সানি রায় ও পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা, ২৯ জুন : বহুদিন আগেই সুকুমার রায় “জীবনের হিসাব”কবিতায় “বিদ্যে বোঝাই বাবুমশাই”-দের ছবি তুলে ধরে শিক্ষার বাস্তবধর্মী প্রয়োগের অভাবের কথা বলেছিলেন । ভারতে প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতিতে বিদ্যেবোঝাই বাবুমশাইদের সংখ্যা বেড়ে চললেও বাস্তবমুখী শিক্ষার অভাব। বিভিন্ন উন্নত দেশে বাস্তবমুখী শিক্ষার প্রয়োজন বুঝে শিশু পড়ুয়াদের জীবনের বাস্তব দিকের সঙ্গে পরিচিত করানো হয়। উত্তরবঙ্গেও সেরকম সম্ভাবনাময় এবং অভিনব উদ্যোগ নিল একটি বাংলা মাধ্যম স্কুল। ধুপগুড়ির শ্রী শ্রী নিত্যকমলানন্দ সারদা শিশু মন্দির কার্যত উন্নততর দেশের মডেলে সবজির বাজারে উন্মুক্ত শ্রেণিকক্ষের পাঠ অভ্যেস করালো পড়ুয়াদের । হাতে টাকা দিয়ে পড়ুয়াদের সবজি বাজারে গিয়ে বাজার করে, ফর্দ -তালিকা এবং হিসেবের মাধ্যমে হাতে কলমে গণিত শিক্ষার পাঠশালা চলল । বাজারে উন্মুক্ত শ্রেণিকক্ষের পাঠ অভ্যেস করিয়ে জীবনমুখী শিক্ষার অনন্য দিক খুলে দিল ধুপগুড়ির নিত্যকমলানন্দ সারদা শিশু মন্দির।
উল্লেখ করা যেতে পারে, এই পদ্ধতি ফোর ওয়েস গ্রশারি শপিং’ (Four Ways Grocery Shopping) নামে বিদেশে পরিচিত। পদ্ধতিটি শিশু ও স্কুলপড়ুয়াদের বাস্তবমুখী শিক্ষার একটি অসামান্য জীবনমুখী মাধ্যম হিসেবে বিদেশে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও প্রচলিত। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত দেশগুলোতে শিশুদের কেবল বইয়ের পাতায় না শিখিয়ে বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে (Experiential Learning) বড় করার প্রবণতা রয়েছে। সুপারমার্কেট বা গ্রশারি শপগুলোকে সেখানে শিশুদের জন্য একটি ‘উন্মুক্ত শ্রেণিকক্ষ’ মনে করা হয়।
শিক্ষাবিদরা কেন এই পদ্ধতিতে পড়ুয়াদের জন্য আদর্শ মনে করেন? পড়ুয়ারা বাজারে উন্মুক্ত শ্রেণিকক্ষের পাঠ ক্রম হিসেবে সরাসরি বাজারে গিয়ে তালিকা তৈরি করার মধ্যে দিয়ে (Planning) পড়ুয়ারা প্রথমে সামগ্রী দেখে বা লিখে একটি বাজারের ফর্দ তৈরি করে।এটি তাদের শ্রেণীবিন্যাস (যেমন: ফল, সবজি) ও পরিকল্পনার দক্ষতা বাড়ায়। কাল্পনিক পণ্যের দাম হিসাব না করে বাস্তবমুখী গণনা শেখায় । গণিত সম্পর্কে ধারণা স্বচ্ছ হয় দ্রুত হয় গণনা ক্ষমতা। দোকান ঘুরে পণ্য খোঁজা (Sorting & Selecting) করায় ওজন, আকার, রং বা পুষ্টিগুণ বিচার করে সঠিক জিনিসটি বেছে নেওয়ার পাশাপাশি বিষয়টি তাদের চারপাশের পরিবেশ বুঝতে এবং সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।বিল পরিশোধ ও সামাজিকতার এবং বৃহত্তম জীবনের বৃহত্তর জীবনের ক্ষেত্রে এটি একটি পদক্ষেপ বলেই মনে করা হয়।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এই ব্যতিক্রমী ভাবনায় স্বাভাবিকভাবেই দারুণ খুশি পড়ুয়ারা। জানা গেছে, বিদ্যালয়ের সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণীর মোট ২৪ জন ছাত্র-ছাত্রীকে নিয়ে এই বিশেষ ‘গণিত বাজার’-এর আয়োজন করা হয়েছিল। তবে শুধু বাজার ঘোরানোই নয়, তাদের দেওয়া হয়েছিল একটি মজাদার টাস্ক। পড়ুয়াদের কেবল বাজারে নিয়ে গিয়েই ছেড়ে দেওয়া হয়নি, তাদের প্রত্যেকের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল নগদ ৫০ টাকা। সেই নির্দিষ্ট বাজেটের মধ্যে থেকেই নিজেদের পছন্দমতো সবজি কেনার নির্দেশ দেওয়া হয়।২৪ জন খুদে পড়ুয়া থলি হাতে বাজারের এমাথা-ওমাথা ঘুরে দাম দরের হিসেব কষে। কেজি প্রতি দাম কত, সেই অনুযায়ী ১০০ গ্রাম বা ২৫০ গ্রামের দাম কত হবে, বিক্রেতাকে টাকা দেওয়ার পর কত ফেরত পাওয়া উচিত এই সমস্ত হিসেব তারা নিজেরাই মুখে মুখে করে। ৫০ টাকার গণ্ডির মধ্যে থেকে কীভাবে সর্বোচ্চ লাভজনক উপায়ে বাজার করা যায়, তা ছিল এক দারুণ বাস্তব বুদ্ধির পরীক্ষা।

বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মতে, অনেক সময়ই ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে গণিত নিয়ে একটা ভীতি কাজ করে। মুখস্থ বিদ্যা বা খাতার হিসেব অনেক সময় বাস্তব জীবনে কাজে লাগাতে পারে না তারা। সেই জড়তা কাটানোর জন্যই এই বাজারের ক্লাসরুম। বাজারের এই বাস্তব অভিজ্ঞতা ওদের শুধু অঙ্কের হিসেবই শেখাবে না, বরং ভবিষ্যতের জন্য আত্মবিশ্বাসী ও স্বাবলম্বী করে তুলবে। পড়ুয়ারা খুশি, অভিভাবকরাও খুশি বিদ্যালয়ের এই জীবনমুখী পঠন-পাঠনে।।
আরও পড়ুন Dhupguri: মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে নাবালককে বাঁচাল ধূপগুড়ির ডাক্তার, প্রশংসার ঝড় এলাকায়
বাজারে উন্মুক্ত শ্রেণিকক্ষের পাঠ #ধূপগুড়ি


More Stories
ভুটানের নদীর তান্ডবে ক্ষয়ক্ষতি উত্তরবঙ্গে
গজরাজদের খিদে পায়, হাতি কাহা কাহা চলে !
হরিণের পালের নতুন জীবন দিলেন অবোধেশ- মনোহর