসিডেন্সিয়াল সার্টিফিকেট পেতে ৩৫ টি ওয়ার্ডের মানুষ কি পুরসভায় ভিড় জমাবেন? কাকে বলবেন নাগরিক দুঃখ কষ্টের কথা? যে কাউন্সিলরদের মানুষ নির্বাচিত করে নিজেদের ওয়ার্ড-এর পুরপিতা হিসেবে এনেছিলেন মেয়াদ শেষের আগেই তাঁরা পদত্যাগ করলেন। ওয়ার্ডের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা কি শেষ হয়ে যাবে পদত্যাগ পত্র জমা দিলেই? কী বলছেন সদ্য প্রাক্তন হওয়া চেয়ারম্যান সুনীল মুখার্জী বা ২০২২ সালে বারাসাত পুরবোর্ডের প্রথম চেয়ারম্যান অশনি মুখোপাধ্যায়? কী বলছেন বারাসাতের বিরোধী দলের কাউন্সিলররা ? কী বলছেন বারাসাতের বিধায়ক শঙ্কর চ্যাটার্জী? কী বলছেন রাজ্যে ক্ষমতাসীন বিজেপির বারাসত সাংগঠনিক জেলার নেতারা?
বিজেপি বিধায়ক শঙ্কর চ্যাটার্জী বলেছেন, অচলাবস্থা তৈরি করেছে বারাসাত পুরসভার তৃণমূল পরিচালিত বোর্ড। তিনি জানিয়েছেন, বিধানসভা ভোটে নিজেদের ওয়ার্ডে হারার পর, একের পর এক পুর দুর্নীতি সামনে আসায় কাউন্সিলাররা নিজের ওয়ার্ডে মানুষের সঙ্গে দেখা করা তো দূরস্ত, বাড়ি থেকে বেরোনো বন্ধ করে দিয়েছেন। বিধায়ক এও বলেছেন, দুর্নীতির দায় নিয়ে পুরবোর্ডের সদস্যদের পদত্যাগ করতে হচ্ছে, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রশ্নে সম্মান দেখাতে পারেননি তৃণমূল কাউন্সিলররা। শঙ্কর চ্যাটার্জী এও বলেছেন, সাধারণ মানুষকে বিপদে ফেলে তৃণমূল চেয়ারম্যান ও কাউন্সিলর চম্পট দিলেও বিজেপি এবং তিনি তাঁদের পাশে আছেন ও নাগরিকদের স্বার্থ রক্ষা করবেন।
পদত্যাগ করার পরে সাংবাদিক সম্মেলনে প্রাক্তন চেয়ারম্যান সুনীল মুখার্জী বলেছেন, ৩৫ বছর ধরে পুরভোটে তিনি নিজের ওয়ার্ডে জিতে এসেছেন। অথচ এবার তাঁর নিজের ওয়ার্ডেই ১৯৩৪ ভোটে তাঁকে হারতে হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই নবনির্বাচিত বিজেপি সরকারের উপর আস্থা রয়েছে মানুষের , নতুন সরকার বলেছে ভালো কিছু করতে চায়, তার জন্যই তিনি সরে দাঁড়াচ্ছেন। পাশাপাশি তিনি এই উল্লেখ করতে ভোলেননি, এমবার্গো থাকায় টেন্ডার হওয়া কাজ করা যাচ্ছে না। সুনীল মুখার্জী ও বলেছেন, আগামী দিনে সাধারণ মানুষের নাগরিক পরিষেবা পেতে অসুবিধা হবে না।
পদত্যাগের প্রশ্নে সহমত নয় বারাসাত পুরসভার ৩৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে তিনটি ওয়ার্ডের সিপিএম দলের জনপ্রতিনিধিরা। সিপিএম নেতা এবং পুরসভার বিরোধী দলনেতা বরুন ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, ভোটের রায় নয়, তৃণমূলের তৃণমূলের দুর্নীতি যা কুকুর চুরি কে ছাপিয়ে গিয়েছে যা বর্তমান অচলাবস্থার পেছনে দায়ী। তবুও মানুষকে নাগরিক পরিষেবা দিতে বদ্ধপরিকর বাম কাউন্সিলররা । আর্থিক অচলাবস্থা থাকায় কাজ জট পাকিয়ে আছে মেনে নিয়েও তিনি বলেন, নাগরিকদের দায়বদ্ধতা থেকে পদত্যাগ করে আচমকা বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়।