সময় কলকাতা ডেস্ক: বাংলায় একটা প্রবাদ বাক্য না বললেই নয়, রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলু খাগড়ার প্রাণ যায়। বাইশের সময়কালে বাংলার রাজনীতি এই প্রবাদ বাক্যকেই ঠিক যেন বয়ে নিয়ে গিয়েছে। শেষ হতে চলেছে আরও একটা বছর। এগিয়ে গিয়েছে দেশ, এগিয়েছে বাংলাও। তবে এগিয়ে চলার মাঝেই বছরভর বাংলার ক্যালেন্ডারে দাগ কেটেছে বহু ঘটনা। কেউ গর্জেছেন, কেউ বা বিনা মেঘেই বৃষ্টি ডেকে এনেছেন। রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে কেউ ছিনিয়ে নিয়েছেন রাজার কুর্সি, কেউ বা সব হারিয়ে হয়েছেন ফকির। কেউ সাম্রাজ্য হারিয়ে পড়েছেন জনরোষের মুখে, কেউ আবার ফুল ফুটিয়েছেন পাথরেও। রাজনীতির রঙ্গমঞ্চ বড়ই বিচিত্র, আর তার থেকেও বড় বিচিত্র এই রঙ্গমঞ্চের শিল্পীরা। বছর শেষে সময় কলকাতার পক্ষ থেকে এমনই কিছু ঘটনা তুলে ধরা হল। একনজরে দেখে নেওয়া যায় বাইশের কাহন।
১. তৃণতেই শক্ত হল ভিত: পুরনিগমেও সবুজ ঝড়

একুশে গেরুয়া শিবির ২০০ পার করার ঢোল পিটালেও তা গিয়ে থমকে গিয়েছিল ৭৭ -য়েই। বিভিন্ন জনমুখী প্রকল্পকে ঢাল করে ২০০ -র বেশি আসন নিয়ে বাংলার মনসদ দখল করে তৃণমূল। বিরোধীদের মুখের বুলি ছিল, সন্ত্রাসে জিতে আসা ভোট খোয়াবে পুরভোটে। কিন্তু, বাইশের শুরুতেই পুরনিগমে কার্যত সেই তত্ত্বই বিসর্জন দিয়েছে সবুজ শিবির। বছরের শুরুতেই ভোটগ্রহণ হয় বিধাননগর, চন্দননগর, আসানসোল ও শিলিগুড়ি পুরনিগমে। বিরোধীদের অভিযোগকে নস্যাত্ করে ৪টি পুরনিগমেই ওঠে সবুজ ঝড়। ৪ পুরনিগম দখল করে আধিপত্য ধরে রাখে জোড়াফুল।
২. পুরভোটে পড়ল শিলমোহর: ধারাবাহিক জয় তৃণমূলের
জয়ের ধারা অব্যাহত থাকে পুরভোটেও। রাজ্যের ১০৮টি পুরসভা ভোটে। তবে, সকলের চোখ যেন আটকে ছিল নদিয়ার তাহেরপুর পুরসভায়। সেই দুর্গ দখল করে বামেরা। দার্জিলিং পুরসভার দখল নেয় হামরো পার্টি। যদিও, নভেম্বরে সেই দলে নেমে আসে ভাঙন।
৩. ত্রিশঙ্কু ফলাফলে গেল প্রাণ: যতকাণ্ড ঝালদাতেই !
পুরভোটে সবুজ ঝড়ের খবর শিরোনামের তালিকায় পিছিয়ে গেলেও উঠলেও পুরভোটে ত্রিশঙ্কু ফলাফলের জেরে ঝালদা পুরসভা বছরভর শিরোনামে থেকে যায়। খুন হতে হয় ঝালদা পুরসভারই কংগ্রেস কাউন্সিলর তপন কান্দুকে। ম্যাজিক ফিগার লাভের আশায় খুন হওয়ার অভিযোগ ওঠে। ঘটনায় তদন্ত যায় সিবিআইয়ের হাতে। বোর্ড গঠন করে তৃণমূল। সেই বোর্ডের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অনাস্থা এনে সাজানো বোর্ড ভেঙে ঝালদা পুরসভা পুনর্দখল করে কংগ্রেস। তবে, তরজা এখনও অব্যাহত।
৪. ভাদু-হত্যা, নৃশংসতার আরেক নাম বগটুই !

