পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা : একদা সাহিত্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্রের সৃষ্ট গোয়েন্দা চরিত্র পরাশরকে কেন্দ্রিক একগুচ্ছ রহস্য কাহিনী নিয়ে একটি সংকলন প্রকাশ করেছিল কলকাতার এক বিখ্যাত পুস্তক প্রকাশনা সংস্থা।বইটি আপনি এখন আপনি হাজার খুঁজলেও পাবেন না। কারণ প্রেমেন্দ্র মিত্রের পরাশরকে নিয়ে রচনা ঘিরে প্রথমোক্ত সংস্থার সঙ্গে আরেকটি সংস্থার আইনি লড়াই শুরু হয়ে যায়। আপনি তাহলে প্রেমেন্দ্র মিত্রের সব লেখা পাবেন কী করে?ভারতে আইন হ’ল যেকোনও লেখকের যেকোনও রচনাকর্ম যেকেউ প্রকাশ করতে পারে একটি শর্তসাপেক্ষে। আইনটি হল লেখকের মৃত্যুর ষাট বছর পরে যেকোনও প্রকাশনা লেখকের বইটি প্রকাশ করতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যাক প্রেমেন্দ্র মিত্রের কথাই। ১৯৮৮ সালে তিনি প্রয়াত হন। অর্থাৎ ২০৪৮ সালে তাঁর সব বই গ্রন্থস্বত্ব আইন বা কপিরাইটের আওতার বাইরে চলে আসবে।একইভাবে আমরা দেখেছি ১৯৪১ সালে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পরেও প্রায় একচেটিয়া তাঁর লেখা বই প্রকাশ করতে পারত বিশ্বভারতী। ২০০১ সালে তাদের মৌরসি পাট্টার দিন শেষ। বিগত একুশ বছর ধরে যে কোনও প্রকাশনী কবিগুরুর বই প্রকাশ করতে পারছে ।গ্রন্থস্বত্ব আইনের জোরে লেখক ও তাঁর স্বত্বের অধিকারীরা উপভোগ করে এসেছেন তাঁর সৃষ্টিকে।স্রষ্টার উত্তরাধিকারীদের আর্থিক লাভ বজায় থাকে স্রষ্টার মৃত্যু পরবর্তী ষাট বছর পর্যন্ত।

বই দিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে যখন, গ্রন্থস্বত্ব বিষয়টি তখন জেনে নেওয়া যাক। কোনও বিষয় সম্পর্কিত আক্ষরিক লিখিত রচনার মালিকানাকে বলে গ্রন্থস্বত্ব।যে স্বীকৃতি বা মালিকানা উক্ত গ্রন্থ প্রকাশের অধিকার প্রদান করে তাকেই বলে গ্রন্থস্বত্ব। সাধারণভাবে গ্রন্থস্বত্ব বলতে আমরা বুঝি কোন বই বা রচনাকর্ম প্রকাশ করার অধিকার। প্রচলিত ভাষায় একে কপিরাইট বলে, যদিও কপিরাইটের ব্যাপ্তি আরও বৃহত্তর।

ভারতে ১৯৫৭ সালে প্রয়োগ হওয়া কপিরাইট আইন অনুসারে, মূল সাহিত্য, নাটক ,সঙ্গীত এবং শৈল্পিক কাজ এবং সিনেমাটোগ্রাফ,ফিল্ম এবং শব্দ রেকর্ডিংকে অননুমোদিত ব্যবহারের হাত থেকে রক্ষা করে। তবে যে কোনও একটি ‘ধারণা’স্বাধীন, ‘ধারণা’ কপিরাইটের আইন থেকে মুক্ত। অর্থাৎ কপিরাইট অ্যাক্টের পরিসর অনেক বড়। এককথায় কপিরাইট ( সীমিত ক্ষেত্রে যা কিনা গ্রন্থস্বত্ব বা লেখকের অধিকার ) হ’ল একটি আইনি শব্দ যা নির্মাতা বা স্রষ্টাদের তাদের সাহিত্য এবং শৈল্পিক কাজের উপর যে অধিকার রয়েছে তাকে রক্ষা করতে ব্যবহৃত হয়। বই, সঙ্গীত, পেইন্টিং, ভাস্কর্য এবং চলচ্চিত্র থেকে কম্পিউটার প্রোগ্রাম, ডাটাবেস, বিজ্ঞাপন, মানচিত্র এবং প্রযুক্তিগত অঙ্কন পর্যন্ত কপিরাইটের পরিসর।
যেখান থেকে শুরু সেখানেই ফিরে আসা যাক।উল্লেখ্য, স্বাধীনতার বহু পূর্বে প্রচলিত হয় ১৮৪৭-এর ‘কপিরাইট’ সংক্রান্ত আইন যার জেরে বিদ্যাসাগরকে মদনমোহন তর্কালঙ্কারের জামাতা যোগেন্দ্রনাথ বিদ্যাভূষণ আইনি নোটিস পাঠান। আইনি ঝামেলা ছিল তর্কালঙ্কারের ‘শিশুসাথী’ পুস্তক ঘিরে। সে সময় আইন অনুসারে গ্রন্থস্বত্ব বলবৎ থাকত লেখকের মৃত্যু পরবর্তী সাত বছর। পরবর্তী সময়ে বঙ্কিমচন্দ্রের দুই মেয়ের উত্তরপুরুষরা গ্রন্থস্বত্ব নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন। ১৯৫৭ সালের কপিরাইট অ্যাক্ট (২০১২ সালে সংশোধিত) অনুযায়ী, উল্লিখিত সর্বক্ষেত্রে স্রষ্টা যতদিন বাঁচেন ততদিন এবং তাঁর মৃত্যু পরবর্তী ষাট বছর কপিরাইট বৈধ ও সক্রিয়।এই আইন ভঙ্গ করলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করার রাস্তা খোলা।তাই কপিরাইট অনুযায়ী স্রষ্টা যেমন তাঁর সৃষ্টির স্বাধীনতা, উদ্ভুত আর্থিক লাভ পেয়ে থাকেন অন্যদিকে সৃষ্টির অপব্যবহারের আশঙ্কা দূর করা যায়।পেটেন্টের থেকে কপিরাইট ভিন্ন, এখানে উদ্ভাবনকে নয়,বিষয়ের অভিব্যক্তি বা প্রকাশকে মর্যাদা ও সুরক্ষা দেওয়া হয়। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়,গবেষণা কার্যে কপিরাইট বলবৎ হয় না। স্রষ্টা সংস্থার অধীনে কাজ করলে চুক্তি ভিন্ন কপিরাইটের বা গ্রন্থকারের গ্রন্থস্বত্ব সংস্থার অধীনেই থাকে। এরকমই হাজার টুকরো টুকরো বিষয় নিয়ে ব্যাপ্তি কপিরাইট অ্যাক্টের।।


More Stories
আসন বাড়িয়ে সংবিধান সংশোধনী তথা মহিলা সংরক্ষণ বিল আনতে ব্যর্থ কেন্দ্র
বাংলা নববর্ষের ইতিহাস
গ্রেফতার অজি ক্রিকেট তারকা ওয়ার্ণার