পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা :
“যে পিতা সন্তানের লাশ সনাক্ত করতে ভয় পায়
আমি তাকে ঘৃণা করি-
যে ভাই এখনও নির্লজ্জ স্বাভাবিক হয়ে আছে
আমি তাকে ঘৃণা করি-
যে শিক্ষক বুদ্ধিজীবী কবি ও কেরাণী
প্রকাশ্য পথে এই হত্যার প্রতিশোধ চায় না
আমি তাকে ঘৃণা করি-
আটজন মৃতদেহ
চেতনার পথ জুড়ে শুয়ে আছে
আমি অপ্রকৃতিস্থ হয়ে যাচ্ছি”
অনেকেই জানেন ওপরের কবিতাটির নির্মাণ করেছিলেন নবারুণ ভট্টাচার্য, যিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যে প্রথাভাঙার এক সফল কারিগর । ১৯৪৮ সালের ২৩ জুন তাঁর জন্ম। মহাশ্বেতা দেবী ও বিজন ভট্টাচার্যের পুত্র নবারুন লেখক হিসেবে তাঁর হারবার্ট, কাঙাল মালসাট, এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না, যুদ্ধ পরিস্থিতি সহ তাঁর সাহিত্যে স্বকীয়তার ছাপ রেখেছেন ।কবিতা, উপন্যাস বা গল্প সর্বত্র তিনি ছিলেন স্বতন্ত্র।তাঁর যৌবনে তিনি দেখেছেন অস্থির কলকাতাকে। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড দেখেছেন। তাঁর কলম এঁকেছে সময়ের ছবি। এমনই এক রক্তাক্ত ছবির বর্ণনা ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’ কবিতায়।
১৯৭০। অস্থির কলকাতা। রাজনৈতিক তাপমাত্রার পারদ বাড়ছে।, গুম, খুন ইত্যাদি চলতে থাকল। ১৯৭০ সালের আগস্ট মাসে তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী রাজ্যসভায় নকশালপন্থীদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত পথ নেওয়ার ঘোষণা করেন। এরকম যুগসন্ধি কালে পশ্চিমবঙ্গের সরকারি প্রধান উপদেষ্টা বি বি ঘোষ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র দপ্তরের কাছে নকশাল দমনের জন্যে প্রচলিত আইনের গৎ থেকে বেরিয়ে এসে অধিক ক্ষমতা প্রদানের আবেদন করলেন। ১৯৭০ এর ৯ ই অক্টোবর ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’ একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন জানায় ” কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বিভাগ, ‘র’ ও প্রাদেশিক পুলিস কর্তাদের পরামর্শ মত নকশালপন্থীদের হত্যার জন্যে কতকগুলি খুনি স্কোয়াড গড়া হয়েছে এবং তাদের কিছু সাংকেতিক নাম দেওয়া হয়েছে। যেমন, ‘টনটন ম্যাকাউটে ’, ‘পাপাডক ‘প্রভৃতি। পশ্চিমবঙ্গে তদানীন্তন পুলিসপ্রধান রঞ্জিত গুপ্ত, গোয়েন্দাপ্রধান দেবী রায়, অফিসার রুণু গুহনিয়োগী, তারাপদ বসু প্রমুখরনেতৃত্বে এই অভিযান চলতে থাকল। ১৯৭০ সালের ১৯ নভেম্বর সংঘটিত হয় বারাসাত গণহত্যা। হাত বাঁধা অবস্থায় বারাসাতের বড় রাস্তার ওপর পড়ে থাকতে দেখা যায় অত্যাচারে ক্ষতবিক্ষত আট যুবকের মৃতদেহ। এঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার আড়িয়াদহের বাসিন্দা। জানা যায়—কানাই ভট্টাচার্য, যতীন দাস, সমীর মিত্র, গণেশঘটক, শঙ্কর চট্টোপাধ্যায়, তরুণ দাস, সমরেন্দ্র দত্ত ও স্বপন পাল কে খুন করে বেলগাছিয়া দুগ্ধ প্রকল্প বা হরিণঘাটার ভ্যানে চাপিয়ে বারাসাতের রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয়েছিল। এসময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে ভারপ্রাপ্ত মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শংকর রায় জানান, ‘আগে দেখতে হবে যারা মারা গেছে, তারা শান্তিপ্রিয় ছিল কিনা?’ (তথ্যসূত্রঃ ‘যুগান্তর’ ১৫ আগস্ট ১৯৭১)।
বারাসাত গণহত্যা যা জড়িয়ে ছিল বরানগর হত্যাকান্ডের সঙ্গে তা প্রভাবিত করেছিল কবি লেখক দের। তরুণ নবারুণ এই প্রসঙ্গে নিজেই জানিয়েছিলেন যে ১৯৭২ সালের মে মাসে বিষ্ণুদের সাহিত্যপত্র পত্রিকায় কবিতাটি প্রকাশিত যা “আট শহীদ যুবকের হত্যার প্রতিবাদে লেখা। “তিনি জানাতে ভোলেন নি, “সেই আট জন শহিদ যুবকের প্রসঙ্গ ‘হারবার্ট’-এও আছে, ‘যুদ্ধ পরিস্থিতি’-তেও আছে। সেই সময়ের রেশ আমার মধ্যে রয়ে গিয়েছে, থাকবেও।”
২০১৪ সালে চলে গেছেন একাধিক সম্মানে ভুষিত নবারুণ। রেখে গেছেন তাঁর সাহিত্য যেখানে তিনি পরোয়া করেন নি তথাকথিত সাহিত্য সুষমার, মানেন নি কোনও বাঁধাধরা গৎ।তিনি জানতেন সবকিছুই ফুরোয়, সাহিত্যকর্ম ও সৃষ্টি হারিয়ে যায় না, হারায় না তার রেশ। তাই তিনি বলে ওঠেন:
“সব ভাগাভাগির শেষে আমাকে থাকতে হবে ফাঁকা ঘরে
আমাকে আঁকড়ে থাকবে অনাথ আশ্রমের শেষ প্রার্থনা
মৃত বলে কেউ আমাকে ঘোষণা করলেও
জেগে থাকবে আমার চোখের হীরা”


More Stories
বাংলা নববর্ষের ইতিহাস
আরেক অভিনেতা প্রণবের অকালপ্রয়াণ
বেজি কি সাপের বিষে কাবু হয় না?