বাংলার রাজনীতির ইতিহাসে মরিচঝাপি, নানুরের ছোট আঙাড়িয়া, নন্দীগ্রাম, নেতাই নিয়ে যদি আলোচনা হয়, তাহলেই তাতে সামিল হবে বগটুই, তা নিঃসন্দেহে বলা চলে। ২১ মার্চ বোমা মেরে ও গুলি করে হত্যা করা হয় বীরভূমের বড়শাল গ্রাম পঞ্চায়েতের তৃণমূল কংগ্রেসের উপপ্রধান ভাদু শেখকে। স্থানীয়দের দাবি, তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের জেরেই খুন হন ভাদু। কিন্তু, সেই হত্যাই আহ্বান করেছিল আরও এক নারকীয় গণহত্যালীলার। বগটুই গ্রামে অগ্নিসংযোগের মতো জঘন্য ঘটনায় প্রাণ গিয়েছিল প্রায় ১০ জনের। তারমধ্যে ছিল নারী এবং শিশুও। অভিযোগ, এটা ছিল খুনের বদলা খুন। সমালোচনার ঝড় রাজ্য পেরিয়ে উপচে পড়েছিল দেশেও। তদন্তে স্বচ্ছতা আনতে কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে তদন্তভার গ্রহণ করে সিবিআই। অন্যান্য অভিযুক্তের পাশাপাশি সিবিআই গ্রেফতার করে গণহত্যার অন্যতম অভিযুক্ত লালন শেখকেও। তবে, ঘটনার মোড় ঘুরল মাঝপথেই। সিবিআই হেফাজতে অস্বাভাবিক মৃত্যু হয় অভিযুক্ত লালন শেখের। এরপরেই কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন। অস্বস্তিতে পড়ে সিবিআই। হাইকোর্টের নির্দেশে মৃত্যুর তদন্তভার যায় রাজ্য তদন্তকারী সংস্থা সিআইডির হাতে। তদন্ত চলছে।
৫. হাঁসখালি ধর্ষণকাণ্ড: ‘ধর্ষণ নাকি প্রেগন্যান্ট?’ মুখ্যমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া ঘিরে তরজা

নদিয়ার হাঁসখালিতে এলাকার এক বন্ধুর জন্মদিনে গিয়েছিল এক কিশোরী। অভিযোগ, সেখানেই গণধর্ষণের শিকার হয় সেই কিশোরী। পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়, তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়। যদিও সেই রাতেই মারা যায় কিশোরী। রাতেই তার বাড়ির কাছে একটি শ্মশানে দাহ করা হয় মৃতদেহ। এরপরই একের পর এক বিস্ফোরক তথ্য উঠে আসতে শুরু করে। জানা যায়, মৃত্যুর শংসাপত্র ছাড়াই ওই নাবালিকার মৃতদেহ পোড়ানো হয়। প্রশ্ন ওঠে কেন এমন কাজ হল? সেই উত্তর খুঁজতে গিয়েই বোঝা যায়, এই শিঁকড় অনেক গভীরে। আদালতের নির্দেশে তদন্তভার গ্রহণ করে সিবিআই। এরমাঝেই বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিক্রিয়া ঘিরে শুরু হয় সমালোচনা। তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, ‘ধর্ষণ নাকি প্রেগন্যান্ট?’ তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, কেন ৫ দিন পর থানায় অভিযোগ? এই তরজার মাঝেই নদিয়ার হাঁসখালি ধর্ষণ ও খুনের মামলায় আগেই নিগৃহীতার পরিবারকে পাঁচ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি প্রকাশ শ্রীবাস্তব ও রাজর্ষি ভরদ্বাজের ডিভিশন বেঞ্চ। যদিও সেই নির্দেশের পর দীর্ঘ ৮ মাস ন্যূনতম ক্ষতিপূরণ মেলেনি। উল্টে মামলা পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন করে ‘লিগ্যাল এইড’। তাতেই রীতিমতো বিরক্তি প্রকাশ করেন কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি। তবে শেষমেশ লিগ্যাল সার্ভিস থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়, পাঁচ লক্ষ টাকার ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে।
