পুরন্দর চক্রবর্তী ও অর্পণ সিংহ, সময় কলকাতা, ১১ নভেম্বর : দিল্লির গাড়ি বিস্ফোরণের রেশ দিল্লি ছড়িয়ে সারা ভারতের মত বঙ্গেও। এমনকি হাওড়ার একটি বস্তিতে এক আপাত অখ্যাত নামা, “মুঘল বাদশাহদের পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ” বৃদ্ধা নিজের উদ্বেগ চেপে রাখতে পারছেন না। তাদের পূর্বপুরুষদের তৈরি করা সাধের দিল্লি নগরীর কী হবে? বৃদ্ধা মুঘল সুলতানার আক্ষেপ, সাধের দিল্লি নগরীর কী হবে?
দিল্লি নগরীর ইতিহাস, ভূগোল আর জনজীবনের সঙ্গে মিশেছে আতঙ্ক।সোমবার সন্ধ্যার দিল্লির গাড়ি বিস্ফোরণে এখনও পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৩ জন।দিল্লি লালকেল্লা মেট্রো স্টেশনের কাছে আই টোয়েন্টি বিস্ফোরণ ( হুন্ডাই আই টোয়েন্টি এক্সপ্লোশন )যেখানে ঘটেছে সেখান থেকে ঐতিহাসিক লালকেল্লার দূরত্ব মাত্র ৫০০ মিটারের কিছুবেশি । চাঁদনী চক থেকে লাল কেল্লার দূরত্ব দেড় কিলোমিটারের কম। লালকেল্লার সঙ্গে মিশে আছে প্রায় ৪০০ বছরের ইতিহাস। ১৬৩৯ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সম্রাট শাহজাহানের শাসনকালে লালকেল্লার নির্মাণ শুরু হয়। নির্মাণ কার্য শেষ হয়েছিল ১৬৪৮ সালে। লালকেল্লার সঙ্গে মিশে আছে ভারতের স্বাধীনতার গৌরব। ১৯৪৭ সালের ১৫ ই আগস্ট লালকেল্লাতেই ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু স্বাধীন ভারতের পতাকা তুলেছিলেন। আজও লালকেল্লা থেকে প্রতিবছর স্বাধীনতা দিবসে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী। তাই শুধু মুঘল স্থাপত্য বা ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট নয়, লালকেল্লা ভারতের স্বাধীনতার গৌরবের সাক্ষ্য বহন করে। তার অনতিদূরে ঘটেছে বিস্ফোরণ। বিস্ফোরণে ক্ষতবিক্ষত হয়ে প্রাণ হারালেন ১৩ জন। আতঙ্কের আবহ। আর এই আতঙ্ক যেন আছড়ে পড়েছে হাওড়ার বস্তির একটি ছোট ঘরে যেখানে কষ্টেসৃষ্টে দিন গুজরাণ করেন লালকেল্লার নির্মাণ যার আমলে সেই শাহজাহানের বংশধররা। তারা শুধু শাহজাহানের কথা বলেন না, বলেন অস্তমিত মুঘল গৌরবের কথা, আর বলেন বর্তমান মায়ানমারের রেঙ্গুনে ব্রিটিশদের হাতে বন্দি দশায় মৃত্যু হওয়া মুঘল সম্রাট বাহাদুর শা জাফরের কথা। ভাগ্যের বিড়ম্বনায় তাদের স্থান হয়েছে অন্ধকার বস্তির গৃহে তবুও অতীত মর্যাদার কথা ভুলে না গিয়ে বাহাদুর শাহ বংশধরের বাহাদুর শাহ জাফরের প্রপৌত্রের স্ত্রী সুলতানা বেগম বললেন তাঁর উদ্বেগের কথা। কে এই সুলতানা বেগম?
লাল কেল্লার বর্তমান সময়ের চর্চায় সুলতানা বেগমের নাম চলে আসবেই। সুলতানা বেগম জানিয়েছেন, তিনি শেষ স্বাধীন মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের প্রপৌত্র মির্জা বেদার বখতের স্ত্রী। বাহাদুর শাহ জাফর রেঙগুনে স্বাধীনতার আন্দোলন সিপাহী বিদ্রোহের পরে ব্রিটিশদের হাতে বন্দী হয়ে মারা গিয়েছেন ১৮৬২ সালে। তাঁর পরে তিন পুরুষ কেটেছে। বাহাদুর শাহ জাফরের প্রপৌত্র মির্জা বেদার বখত মারা গেছেন ১৯৮০ সালে। তাঁর স্ত্রী সুলতানা বেগম বছর আগে হাইকোর্ট এবং তারপরে এবছর শীর্ষ আদালতে মামলা করে দাবি করেছিলেন লালকেল্লা তাদেরই সম্পত্তি তাই সম্পত্তির অধিকার দেওয়া হোক তাকে। তার দাবি এবছর মে মাসে খারিজ করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। হতে পারে আদালত তাঁর দাবিকে মান্যতা দেয়নি তবুও সরকার থেকে তার পরিবার যে বাহাদুর শাহ জাফরের উত্তরসূরী এবং মুঘল সম্রাটদের সঙ্গে তাঁদের রক্তের সম্পর্ক। তিনি এখনও ৬ হাজার টাকার পেনশন পান। এক সময় তাঁর পূর্বসুরিরা, দিল্লি শাসন করতেন- তাঁদের হতেই নির্মিত হয়েছিল লালকেল্লার মতো ঐতিহাসিক স্থাপত্য ও শিল্পকর্ম। দিল্লির ইতিহাসের সঙ্গে সুলতানা বেগমের ও তার পরিবারের মায়ার বন্ধন, তাঁরা আজও বিশ্বাস করেন লালকেল্লার সঙ্গে তাদের নাড়ির যোগ।
লালকেল্লার পাশে বিস্ফোরণ পীড়া দিচ্ছে প্রবল ভাবে। সুলতানা বেগম ব্যথিত চিত্তে বললেন,এরকম ঘটনা লাল কেল্লার ঐতিহাসিক গুরুত্ব বুঝতে আগ্রহী মানুষকে আতঙ্কে রাখবে। মানুষ লালকেল্লার কাছে এখন যেতেই চাইবে না। সারাদেশের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত রাখার আবেদন ভগ্নপ্রায় গৃহের অশক্ত, বৃদ্ধা সুলতানার।
হাওড়ার বস্তিতে থাকা শাহী পরিবারের সুলতানা দাবি করলেন, এই ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের খুঁজে বার করার ও শাস্তি বিধানের। কন্ঠে উদ্বেগ ঝরে পড়ল সুলতানা বেগমের। মুঘল সুলতানার আক্ষেপ, সাধের দিল্লি নগরীর কী হবে?
More Stories
নীতিশ জমানা শেষ, বিহারের সম্রাট নতুন মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর বুলডোজার মডেল
আশা ভোঁসলের হার্ট অ্যাটাক
হরমুজ প্রণালী, রান্নার গ্যাস ও তেল এবং ভারত -ইরানের সম্পর্ক