Home » হেট একটারহুইস ও আনা ফ্রাঙ্ক

হেট একটারহুইস ও আনা ফ্রাঙ্ক

পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা :

“আমি যখন লিখি তখন আমি সামগ্রিকভাবে বেপরোয়া। আমার সব দুঃখ উড়ে যায়, ফিরে আসে উদ্দীপনা। প্রশ্ন হল আমি কি মহান কোনও কিছু লিখে যেতে পারব? আমি কি হতে পারব সাংবাদিক বা লেখক? ” – এই লেখনী যে কিশোরীর কলম নিঃসৃত তার জন্মদিন ১২ জুন। তার নাম আনেলিস মারি আনা ফ্রাঙ্ক। একটি অটোগ্রাফ লেখার খাতায় সে যে বিবরণ লিখেছিল তা হয়ে উঠেছে ফ্যাসিবাদের বিপক্ষে প্রকাশ পাওয়া এক আশ্চর্য মরমী মানবিক দলিল। আনার লেখা বিবরণ প্রথম ১৯৪৭ সালে ডাচ ভাষায় প্রকাশ পায় ” হেট একটারহুইস ” নামে যা ১৯৫২ সালে ইংরেজি ভাষায় “ডায়েরি অফ অ্যা ইয়ং গার্ল ” রূপে অনুদিত হয় ।

আনা ফ্রাঙ্ক সম্পর্কে বিস্তারিত উল্লেখ আজ নিষ্প্রয়োজন কারণ তার নাম গত সত্তর বছর ধরে বিশ্ব জেনে এসেছে তার লেখা ডায়েরির সুবাদে। আনার জন্ম ১৯২৯ সালে আর মৃত্যু ১৯৪৫ সালে টাইফাস রোগে নাৎসী বন্দী শিবিরে। ১৯৪৪ সালের আগস্ট মাসে জার্মান বাহিনীর হাতে তাঁদের বন্দী হতে হয় একটারহুইস থেকে।একটারহুইস ছিল আনার বাবা অটো ফ্রাঙ্ক নির্বাচিত পরিবারের গোপন ডেরা। অটো ফ্রাঙ্ক ছিলেন আর্থিকভাবে সমৃদ্ধ। আনা ফ্রাঙ্ক জন্মেছিলেন জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে। তাঁদের পরিবার ১৯৩৩ সালে নেদারসল্যান্ডের আমষ্টারডামে চলে যায়। দিব্যি কেটে যাচ্ছিল দিন। ১৯৪০ সালে আমষ্টারডাম জার্মানির দখলে চলে আসে। শুরু হয় ইহুদি নিধন যজ্ঞ।

১৯৪২ সালের জুলাই মাসে ফ্রাঙ্ক ফ্যামিলি তাদের গোপন স্থানে চলে যায় যা কিনা একটারহুইস নামে পরিচিত ছিল।বাংলায় এর অর্থ গুপ্ত সংযুক্ত ভবন। এটি ছিল একটি ৩ তলা বাড়ি।আনার বাবা অটো ফ্রাঙ্কের খুব কাছের মানুষদের সহযোগিতায় এই গুপ্তস্থানটিতেও ফ্রাঙ্ক পরিবারের মানুষেরা ১৯৪৪ সালের আগস্ট মাস অব্দি সুরক্ষিত ছিলেন।অতঃপর বন্দী দশা ও মৃত্যু নেমে আসে ফ্রাঙ্ক পরিবারের তিনজনের তরফে।

আনা ফ্রাঙ্কের মৃত্যুর তিন বছর পরে একটারহুইসের নামেই ডাচ ভাষায় প্রকাশ পায় আনা ফ্রাঙ্কের বিবরণ। আর এবিষয়ে উল্লেখের দাবী রাখে আনা ফ্রাঙ্কের বাবা অটো ফ্রাঙ্কের এবং অটো ফ্রাঙ্কের সেক্রেটারি মাইয়েপ গিয়েসের কথা।যুদ্ধশেষে যখন রেডক্রস ফ্রাঙ্ক ভগ্নিদ্বয়ের মৃত্যুর কথা ঘোষণা করে তখন যুদ্ধশেষে একাকী ফিরে আসা অটো ফ্রাঙ্ক ফিরে পেলেন তাঁর মেয়ের লেখা। মাইয়েপ গিয়েস অটো ফ্রাঙ্কের হাতে তুলে দেন তাঁর মেয়ের লেখা।

আনা ফ্রাঙ্কের লেখায় ছিল একটারহুইস বা গুপ্তকক্ষে থাকাকালীন সময়ে বিভিন্ন ঘটনার উল্লেখ, আনার প্রেম ও সংশয়, আনার পারিবারিক জীবন, বহির্বিশ্ব এবং আনার মানবিক চেতনা।১৯৪৫-৪৬ সালে জার্মানির নুরেমবার্গ শহরে ইন্টারন্যাশনাল মিলিটারি ট্রাইব্যুনাল নাৎসি বাহিনীর নেতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে তাদের বিচার করে।বলা হয়,বলা হয় আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি এই বিচার প্রক্রিয়ার সব সাক্ষ্য প্রমানের চেয়ে জোরালো প্রভাব রেখেছিল জনমানসে এবং সবকিছুর চেয়ে বেশি দক্ষতার সাথে ফ্যাসিবাদের নৃশংসতার কথা প্রকাশ করে।

মুলার লিখিত আনা ফ্রাঙ্কের জীবনীতে মিয়েপ গিয়েস বলেছেন ‘আনা ইহুদী নিধন বা হলোকাস্টের শিকার হলেও “আনার জীবন ও মৃত্যু ছিল আনার একান্ত ব্যক্তিগত নিয়তি, যে নিয়তি ৬০ লক্ষ বার ঘটেছে।আনা সেসমস্ত মানুষের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না-করা উচিতও নয়- যাদের জীবন নাজিরা কেড়ে নিয়েছিল। কিন্তু তার নিয়তি ইহুদী নিধনের ফলে পৃথিবীর যে প্রচন্ড ক্ষতি হয়েছে তা বুঝতে সহায়তা করে।”

অটো ফ্রাঙ্ক দীর্ঘদিন তার মেয়ের স্মৃতি বুকে নিয়ে বেঁচে ছিলেন। তিনি বলেছিলেন এই বইয়ের সমাদৃত হয়েছিল ‘কারণ এই ডায়েরি জীবনের এত বেশি দিককে ধারণ করেছে যে এটি একজন পাঠককে ব্যক্তিগতভাবে স্পর্শ করে‌।’ অটো ফ্রাঙ্ক মর্মস্পর্শীভাবে এই ডায়েরির উল্লেখ করেছেন। তাছাড়া একটারহুইসের বা গুপ্তকক্ষের জীবন পরিবারের জন্য তিনিই তো বেছে নিয়েছিলেন যে জীবন অসময়ে কেড়ে নিয়েছিল আনা সহ তাঁর স্ত্রী কন্যাদের জীবন। আনা ফ্রাঙ্ক নেই, শাশ্বত রয়ে গেছে আনা ফ্রাঙ্কের ডাযেরি।।

About Post Author