৬. তৃণমূলের শহিদ দিবসের রাত কাটতেই মোড় ঘোরে বাংলার রাজনীতির: পার্থ চট্টোপাধ্যায় গ্রেফতার

গান্ধিমূর্তির পাদদেশে ধর্ণারত চোখ গুলি রাতের পর রাত নিদ্রাহীন থাকলেও শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ ঘুম কাড়েনি কারোরওই। তবে, এই দুর্নীতির অভিযোগেই এবছর ২৩ আগস্টে ইডির হাতে গ্রেফতার হন পার্থ চট্টোপাধ্যায়। সঙ্গে উদ্ধার হয় কোটি কোটি টাকা, যা এই রাজ্যের অন্যতম বড় খবর, যা চায়ে পে চর্চার ইস্যু হয়েছিল গোটা দেশের। তৃণমূলের জন্মলগ্ন থেকেই একনিষ্ঠ সৈনিক ছিলেন পার্থ চট্টোপাধ্যায়। তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভরসাস্থল ছিলেন ‘পার্থদা’। বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রীর পাশের চেয়ারটি বরাদ্দ ছিল সেই পার্থদার জন্য। দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেছেন তিনি। ছিলেন দলের মহাসচিব ও শৃঙ্খলারক্ষা কমিটির সদস্য। দায়িত্ব ছিল শিক্ষামন্ত্রিত্বের, পরে পান শিল্প দফতর। কিন্তু, তৃণমূলের সেই ভিতটিই কার্যত ভেঙে গিয়েছিল পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের গ্রেফতারিতে। বিপুল সম্পত্তি ও নগদের হদিশ মেলে পার্থ-ঘনিষ্ঠ অর্পিতা মুখোপাধ্যায়ের বাড়ি থেকেও। গ্রেফতার হন তিনিও। নষ্ট হয় দলের ভাবমূর্তি। ধাক্কা খান তৃণমূল সুপ্রিমোও। দলের সব পদ থেকে অপসারিত হন পার্থদাও। হারান দলের সমর্থন। হারান মন্ত্রিত্ব। ঠাই হয় শ্রীঘরে। যদিও, দলের প্রতিষ্ঠা দিবসের আগাম শুভেচ্ছা জানাতে ভোলেননি তৃণমূলের প্রবীণ এই সৈনিক।
৭. গ্রেফতার মানিক-সুবীরেশ-শান্তিপ্রসাদ সহ আরও অনেক আমলাই

শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের পাশাপাশি গ্রেফতার হন প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদের প্রাক্তন সভাপতি মানিক ভট্টাচার্য, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য সুবীরেশ ভট্টাচার্য, উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারম্যান সহ বেশ কয়েকজন আমলাও। প্রত্যেকেই এখন শ্রীঘরে।
৮. চাকরি গেল !
ওএমআর শিট কারচুপি, ঘুস দিয়ে চাকরি, শূণ্য বদলে হল ফুলমার্কস। প্রাথমিক থেকে নবম-দশম, বাদ যাননি গ্রুপ ডি কর্মীরাও। সব বিভাগেই গরমিলের অভিযোগ। ক্ষুব্ধ কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতিরা। চাকরি গেল বহু জনের। চাকরি যাবে যাবে করছে বহুজনের। লজ্জার খাতিরে কেউ মুখ লুকিয়েছেন, কেউ হয়েছেন ফেরার, কেউ আবার নিজেই দিয়েছেন চাকরি থেকে ইস্তফা।
৯. গরুতে জালে পড়ল বাঘ, গোমাতাকে পাচারের অভিযোগ: গ্রেফতার বীরভূমের বাঘ !
