পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা : রবার্ট লুই স্টিভেনসনের উপন্যাস ‘ ডক্টর জেকিল ও মিস্টার হাইডের আশ্চর্য ঘটনা ‘ এক সময় সাড়া ফেলেছিল। এই নভেলার কেন্দ্রীয় চরিত্র দুটি সত্বার অধিকারী । মানুষের কাছে সুপ্রিয়,অতি ভদ্র এক মানুষের ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক নৃশংস হত্যাকারী । এই উপন্যাস প্রকাশের প্রায় একশো বছর পরে উপন্যাসের মুল চরিত্র বাস্তবে প্রকাশ পায় এক খুনী চিকিৎসককে ঘিরে । ইংল্যান্ডের হ্যারল্ড ফ্রেডরিক শিপম্যান ছিলেন সেই অদ্ভুত চরিত্র যিনি ডাক্তারি পেশায় স্বনামধন্য হয়েও ঠান্ডা মাথায় একের পর এক খুন অনায়াসে করে সাক্ষ্য প্রমাণ লোপাট করে দিতেন।তাঁকেই পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সিরিয়াল কিলার বলে মনে করা হয়। তাঁর চেয়ে বেশি খুনে আজ পর্যন্ত আর কেউ অভিযুক্ত হয় নি।সাক্ষ্যপ্রমাণ অনুযায়ী ১৫টি খুনের জন্য তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হলেও মনে করা হয় প্রায় ২৫০ টি খুন তিনি করেছিলেন। পৃথিবীর সিরিয়াল কিলার হিসেবে এতগুলি খুনের সাথে কোনও ঘাতকের জড়িয়ে থাকার নজির বিরল।
শিপম্যানের জন্ম ইংল্যান্ডে,১৯৪৬ সালে। ১৯৭৫ থেকে ৯৮ – তেইশ বছর ধরে লোকচক্ষু ও আইনকে ফাঁকি দিয়ে চলেছিল তাঁর হত্যালীলা।বাহ্যিকভাবে সমাজের এক মান্যগণ্য ও সুভদ্র এক ব্যক্তিত্ব শিপম্যান কার্যত পারিবারিক চিকিৎসকের ভূমিকা নিয়ে হয়ে ওঠেন”মৃত্যুর দেবদূত “।

মেধাবী ছাত্র শিপম্যানের জীবনের গতিপথ পাল্টে যায় যখন তিনি মাত্র ১৭ বছর বয়সে। সেই বছর, তার মা
ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। যখন তিনি হাসপাতালে মারা যাচ্ছিলেন, তখন শিপম্যান ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন যে ডাক্তার কীভাবে তাকে মরফিন দিয়ে তার কষ্ট কমিয়েছিলেন।মনে করা হয় যে যে এই মুহূর্তটিই তাঁকে করে তুলেছিল সবচেয়ে ঠান্ডামাথার ভয়ঙ্কর খুনী । বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, শিপম্যান রোগীকে ব্যথানাশক ডায়মরফিনের একটি প্রাণঘাতী ইনজেকশন দিয়ে রোগীর মৃত্যুকে স্বাভাবিক রূপ দিতেন। যারা দীর্ঘমেয়াদী রোগে ভুগছেন তাঁদের জন্য তিনি যমরাজ হয়ে ওঠেন। দুর্বল এবং বয়স্করা হয়ে ওঠেন তাঁর শিকার। দেখা গেছে ৪১ থেকে ৯৩ বছরের রোগীরা তাঁর শিকার হয়েছেন এবং বেশিরভাগ রোগী ছিলেন মহিলা । তার উদ্দেশ্য ছিল অস্পষ্ট; কেউ কেউ যেমন অনুমান করেছিলেন যে শিপম্যান হয়তো তার মায়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলেন, আরেকটি তত্ব পাশাপাশি খাড়া করা হতে থাকে যে তিনি ভেবেছিলেন তিনি ইচ্ছামৃত্যু অনুশীলন করছেন। এমনটা হতেও পারে তিনি ইচ্ছে করে জনসংখ্যা থেকে বয়স্ক লোকদের সরিয়ে দিচ্ছেন যারা বেঁচে থাকলে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার জন্য বোঝা হয়ে উঠতে পারে। সাইকো কিলার হিসেবে ইতিহাসে কুখ্যাত শিপম্যানের জীবন কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে খুব জটিল ছিল না।
শিপম্যান প্রথমে সুচিকিৎসক নামেই পরিচিত ছিলেন।ক্যাথলিন গ্রান্ডি নামে এক বৃদ্ধার মৃত্যু তদন্ত করা পুলিশের মনে নিজের সন্দেহ ঢুকিয়ে দেন এক ট্যাকসিচালক।শিপম্যানকে নিয়ে তদন্তের জাল গুটিয়ে আনতে সচেষ্ট পুলিশকে নতুন ভাবে ভাবাতে থাকে ট্যাকসিচালকের বক্তব্য যিনি দেখেছিলেন শিপম্যানের কাছে চিকিৎসা করাতে যাওয়া রোগীরা কেউ আর জীবিত ফিরছিলেন না। অথচ এদের অনেকেই খুব অসুস্থ ছিলেন না।

