সময় কলকাতা ডেস্ক, ৮ ডিসেম্বর : বন্দুকের নল-ই ক্ষমতার উৎস” (Power flows from the barrel of a gun) ঐতিহাসিক কথাটির সঙ্গে অনেকেই পরিচিত। চীনের কমিউনিস্ট পার্টি ও কুওমিনতাং (Kuomintang বা KMT) দলের মধ্যে চলা রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের সময় এমনটাই বলেছিলেন কমিউনিস্ট নেতা মাও সে-তুং। নানচাং বিদ্রোহ (Nanchang Uprising) ব্যর্থ হওয়ার পর পার্টির একটি জরুরি সভায় মাও এই বক্তব্য পেশ করেন। তাঁর বক্তব্যের অর্থ ছিল, রাজনৈতিক ক্ষমতা বা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ পার্লামেন্টারি ব্যবস্থার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে অর্জন করা সম্ভব নয়, বরং তা সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমেই দখল করতে হবে। চীনের কমিউনিজমের প্রেক্ষাপটে এই বক্তব্যটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ভারতের কমিউনিজমে বা ভারতীয় রাজনীতিতে এই বক্তব্য খুব একটা প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেনি। তবুও বর্তমান ভারতে এই লাইনটা যেন সামান্য পাল্টে গেছে। বন্দুকের নলের বদলে ধর্ম এসেছে। চৈতন্য, রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ,মহাত্মা গান্ধীর দেশ শান্তির দেশ ভারতবর্ষে এখন যেন আপ্তবাক্য হয়ে উঠেছে ধর্মই ক্ষমতার উৎস। উত্তরপ্রদেশ ঘুরে বঙ্গে এখন ধর্মের হাওয়া প্রবল। প্রেক্ষাপট খুঁজতে আদি থেকে বর্তমানে যাওয়া যাক।
বলা হয়, ভারতবর্ষ সর্বধর্ম সমন্বয়ের পবিত্র ভূমি। আজ থেকে প্রায় ৪৪২ বছর আগে মহামতি আকবর দীন-ই-ইলাহী বলে এক নব ধর্মমতে সর্বধর্মের শুভ দিকের সমাহারে বিভিন্ন ধর্মমতের মিল ঘটাতে চেয়েছিলেন। ভারতবর্ষ ব্রিটিশরাজের হাত থেকে যখন স্বাধীন হয় তখন নতুন সংবিধান প্রতিটি মানুষের নিজস্ব ধর্মপালনের ও ধর্ম অনুশীলনের অধিকার দেয়। এই অধিকার থাকা সত্ত্বেও স্বাধীন ভারতে ধর্মীয় ভাবে সংঘাত ছিলই, স্বাধীনতার পরে বৃহৎ সংঘাতের অন্যতম উদাহরণ অযোধ্যার বাবরি মসজিদ বিতর্ক। বাবরি মসজিদ রাম জন্মভূমির উপরে প্রতিষ্ঠিত বলে হিন্দু ধর্মের একাংশ দাবি করে আসছিলেন।১৯৯২ সালে ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংস হয় কর সেবকদের হাতে। ২০১৯ সালে সুপ্রিম কোর্ট বিতর্কিত জায়গায় রাম মন্দির স্থাপনের অনুমতি দেয় ও অন্যত্র মসজিদ স্থাপনের জন্য জমি দেওয়ার নির্দেশ দেয়।
বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঠিক ৩৩ বছর পরে বঙ্গে বাবরি মসজিদ স্থাপন করার জন্য শিলান্যাস ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে হইচই ফেলে দিয়েছেন হুমায়ুন কবীর। বঙ্গের বাবরি মসজিদ জন্ম দিয়েছে বহুবিধ প্রশ্নের কারণ এনিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই যে, হুমায়ুন কবীরের এই মসজিদ স্থাপনের পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের ইচ্ছা এবং নির্বাচন কেন্দ্রিক ও রাজনৈতিকভাবে ধর্মীয় মেরুকরণ করার সমীকরণ। এতদূর পর্যন্ত একটি পর্ব সুস্পষ্ট যার ফলে বঙ্গের বাবরি মসজিদের সঙ্গে মিশেছে মুসলিম ধর্মাবেগ। অন্য আরেকটি পিঠও রয়েছে এই মেরুকরণের একটি দিক যেখানে অবস্থান হিন্দু ধর্মাবেগের। মুর্শিদাবাদের বেলডাঙায় মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পরের দিনই ব্রিগেডে লক্ষ কন্ঠে গীতা পাঠ করে বিজেপি ও আরএসএস কার্যত জানান দিয়েছে, হিন্দুত্বই তাদের ক্ষমতার উৎস। বঙ্গ বিজেপির তাবড় নেতারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
কেন মনে করা হচ্ছে ধর্মই ক্ষমতার উৎস ! রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পরে ধর্মীয় কারণে রাজনৈতিক ভাবে সারা ভারতে প্রভাব পড়েছিল। মনে করা হয়, দেশে বিজেপির উত্থানের পেছনেও রয়েছে অনেকাংশেই বাবরি মসজিদ। বঙ্গে বিজেপির উত্থান হলেও এবং রামলালা বা রামমন্দির হিন্দু ভোট টানলেও তাকে একজোট করতে পারে নি। পাশাপাশি, তৃণমূলের সংখ্যালঘু ভোট বাক্স অক্ষত থাকায় তৃণমূলকে বঙ্গের শাসন থেকে ক্ষমতাচ্যুত করা স্বপ্নই হয়ে থেকে গিয়েছে বিজেপির। এবার কী হতে চলেছে নতুন সমীকরণে?
