সময় কলকাতা ডেস্ক:দুর্গা পুজোর আর মাত্র এক মাস বাকি। রাজ্যজুড়ে পুজোর আবহে সাজো সাজো রব। কোথাও মণ্ডপ সজ্জা শুরু হয়ে গিয়েছে আবার কোথাও চলছে মন্ডপের আধুনিক থিমের পরিকল্পনা। প্রতিমা পাড়ায় এখন চরম ব্যস্ততা। চড়া রোদ্দুরে শুকাচ্ছে প্রতিমার গায়ের মাটির প্রলেপ। কলকাতার দুর্গাপুজো অনন্য মাত্রা পেয়েছে বিশ্বময।
‘কলকাতার দুর্গাপুজো’কে ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটির তালিকায় যুক্ত করেছে ইউনেস্কো। এ নিঃসন্দেহে বাংলার কাছে এক বিরাট সম্মান। আর সেই সম্মানের সম্মাননা জ্ঞাপনের জন্য মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেছেন, দুর্গা পুজো শুরুর এক মাস আগে, কলকাতায় ১ লা সেপ্টেম্বর পালিত হবে হেরিটেজ স্বীকৃতির উদযাপন উৎসব।

শহরের রাজপথে বের হবে মহামিছিল। মুখ্যমন্ত্রীর বার্তা, রঙবেরঙের পোশাকে দলে দলে মিছিলে সামিল হোক তিলোত্তমার মানুষেরা।
ইউনেস্কোর স্বীকৃতি
বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসবকে আন্তর্জাতিক তকমা দেওয়ার নেপথ্যে কৃতিত্ব কার? প্রশ্ন কিন্তু এখনও রয়ে গিয়েছে। সালটা ২০০১ বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশের একাধিক রাজ্যের উৎসব এবং সংস্কৃতি নিয়ে সমীক্ষার কাজ শুরু করে ইউনেস্কো। সেই সমীক্ষার ভিত্তিতেই বিশ্বের ‘কালচার হেরিটেজ’ তালিকায় জায়গা করে নেয় বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গোপুজো। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে প্যারিসে আয়োজিত ইন্টার -গভর্নমেন্ট কমিটির ষষ্ঠদশ অধিবেশনেই ‘কলকাতার দুর্গাপুজো’-কে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কিন্তু এই স্বীকৃতির পিছনে রয়েছে এক গভীর গবেষণা।
কি গবেষণা?
অনেকেই জানেন না এই কৃতিত্ব অর্জন করার পিছনে প্রায় দুই দশকের গবেষণা রয়েছে। সেন্টার ফর স্টাডিস ইন সোশ্যাল সায়েন্সের কলকাতার প্রফেসর এবং ঐতিহাসিক তপতী গুহ ঠাকুরতার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা আর গবেষণা এই কৃতিত্ব অর্জন করতে অনেকটাই সাহায্য করেছে। যিনি প্রায় দুই দশক ধরে তার সহকর্মীদের নিয়ে বাঙালির এই শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজার নিখুঁত আবেগ এবং ভালোবাসার প্রতিটি তথ্য নিয়ে গবেষণা করেছিলেন আর যার ফলস্বরূপ এই কৃতিত্ব বলে মনে করেন অনেকে। তপতী গুহ ঠাকুরতার কথায়”দুর্গাপূজো নিয়ে আমার গবেষণা শুরু হয়েছিল আবেগ থেকে।
ইউনেস্কোর জন্য ডরিয়ারের কাজ ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে শুরু হয়েছিল, প্রয়াত সমাজবিজ্ঞানী অঞ্জন ঘোষ সহ আরো কয়েকজন সহকর্মীর সাথে ২০০২ সালে এই গবেষণার কাজ শুরু হয়। তথ্যগুলো মূলত নেওয়া হয়েছিল উৎসব উদযাপন কমিটির আয়োজক এবং শিল্পীদের কাছ থেকে। বছরের পর বছর বিভিন্ন প্যান্ডেলে গিয়ে তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি বিভিন্ন মন্ডপের সঙ্গে কত মানুষ জড়িয়ে রয়েছে ,তাদের কর্মের পদ্ধতি, তাদের রুজি, রোজগার সবই সংগ্রহ করতে হতো”
