সানি রায়, সময় কলকাতা : কবি অমিতাভ দাশগুপ্ত লিখেছিলেন, “কাঠের চেয়ারে বসে থাকতে থাকতে মানুষও একদিন কাঠ হয়ে যায়।” সাধন রায় হুইলচেয়ারে বসে থাকতে থাকতে হয়তো কাঠ হয়ে গিয়েছেন। হুইলচেয়ারের জীবন এবং কে এই সাধন রায়, কেন তাঁকে নিয়ে স্বতন্ত্র প্রতিবেদন তা বুঝতে হলে বর্তমানের ছবি তুলে ধরে কিছুটা পিছিয়ে যেতে হবে।
ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! একসময় ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট ইলেকট্রিসিটি বোর্ডের অপারেটর পদে কাজ করে যিনি হাসিখুশি একটা সংসার চালাতেন, আজ তিনি হুইলচেয়ারে বসে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। বয়োবৃদ্ধা মা, স্ত্রী আর অপরের দেওয়া একটা ভাঙা হুইলচেয়ারই এখন তাঁর জীবনের শেষ সম্বল। চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে জমানো টাকা, শখের বাইক এমনকি মাথা গোঁজার ভিটেমাটি পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছে। এই অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এখন সময়ের দাবি।
জলপাইগুড়ি জেলার ধুপগুড়ি ব্লকের ঝাড় আলতা ২ নং গ্রাম পঞ্চায়েতের বাসিন্দা সাধন রায় (৩১)। তিনি তৎকালীন তৃণমূল সরকারের আমল থেকেই বিজেপির একজন একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ২০২৪ সালের ৪ঠা জুন লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশ হলে জলপাইগুড়ি আসন থেকে বিপুল ভোটে জয়ী হন বিজেপি প্রার্থী ডক্টর জয়ন্ত কুমার রায়। এই জয়ের পর জলপাইগুড়ি জেলার অন্যান্য প্রান্তের মতো ঝাড় আলতা ২ নং গ্রাম পঞ্চায়েতেও বিজেপি কর্মী-সমর্থকেরা গেরুয়া আবির মেখে বিজয় উৎসবে মেতে ওঠেন।সেই খুশির আবহেই বন্ধুদের সঙ্গে বাইকে করে বিজয় মিছিলে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন সাধন। কিন্তু পথেই এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হন তিনি। স্থানীয় বাসিন্দারা তাকে উদ্ধার করে দ্রুত ধুপগুড়ি গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে তার শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি হলে চিকিৎসকেরা তাকে উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে স্থানান্তরিত করেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা জানান যে, দুর্ঘটনার অভিঘাতে সাধনের পুরো শরীর প্যারালাইজড (পক্ষাঘাতগ্রস্ত) হয়ে গেছে।এরপর দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন বেসরকারি নার্সিংহোমে তার চিকিৎসা চালানো হয়। বর্তমানে, ২০২৬ সালের জুন মাসে এসে চিকিৎসার সুফলে সাধন কোনোমতে কথা বলতে পারছেন, তার জ্ঞান ফিরেছে এবং সামান্য হাত নাড়াচাড়া করতে পারছেন। তবে এখনও সম্পূর্ণ সুস্থ হতে তার দীর্ঘ পথ চলা বাকি।
সঠিক চিকিৎসা পেলেই সাধন হয়তো আবারও নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবেন। কিন্তু এই মুহূর্তে তাঁর জন্য সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে হাসপাতালে যাওয়ার মতো ন্যূনতম অর্থটুকুও না থাকা। বাড়িতে রয়েছেন বৃদ্ধা মা ও স্ত্রী। যে হুইল চেয়ারে বসে তাঁর জীবনের দীর্ঘ দুই বছর কেটেছে, অন্যের ব্যবহার করা সেই চেয়ারটিও আজ প্রায় ভগ্নদশা। সাধনের এই চরম দুঃখ, যন্ত্রণা ও মৃত্যুর সঙ্গে লড়াইয়ের কাহিনী যেকোনো সিনেমার গল্পকেও হার মানায়। একসময়ের বিজেপি কর্মী হওয়া সত্ত্বেও, তিনি কোনো সাহায্য পাননি। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসলেও, পুরনো এই কর্মীর কথা আজ আর কেউ মনে রাখেনি। জীবনের এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে কেউ তাঁর পাশে এসে দাঁড়ায়নি, এমনকি কেউ তাঁকে দেখতেও আসেনি।
আজ সাধনের মা এক বুক আশা নিয়ে চেয়ে আছেন, হয়তো কেউ একজন এগিয়ে আসবে তাঁর এই সন্তানের যন্ত্রণা লাঘব করতে। অন্যদিকে, সাধন নিজেও মানসিকভাবে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত। যে বয়সে তাঁর নিজের মা ও স্ত্রীর দেখভাল করার কথা, উল্টে সেই বয়সেই তাঁরা তাঁর সেবাযত্ন করছেন। এই নির্মম লড়াইয়ে সাধন ভেঙে পড়লেও, সকলের সহযোগিতায় ফের আগের মতো স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার জন্য বুক বেঁধেছেন। তাঁর এই ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই এখন সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে বর্তমান সমাজের সহানুভূতিশীল মানুষ, জনপ্রতিনিধি, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এবং সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের সহায়তার ওপর। সময়ই বলবে সাধন রায়ের ফিরে আসার পথ আগামীতে কতটা সুগম হয়!
হুইলচেয়ারের জীবন #উত্তরবঙ্গ


More Stories
ছাত্রীর শ্লীলতাহানি, গণপ্রহার ও গ্রেফতার
নেতাজি ইস্যু : অনন্ত মহারাজকে উন্মাদ আখ্যা দিলেন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত!
পাক সংগঠন আইএসআই-এর জঙ্গি হাবড়ায় গ্রেফতার