বাবরি মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকারী হুমায়ুন কবীর ঘোষণা করে দিয়েছেন যে, মিমের সঙ্গে তার রাজনৈতিক ও ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন কেন্দ্রিক কথা হয়ে গিয়েছে। আসাদুদ্দিন ওয়াইসির সঙ্গে জোট বেঁধে সংখ্যালঘু ভোটবাক্সে থাবা বসাতে চান তিনি। বাবরি মসজিদ স্থাপন করতে চেয়ে তৃণমূল দল থেকে সাসপেন্ড হয়েছেন তিনি। তিনি এখন বলছেন,১৩৫ টি বিধানসভা আসনে লড়বে তাঁর নতুন দল। হুমায়ুন এও ঘোষণা করেছেন, ২৯৪ টি আসনের মধ্যে ৯০ টি আসনে রাজ্যে সংখ্যালঘুরাই সংখ্যাগুরু। এই আসন গুলির দিকেই তাঁর পাখির চোখ। এবার মালদা- মুর্শিদাবাদ সহ একাধিক জেলায় সংখ্যালঘু ভোট ব্যাঙ্ক কে কুক্ষিগত করার জন্যই যে তিনি ধর্মগুরু না হয়েও ধর্মীয়ভাবে এগোচ্ছেন তা সুস্পষ্ট।

সন্দেহের অবকাশ নেই যে, বঙ্গের ভোট কেন্দ্রিক রাজনীতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে ধর্ম। সংখ্যালঘু ভোট বাক্সে হুমায়ুন থাবা বসালে ক্ষতি তৃণমূলের এবং তৃণমূলের সংখ্যালঘু ভোট কমলে পরোক্ষভাবে লাভ বিজেপির। পাশাপাশি, এইসব জেলায় মনস্তাত্ত্বিকভাবে বাবরি মসজিদ ভিত্তিপ্রস্তরের পরে হুমায়ুনের আস্ফালন দেখে হিন্দুরা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় এককাট্টা ভাবে হয়ে বিজেপির দিকে ঝুঁকে পড়বে, এমন সম্ভাবনাও রয়েছে। শুধু তাই নয় সারা বঙ্গে এর প্রভাব পড়তে পারে। লক্ষে কন্ঠে গীতা পাঠে বিজেপি ধর্মীয়ভাবে আরেকটি সফল তাস ভোটের আগে খেলে ফেলেছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
গত লোকসভা ভোটের নিরিখে, তৃণমূল ও বিজেপির ফারাক তো রাজ্যে ছিল মাত্র ৯-১০ শতাংশ। সেটা এখন বাবরি মসজিদ ও গীতা পাঠ দুদিকের ধর্মীয় তাসে কমে কিনা এখন সেটাই দেখার। বঙ্গে ধর্মই ক্ষমতার উৎস হয়ে ওঠে কিনা তাও দেখার।।


More Stories
শ্লীলতাহানির অভিযোগে গ্রেফতার জয়প্রকাশ
বিরোধী দলনেতার স্বীকৃতি তৃণমূল থেকে বহিস্কৃত ঋতব্রতকে
অভিষেকের দুয়ারে ইডি