পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা : মালদা জেলার যে দুটি আসনে ফলাফল কোন দিকে যাবে তা নিয়ে সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তা সেই দুটি বিধানসভা কেন্দ্র হল রতুয়া এবং চাঁচল। চাঁচলে উল্লেখযোগ্য হবে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে এবং সেখানে নির্দল ফ্যাক্টর নির্ণায়ক ভূমিকা নিতে পারে। চাঁচলের মতোই টানটান উত্তেজনা রতুয়াতে, এই কেন্দ্রে আবার সরাসরি দ্বিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা। বিজেপি এখানে লড়াইয়ে থাকলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বী যারা সেই কংগ্রেস বনাম তৃণমূল কংগ্রেসের ভোট যুদ্ধে কে জয়ী হবে?
রতুয়া বিধানসভা কেন্দ্র
রতুয়া বিধানসভা কেন্দ্রে এবার কি হতে চলেছে? রতুয়া বিধানসভা কেন্দ্রটি মালদা শহরের দিক থেকে ধরলে কার্যত শুরু হয়েছে ইংলিশ বাজারের ভৌগোলিক সীমানা শেষ হয়ে কালিন্দী নদী তথা মাদিয়াঘাট ছাড়ালে। এই বিধানসভা কেন্দ্রে আড়াই ডাঙ্গা, পরানপুর, পুকুরিয়া থেকে শুরু করে রতুয়া পর্যন্ত বিস্তৃত । এই কেন্দ্র থেকে ১৯৮২ সাল ২০২১ সাল পর্যন্ত পাঁচবার বিজয়ী হয়েছেন সমর মুখার্জি। একদা কংগ্রেসের থাকলেও বর্তমানে তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের সদস্য। এবারও এই বিধানসভা কেন্দ্রে তৃণমূলের প্রার্থী তিনি। এই কেন্দ্রটি থেকে ২০০১ ও ২০০৬ সালে সিপিএমের প্রবাদ প্রতিম নেতা শৈলেন সরকার। শৈলেন সরকার ছিলেন দাপুটে নেতা, ইংলিশ বাজার বিধানসভা কেন্দ্র থেকে একাধিকবার বিজয়ী হয়েছিলেন তিনি। শুধু তাই নয় ১৯৯১ সালের লোকসভা নির্বাচনে মালদার রাজনীতিতে বটবৃক্ষ গনি খান চৌধুরীকে হারানোর উপক্রম করেছিলেন। এবার দু হাজারেরও কম ভোটে তিনি হেরে যান। সেই শৈলেন সরকারকেও ২০১১ সালে হারতে হয়েছিল সমর মুখার্জির কাছে। সেই সমর মুখার্জীরাজনৈতিক জীবনের শেষ ভাগে এসে রীতিমতো চাপে রয়েছেন। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বোঝা যায় বিজেপি এখানে নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করেছে এবং অভিষেক সিংহানিয়া সেবার ৫৫ হাজার ভোটে তথা ২৫ শতাংশ ভোট পান। অভিষেক সিংহানিয়া এবারও বিজেপির প্রার্থী । এই অঞ্চলের মৈথিল ব্রাহ্মণ বলয়ের বেশ বড় অংশের ভোট পাবে বিজেপি। তবুও প্রধান লড়াই হতে চলেছে কংগ্রেস বনাম তৃণমূল কংগ্রেসের।২০২১ সালে বাম সমর্থিত কংগ্রেস সুবিধা করতে পারে নি। এবার এই কেন্দ্রে কংগ্রেসের প্রার্থী মোত্তাকিন আলম, বামেরা এবার সঙ্গে নেই তবে বাম প্রার্থী জহুর আলম ভালো জায়গায় নেই। কংগ্রেসের ভোট সেভাবে কমার সম্ভাবনা নেই বরং নিশ্চিতভাবেই বৃদ্ধি পাবে। কংগ্রেস ২০২১ সালের পর থেকেই এখানে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। ২০২১ সালে এখানে কংগ্রেসের নাজমা খাতুনের জামানত জব্দ হয়েছিল। আশ্চর্যজনকভাবে পাঁচ বছর পরে সমীকরণ আমুল পরিবর্তিত হয়েছে।