তিনি দাবি করেছেন যে প্রাক্তন চেয়ারম্যান কে তিনি একাধিক পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাঁর দাবি যে তিনি বলেছিলেন, বিজেপি বিধায়ক এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক পদাধিকারীদের সঙ্গে আলোচনা করে বারাসাতের নাগরিকদের পরিষেবা দানের বিষয়টি সুনিশ্চিত করা হোক, যা করা হয়নি। বরুণ ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, তাঁর ওয়ার্ডের মানুষ তাকে নির্বাচিত করেছেন, পরিস্থিতি যাই হোক না কেন সাধারণ মানুষদের সঙ্গেই তিনি থাকবেন।
তৃণমূলের বিদায়ী পুরবোর্ডের আরেক প্রাক্তন চেয়ারম্যান অশনি মুখোপাধ্যায় তত্ত্বগতভাবে পরিস্থিতির সংকট বিচার করে জানিয়েছেন, পদত্যাগ করেই এবারের নির্বাচনের জনাদেশের প্রতি তারা সম্মান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এনিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই যে সাধারণ মানুষের আগের তুলনায় নাগরিক পরিষেবা পেতে অসুবিধা না হলেও , শংসাপত্র যেমন রেসিডেন্সিয়াল সার্টিফিকেট সহ সইসাবুদ পেতে কিছুটা হলেও ঝঞ্ঝাট পোহাতে হবে। এতদিন ধরে নাগরিকদের জন্য চলে আসা ৩৫টি দরজা আচমকা বন্ধ হয়েছে। এক্ষেত্রে সার্টিফিকেট বা শংসাপত্র পেতে পুরসভায় যেতে হবে এবং সাংসদ বা বিধায়ক নিজেদের বিশেষ সাংবিধানিক ক্ষমতা বলে নাগরিকদের শংসাপত্র দিতে পারবেন। অশনি মুখোপাধ্যায় এও জানিয়েছেন, পরিস্থিতি যেদিকে গড়াচ্ছে কয়েক মাসের মধ্যে ভোট হলেই অবস্থা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
অন্য প্রাক্তন কাউন্সিলরদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে, ১০ নম্বর ওয়ার্ডের প্রাক্তন ও পদত্যাগী কাউন্সিলর দেবব্রত পাল জানিয়েছেন, তিনি মানুষের সঙ্গে ছিলেন, আছেন, থাকবেন এবং সামাজিক কাজকর্ম চালিয়ে যাবেন।
৯ নম্বর ওয়ার্ডের প্রাক্তন কাউন্সিলর দীপক দাশগুপ্ত একধাপ এগিয়ে জানিয়েছেন, পদত্যাগ করলেও তাঁর ওয়ার্ডের মানুষদের সুবিধা অসুবিধার প্রতি দায়বদ্ধতা ও দায়িত্ব তিনি আচমকা অস্বীকার করতে পারেন না। পুরসভায় দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকদের সঙ্গে তিনি ইতিমধ্যে কথা বলেছেন। তাঁর ওয়ার্ডের মানুষদের কোন অসুবিধা যাতে না হয় সেই বিষয়টি তিনি দেখবেন।
আরেক প্রাক্তন ও পদত্যাগী কাউন্সিলর অভিজিৎ নাগ চৌধুরী জানিয়েছেন, পুরবোর্ড ভেঙে যাওয়ার উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পদত্যাগ করা ছাড়া উপায় ছিল না। তিনি মেনে নিয়েছেন যে, বৃহৎ অংশের মানুষ তাঁদের প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে পদত্যাগ করলেও তাঁর ওয়ার্ডের কেউ তার কাছে নাগরিক সাহায্য চাইলে তিনি তাঁর সাধ্যমত সহযোগিতা করবেন।
