Home » হরমুজ প্রণালী, রান্নার গ্যাস ও তেল এবং ভারত -ইরানের সম্পর্ক

হরমুজ প্রণালী, রান্নার গ্যাস ও তেল এবং ভারত -ইরানের সম্পর্ক

Oplus_131072

পুরন্দর চক্রবর্তী,সময় কলকাতা , ১৫ মার্চ : ভারতের সঙ্গে ইরানের হার্দিক সম্পর্ক ৩০০০ বছরের বেশি সময় ধরে। ইরান বনাম ইজরায়েল – আমেরিকা যুদ্ধে ইরানের হয়ে অংশ না নিলেও সবুরে মেওয়া ফলছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ইসরায়েল সফরের দুদিন পরেই শুরু হয়েছে যুদ্ধ। ইজরায়েলের মাটিতে মোদি যাই বলুন না কেন,ইরানের ভারতের প্রতি মনোভাব বুঝিয়ে দিয়েছে ইরান ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক চায়। হরমুজ প্রণালী ভারতের জন্য অবরুদ্ধ নয় যা ভারতবাসীর জন্য সুখবর।

প্রসঙ্গত,হরমুজ প্রণালী খুলে গিয়েছে ইরানের মিত্র দেশ গুলির জন্য । যদিও আমেরিকা ও ইসরাইল সহ তাদের মৃত্যু দেশগুলোর জন্য এই প্রণালী বন্ধ। আনুষ্ঠানিক বিবৃতিও এসেছে সামনে। ইরানের বিদেশ মন্ত্রী আব্বাস আরাগছি জানিয়ে দিয়েছেন, বাস্তবে এটি খোলা। ইরানের বিদেশ মন্ত্রী জানিয়েছেন,  ”   এটি শুধুমাত্র আমাদের শত্রুদের, যারা আমাদের এবং তাদের সহযোগীদের আক্রমণ করছে তাদের ট্যাঙ্কার এবং জাহাজের জন্য বন্ধ।অন্যরা মুক্ত এবং আমি বলতে পারি যে প্রণালীটি বন্ধ নয়, তবে এটি কেবল আমেরিকান, ইসরায়েলি, আপনি জানেন, জাহাজ এবং ট্যাঙ্কারগুলির জন্য বন্ধ রয়েছে, অন্যদের জন্য নয়।” সাধারণ ভাবে হরমুজ় প্রণালী যে কোনও মিত্র দেশের জাহাজের জন্য‌ উন্মুক্ত। ভারতীয় জাহাজ ও ট্যাঙ্কার তেল ও এলপিজি নিয়ে ইতিমধ্যেই হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াত শুরু করেছে ।

পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মাঝে সঙ্কীর্ণ জলপথের নাম হরমুজ় প্রণালী— যার সংকীর্ণ অংশ প্রায় ২১ মাইল তা বরাবরই পশ্চিম এশিয়ার বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র । পশ্চিমায় ইরান বনাম ইসরায়েল ও আমেরিকার যুদ্ধে এই হরমুজ প্রণালী হয়ে উঠেছে আলোচ্য কারণ এখান দিয়েই সারা বিশ্বের এক পঞ্চবাংশ তেল পরিবহন করা হয় এবং বহু দেশ পণ্য পরিবহণের জন্য এই জলপথ ব্যবহার করে। হরমুজ় প্রণালীতে দু’মাইল চওড়া করে দু’টি পথ ভাগ করা আছে। এক দিক দিয়ে জাহাজ পূর্বে আসে, অন্য দিক দিয়ে যায় পশ্চিমে। দ্বিমুখী এই জলপথের মাঝে আরও দুই মাইল চওড়া অংশ রাখা হয়েছে, যা দু’টি পথকে পৃথক করে। আন্তর্জাতিক আইন বলছে, যে কোনও দেশ তার উপকূল থেকে ১৩.৮ মাইল পর্যন্ত অংশের জলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ দাবি করতে পারে। এই নিয়ম অনুযায়ী, হরমুজ়ের সঙ্কীর্ণ অংশে ইরান, ওমান উভয়ের নিয়ন্ত্রণই স্বীকৃত। তবে ইরান তুলনামূলক বেশি ক্ষমতাধর হওয়ায় ইরান তরমুজ প্রণালীতে তার আধিপত্য বজায় রেখেছে। তরমুজ প্রণালী প্রাথমিকভাবে অবরুদ্ধ হওয়ার সময় কোনও দেশের জাহাজ ও ট্যাঙ্কার সেই পথ দিয়ে যাতায়াত করার সাহস দেখায় নি এবং অন্তত ১৬ টি জাহাজ ও ট্যাঙ্কার আক্রান্ত হয়। ভারতের কপালে দেখা দেয় চিন্তার ভাঁজ। কারণ তেল, রান্নার গ্যাস ও প্রাকৃতিক গ্যাস অনেকাংশেই হরমুজ প্রণালী দিয়ে ভারতে আসে।

উল্লেখ্য, ভারতের প্রায় ৬৫ শতাংশ রান্নার গ্যাস বা এলপিজি বাইরের দেশ থেকে আমদানি করতে হয় যার বেশিরভাগ অংশই আসে কাতার থেকে। হরমুজ প্রণালী দিয়েই ভারতের বিদেশ থেকে আসা প্রয়োজনীয় রান্নার গ্যাসের ৯০ শতাংশ আসে। অর্থাৎ ভারতের নিত্য প্রয়োজনীয় রান্নার গ্যাসের মোট প্রয়োজনের প্রায় ৫৫ শতাংশ আসে হরমুজ প্রণালী দিয়ে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকার অর্থ ভারতে রান্নার গ্যাসের আকাল পড়তে বাধ্য। প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্ষেত্রে প্রায় বেশিরভাগটাই আসে হরমুজ প্রণালী দিয়ে। অপরিশোধিত তেলের ক্ষেত্রেও সমস্যা হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকলে। ভারত প্রায় চল্লিশটি দেশের থেকে তেল নেয় এবং তেল আসার পথ বা রুট বৈচিত্র্যময় তথাপি প্রয়োজনীয় তেলের ৩০ শতাংশই আসে হরমুজ প্রণালী হয়ে। ফলে হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকলে ভারতে প্রভাব পড়তে বাধ্য এবং এই প্রভাব সাময়িকভাবে দেখো গিয়েছে।

অতঃপর ইরান তার শত্রু নয় এরকম দেশগুলির জন্য হরমুজ প্রণালী খুলে দেয়। এই দেশগুলির মধ্যে রয়েছে রাশিয়া, চিন ও ভারত। ভারতের বিদেশ মন্ত্রী জয় শঙ্করের সঙ্গে ইরানের বিদেশ মন্ত্রী আব্বাস আরাগছির ফোনে কয়েক দফা আলোচনা হয় যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালী। ভারতের কূটনৈতিক সাফল্য যে ভারতের পতাকা লাগানো জাহাজ ও ট্যাঙ্কারে ইরান আক্রমণ করবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। হরমুজ প্রণালী ভারতীয় জাহাজ ও ট্যাংকার গুলির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ নয় বলে এবং রান্নার গ্যাস বা তেল আসার পথ খুলে যাওয়ায় ভারত আপাতত কিছুটা নিশ্চিন্ত। তিন হাজারের বেশি বছর ধরে ইরানের সঙ্গে চলে আসা সুসম্পর্কর পথ ধরে যুদ্ধে নিরপেক্ষ ভারতের জন্য সবুরে মেওয়া।।

About Post Author