২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের দিকে যদি নজর রাখা যায় তাহলে চোখে পড়বে মালদা উত্তর লোকসভা কেন্দ্রের এই আসনে মোস্তাক আলম বিপুল সংখ্যক ভোট পেয়েছিলেন এবং সর্বাগ্রে ছিলেন। তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় এর চেয়ে ৩৩ হাজার ভোটে এগিয়েছিলেন এবং এই মার্জিন ফেলনা নয়। বিজেপি এই বলয়ের অর্থাৎ মালদার এই অংশের অন্য একাধিক আসনের মতো যথারীতি তৃতীয় স্থানেই লড়াই শেষ করেছিল। এই একই সমীকরণ পরিলক্ষিত হয়েছে হরিশ্চন্দ্রপুর, মালতীপুর এবং চাঁচল বিধানসভা কেন্দ্রে । তবুও এই কেন্দ্রে তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্ব পরীক্ষিত প্রবীণ নেতা সমর মুখার্জির উপরে আস্থা রেখেছে। বিরোধীদের অভিযোগ,এই অঞ্চলে উন্নয়ন নিয়ে রয়েছে ক্ষোভ। এছাড়াও বিগত দিনে দুটি গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষের জন্য সমর মুখার্জির উপরে ক্ষোভ রয়েছে। এই ক্ষোভ কিছুটা হলেও প্রশমিত হওয়ায় এবং পাশাপাশি বিধানসভা কেন্দ্রগুলির মধ্যে তৃণমূলের অন্তর্দ্বন্দ্ব কম থাকায় তৃণমূলের জয়ের সম্ভাবনা অন্য দুটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সমানে সমানে লড়াইয়ে রয়েছে। বরং সমর মুখার্জির মেশিনারি যথেষ্ট সচল হওয়ায় তাঁর জ্বর সম্ভাবনা আরো বেড়েছে তথাপি রতুয়া বিধানসভা আসনে এবার বিজেপির সঙ্গে তৃণমূলের মূল লড়াই নয়। এবার লড়াই কংগ্রেস ও তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যে। কংগ্রেসের মালদা জুড়ে উত্থান হলেও মোত্তাকিন বাজিমাত করতে পারেন কিনা সেটাই প্রশ্ন। তৃণমূলের সমর মুখার্জী প্রচারের শেষ লগ্নে মাটি অনেকটাই মজবুত করে ফেলেছেন। আপাতত দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে সমর মুখার্জী তাঁর আসন ধরে রাখতে পারেন যদিও কংগ্রেসের মোত্তাকিন আলমের জয়ের সম্ভাবনা খুব কম নয় । মোত্তাকিন বয়সে নবীন হলেও রাজনীতিতে নতুন নন। ২০১৬ সালে তিনি মানিকচক বিধানসভা কেন্দ্রে সাবিত্রী মিত্র মত হেভিওয়েটকে হারিয়ে দিয়েছিলেন এবং ২০২১ সালে অপ্রত্যাশিতভাবে এই আসনে খারাপ ফল করেছিলেন। এবার আসন পরিবর্তন করে তিনি লড়ছেন রতুয়া বিধানসভা কেন্দ্র থেকে। ২০২৬ সালে সমর মুখার্জির বিরুদ্ধে তাঁর জয়ের সম্ভাবনা কে রাজনৈতিক মহল গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে যার প্রধান কারণ সংখ্যালঘু ভোট ব্যাংক এই অঞ্চলে কিছুটা হলেও তৃণমূলের থেকে কংগ্রেসের দিকে ঝুঁকে পড়েছে ও শাসক দলের বিরুদ্ধে ভোটারদের ক্ষোভ বেড়েছে । জেলার রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে সমর মুখার্জির জয়ের সম্ভাবনা থাকলেও চমক দিতেই পারেন মোত্তাকিন। এমনকি, পাশা উল্টে দিতে পারেন কংগ্রেস প্রার্থী। যেকেউ জিততে পারে। ভোটের প্রচারে প্রথম দিকে অ্যাডভান্টেজ পাওয়া মোত্তাকিন জিতবেন একথা নিশ্চিত ভাবে বলা যাচ্ছে না। কারণ শেষ মুহূর্তে দেখার, সমর মুখার্জী ড্যামেজ কন্ট্রোল কতটা করতে পেরেছেন!
*রতুয়া বিধানসভা কেন্দ্র সম্ভাব্য জয়ী প্রার্থী *মোত্তাকিন আলম (কংগ্রেস* )


More Stories
কী হবে মালদা বিধানসভা কেন্দ্রে?
২০২৬ বিধানসভা নির্বাচন : কে জিতবে গাজোলে?
২০২৬ বিধানসভা নির্বাচন- বাম পতাকা উড়তে পারে ডোমকলে