তপতী গুহুর ঠাকুরতা সনাতন দিন্দা এবং ভবতোষ সুতারের প্রশংসা করেছেন একাধিক জায়গায়। একজন ঐতিহাসিক হয়েও পুজোকে তার মূল গবেষণার বিষয় হিসেবে গ্রহণ করার জন্য মূলত আবেগ কাজ করেছিল বলেই মত তপতি দেবীর।
তপতী গুহ ঠাকুরতার শৈশব কেটেছে কলকাতারই বিভিন্ন বাড়িতে। পারিবারিক কারণে অনেক বাড়াতেই বসবাস করতে হয়েছিল তাকে। ৬০ এবং ৭০ এর দশকে সেই পাড়াগুলিতে খুব একটা পুজোর প্রচলন ছিল না। প্রেসিডেন্সিতে পড়াশুনো করার সময় বন্ধুদের সঙ্গে বিভিন্ন পূজা মন্ডপে ঘুরে বেড়াতে গিয়েই পুজো নিয়ে গবেষণার বিষয়টি মাথায় ঢোকে। নতুন শিল্প সংস্কৃতি, নতুন থিমের চিন্তাভাবনা , বিভিন্ন সম্প্রদায়ের এই উৎসবে অংশগ্রহণ, উৎসবকে একটা অনন্য মাত্রা দিয়েছে বলেই দুর্গাপূজাকে তার গবেষণার বিষয়বস্তু করে তুলেছিলেন তপতিদেবী।
ইউনেস্কোর স্বীকৃতি কি একক প্রচেষ্টা?
যদিও ইউনেস্কোর স্বীকৃতি নিয়ে তপতী গুহ ঠাকুরতার বক্তব্য তার একার উদ্যোগেই এই স্বীকৃতি নয়। এটি একটি সামগ্রিক প্রচেষ্টা। বহু মানুষের পরিশ্রম রয়েছে এই কৃতিত্বের পিছনে। তৎকালীন সময়ে রাজ্য সরকারও বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত ছিল।
তৎকালীন সময়ের একটি পত্রিকায় বলা হয়েছিল কলকাতার সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশাল সায়েন্সেসের অধিকর্তা জানিয়েছেন যে তিনি ফিল্ড এক্সপার্ট ছিলেন। যাতে দুর্গাপুজোকে হেরিটেজ তকমা দেওয়া হয়, সেজন্য কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রকের তরফে খসড়া ডসিয়ার তৈরি করেছিলেন। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে কাজ শুরু করেছিলেন। ২০১৯ সালের মার্চে সেই ডসিয়ার জমা দিয়েছিলেন। তাতে দুর্গাপুজোর সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন পক্ষের মন্তব্য তুলে ধরেছিলেন।
ইউনেস্কোর কাছে দুর্গাপূজো নিয়ে আবেদন জানানোর আগেই যদুনাথ ভবনে বৈঠক হয়েছিল এবং যে বৈঠকে রাজ্য সরকারের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। ফলে ইউনেস্কোই স্বীকৃতি একটি সামগ্রিক প্রয়াস।
দুর্গাপূজো নিয়ে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগও অনস্বীকার্য। বিভিন্ন পুজো কমিটির পাশে থাকা পাশাপাশি দুর্গাপূজা কার্নিভাল অনুষ্ঠিত করা সম্পূর্ণটাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মস্তিষ্কপ্রসূত। ফলে কলকাতার দুর্গাপূজোকে ইউনেস্কোর এই স্বীকৃতি প্রদান বলা যেতে পারে এক সামগ্রিক প্রয়াস যদিও তার পিছনে বড় অবদান রয়েছে ঐতিহাসিক তপতী গুহঠাকুরতা এবং তার দলের সদস্যদের।


More Stories
হর্ষ-বিষাদে পালিত ঈদ-উল-আযহা
বিশেষ চাহিদাসম্পন্নদের ভালোবাসায় মুগ্ধতার বিশেষ প্রয়াস
বাংলা নববর্ষের ইতিহাস