আরও আগে ১৯৯৮, সালের মার্চ মাসে হাইডে ব্রুক সার্জারির লিন্ডা রেনল্ডস শিপম্যানের রোগীদের মধ্যে উচ্চ মৃত্যুর হার সম্পর্কে দক্ষিণ ম্যানচেস্টার জেলার করোনার জন পোলার্ডের কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।পুলিশ অভিযোগ আনার জন্য যথেষ্ট প্রমাণ খুঁজে পায়নি এবং ১৭ এপ্রিল তদন্ত বন্ধ করে দেয়।পরবর্তীতে শিপম্যান তদন্তের সময় গ্রেটার ম্যানচেস্টার পুলিশকে এই মামলায় অনভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের নিয়োগের জন্য দায়ী করা হয়েছিল। কারণ তদন্ত বন্ধ হওয়ার পর, শিপম্যান আরও তিনজনকে হত্যা করে।সে বছরই আগস্টে, ট্যাক্সি চালক জন শ পুলিশকে জানান যে তিনি শিপম্যানকে ২১ জন রোগীকে হত্যার জন্য সন্দেহ করেছিলেন।শ’ র সন্দেহ দানা বাঁধে কারণ অনেক বয়স্ক গ্রাহককে তিনি হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন, যাদের স্বাস্থ্য ভালো বলে মনে হয়েছিল, শিপম্যানের চিকিৎসা শুরু হতেই তাঁরা পরপর মারা যান। একজন দুজন নয়, একুশ জন একইভাবে মারা যেতে শ বোঝেন বড় ধরণের গোলমাল একটা রয়েছে।
শিপম্যানের অপরাধের খোলসা হতে থাকে সেবছর জুন মাস থেকে । খুনে ডাক্তারের শেষ শিকার ছিলেন ৮১ বছরের ক্যাথলিন গ্র্যান্ডি। শিপম্যান এই হত্যাকাণ্ডেই ফেঁসে যান। বৃদ্ধা ক্যাথলিনকে ১৯৯৮ সালের ২৪ জুন-এ তার বাড়িতে মৃত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। শিপম্যান ছিলেন শেষ ব্যক্তি যিনি তাকে জীবিত দেখেছিলেন; পরে তিনি তার মৃত্যু শংসাপত্রে মৃত্যুর কারণ হিসেবে বার্ধক্যকে উল্লেখ করেছিলেন ।গ্র্যান্ডির মেয়ে, আইনজীবী অ্যাঞ্জেলা উডরাফ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন যখন সলিসিটর ব্রায়ান বার্গেস তাকে জানান যে একটি উইল করা হয়েছে এবং উইল থেকে আত্মীয়দের বঞ্চিত করা হয়।উইল থেকে শিপম্যানের আর্থিক সুবিধা সামনে আসতেই তাঁর অপরাধ অবশেষে ধরা পড়ে। জানা যায়, শিপম্যান গ্র্যান্ডিকে ডায়মরফিনের একটি প্রাণঘাতী ডোজ দেওয়ার পরে উইল আত্মসাত করার চেষ্টা করেন।অ্যাঞ্জেলা উডরাফ চিকিৎসক শিপম্যানকে নিয়ে এরকমই সন্দেহ শুরু করে পুলিশের কাছে গিয়েছিলেন। অতঃপর গ্রেপ্তার হন শিপম্যান এবং তদন্তে সামনে আসতে থাকে দীর্ঘ সময় ধরে ঠান্ডা মাথায় তাঁর হাড় হিম করা হত্যাগুলি।
২০০০ সালে আদালতের রায়ে শিপম্যান তার তত্ত্বাবধানে থাকা পনেরো জন রোগীকে হত্যার জন্য দোষী সাব্যস্ত হন। পনেরোটি খুন প্রমান করা গেলেও তিনি যে আরও দ্বিশতাধিক হত্যায় যুক্ত ছিলেন তার আভাসও মেলে তবে অনেক খুনেই প্রমাণ লোপাট করা হয়েছিল সুকৌশলে । আইনের বিচারে শিপম্যানকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয় এই সুপারিশে যে তাকে কখনো মুক্তি দেওয়া হবে না।শিপম্যান তার ৫৮তম জন্মদিনের এক দিন আগে ১৩ জানুয়ারী ২০০৪-এ ওয়েস্ট ইয়র্কশায়ারের এইচএম প্রিজন ওয়েকফিল্ডে তার কক্ষে ঝুলে আত্মহত্যা করেন।শেষ হয়ে যায় ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও ধারাবাহিক ঘাতকের অধ্যায়।।


More Stories
হরমুজ প্রণালী, রান্নার গ্যাস ও তেল এবং ভারত -ইরানের সম্পর্ক
যুদ্ধের জাঁতাকলে ভারত
ইতিহাস গড়তে পারল না নেপাল, ইংল্যান্ডের কাছে হার মাত্র ৪ রানে