বাস্তবে মুশকিল হল, এই ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের এখন কার্যকরী ক্ষমতা আর নেই এবং বিধানসভা ভোটের পর থেকেই তৃণমূল কাউন্সিলররা জনসংযোগ বিচ্ছিন্ন।৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর চম্পক দাস এলাকা ছাড়া হয়ে আছেন, ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর অরুণ ভৌমিক জেল হাজতে। যারা এলাকায় রয়েছেন তাঁরাও বলছেন, পরিষেবা দেওয়ার পরিবেশ ছিল না এবং পদত্যাগ করে নতুন পুরবোর্ডের অপেক্ষা করা সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য বিকল্প পথ। এনিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই, “জনরোষ ” সংগঠিত হচ্ছে এবং দুর্নীতির প্রশ্ন উঠছে। দুর্নীতির অভিযোগ তুলে হচ্ছে ডিম বা পাথরের বৃষ্টি।
বারাসাত পুরসভা ঘিরে মধ্যে অচলাবস্থার মধ্যে দুর্নীতির প্রশ্ন নিয়ে রীতিমতো ক্ষুব্ধ বিজেপি। স্বয়ং বিধায়ক শঙ্কর চ্যাটার্জী বলেছেন, পুরসভায় একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এই দুর্নীতির সঙ্গে যারা যুক্ত তাদের একটা তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। পাশাপাশি তিনিও জানিয়েছেন ১৩৫ টি এমন অবৈধ নির্মাণের কথা তাদের কানে এসেছে যা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বারাসাত শহর বিজেপির শীর্ষ নেতা দীপ্ত লস্কর জানিয়েছেন, পুরভোট হওয়ার আগে পর্যন্ত সাধারণ মানুষের যাতে অসুবিধা না হয় এবং তারা যেন নাগরিক পরিষেবা পান সেই বিষয়টি প্রতিটি ওয়ার্ড ভিত্তিক দেখা হবে এবং সেই বিষয়ে পুরসভার আপৎকালীন ও সাময়িক দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকদের সঙ্গে সমন্বয় সাধন করা হবে।
বারাসাত সাংগঠনিক জেলার সম্পাদক অনুপ বোস পরিষ্কার জানিয়েছেন, বারাসাত পুরসভার আপৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকদের সঙ্গে ইতিমধ্যেই কথা বলেছেন তাঁরা। অনুপ বোসের প্রশ্ন, এখন তো নাহয় পদত্যাগ করে ভেঙে যাওয়া পুরসভার কাউন্সিলর চম্পট দিচ্ছেন, গত দুমাস ধরে পরিষেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে কাউকেই তো দেখা যায়নি। তিনি জানিয়েছেন, অফলাইনে ১৩৫ টি অবৈধ নির্মাণের কথা তিনিও শুনেছেন। বিধায়কের তত্ত্বাবধানে দুর্নীতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি,সাধারণ মানুষদের বিভিন্ন ওয়ার্ডে পরিষেবা পেতে যেন অসুবিধা না হয় সেজন্য ভারতীয় জনতা পার্টি উদ্যোগী। তাঁরা ইতিমধ্যেই বিভিন্ন ওয়ার্ডে বেহাল রাস্তা এবং জঞ্জাল সরানোর জন্য নথিবদ্ধভাবে পুরসভার দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকের কাছে চিঠি জমা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন ভারতীয় জনতা পার্টি বারাসাতে নাগরিকদের প্রাপ্য নাগরিক সুযোগ সুবিধা সুনিশ্চিত করতে যা যা পদক্ষেপ নেওয়া দরকার তাই নেবে।
বারাসাত পুরসভা ভেঙে গেলেও বারাসাতের বিজেপি বিধায়ক শংকর চ্যাটার্জী এবং বিজেপির শীর্ষ নেতাদের মন্তব্য অনুযায়ী নির্যাস যে, প্রাথমিকভাবে কিছু অসুবিধার সম্মুখীন হতে হলেও বিশবাঁও জলে নেই বারাসাতের নাগরিকদের পরিষেবা পাওয়ার ভবিষ্যৎ।।


More Stories
কাউন্সিলরকে ঘিরে বিক্ষোভ,ডিমথেরাপির বদলে কালো কালি
আবার বেলাগাম হুমায়ুন, বিজেপিকে মারের হুমকি, গ্রেফতারের দাবি
প্রয়াত চিকিৎসক জয়ন্ত দাস