বীরভূমের বেতাজ বাদশা তিনি। তার কথায় বাঘে, গরুতে একঘাটে জল খায়! সেই অনুব্রত মণ্ডল চাইলেই বীরভূমে গাছের পাতা নড়ত। কিন্তু, ভাগ্যের কি পরিহাস, সেই বেতাজ বাদশাই গরু পাচার মামলায় যান শ্রীঘরে। প্রথমে সিবিআই গ্রেফতারি, পরে ইডির গ্রেফতারি। রেডারে অনুব্রত-তনয়া সুকন্যা, বেশ কয়েকজন আত্মীয়। তদন্তে হদিশ মিলেছে তাঁর একাধিক চালকল, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, জমি-জায়গা-সহ তার বিরাট সাম্রাজ্যের। কিন্তু, বছরের শেষেই শিবভক্ত কেষ্টর গল্পের মোড় ঘোরালেন খোদ শিবঠাকুরই। তদন্তের স্বার্থে কেষ্টকে নিয়ে ইডি দিল্লি পাড়ি দিতেই যাবে, ঠিক তখনই রাজ্য পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন অনুব্রত। অভিযোগ, তিনি নাকি কার্যালয়ে দলের এক কর্মী শিবঠাকুর মণ্ডলকে গলা টিপে মারার চেষ্টা করেছিলেন। ১২০ দিনের বেশি জেলার বাইরে থাকলেও বীরভূমের তৃণমূল জেলা সভাপতি এখনও তিনি। বীর আখ্যা দিয়ে খোদ দলের সুপ্রিমো তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন। দলের পুরনো দিনের সৈনিক ফিরহাদ হাকিমও তাঁকে ‘বীরভূমের বাঘ’ বলে উল্লেখ করেছেন। এখনও আদালত থেকে তৃণমূলকর্মীদের পঞ্চায়েত ভোটে জেতার টোটকা দেন অনুব্রত, এখনও সংগঠন মজবুত করার একাধিক বুলি আওরান কেষ্ট।
১০. কয়লা পাচারের তদন্তে জোর: তৃণমূলের যুবরাজকে জিজ্ঞাসাবাদ
কয়লা পাচারকাণ্ডে এবছর জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে। জিজ্ঞাসাবাদ করে এনফোর্সমেন্ট ডাইরেক্টরেট। জিজ্ঞাসাবাদের তালিকায় ছিলেন অভিষেক- জায়া রুজিরা, শ্যালিকা মেনকা গম্ভীরও। এই জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি চলে প্রমাণ-পাল্টা প্রমাণ পেশের হুঙ্কার। বিরোধীদের নিশানাতে রয়েছেন অভিষেক!
১১. অভিষেকের অভিষেক

তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিভিন্ন জনসভায় গিয়েই বিরোধীদের নিশানা করে বলে থাকেন, তিনি বিরোধী দলনেত্রী থাকাকালীন ছোট্ট অভিষেক হাতে পতাকা নিয়ে তাঁকে অনুকরণ করতেন। সেই সময় থেকেই অভিষেকের মধ্যে জননেতা হওয়ার ছবি দেখেছিলেন দলনেত্রী। সেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ই এখন তৃণমূল সুপ্রিমোর সেনাপতি বলা চলে। একাধিক অভিযোগে বিদ্ধ হলেও সেগুলি তার মনবল ভাঙতে পারেনি। বিরোধীদের আক্রমণের তির আজকাল দলীয় সুপ্রিমোর দিকের থেকে বেশি তাঁর দিকে যায়। তৃণমূল কর্মী-সমর্থকদের কাছে তিনি জনদরদী জননেতা, বাংলার ইউথ আইকন। তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের যোগ্য সেনাপতি। তবে শুধু বাংলাতেই নয়, গেরুয়া শিবিরের পোক্ত ঘাঁটি ত্রিপুরা-মেঘালয়-গোয়ার মতো রাজ্যগুলিতেও বিজেপি নেতাদের মনে ত্রাস এনেছেন অভিষেক। তিনি চোখে চোখ রেখে লড়াই করেন। দলের সংগঠন থেকে উইপোকা বের করার দায়িত্বও তাঁর কাঁধে।
১২. এবার বিদ্ধ বিজেপিও: এইমস দুর্নীতি
কয়লা-গরুপাচারের মাঝেই উঠে আসে এইমস দুর্নীতিও। নাম জড়ায় চাকদহের বিজেপি বিধায়ক বঙ্কিম ঘোষের পূত্রবধুর। নাম জড়ায় বাঁকুড়ার বিধায়ক নীলাদ্রিশেখর দানার কন্যারও। ঘটনার তদন্ত করছে সিআইডি।
১৩. কাঁথি থানায় সৌমেন্দুকে জিজ্ঞাসাবাদ
কাঁথি পুরসভার দু’বারের পুরপ্রধান ছিলেন সৌমেন্দু অধিকারী। পুরপ্রধান থাকাকালীন সেখানে একাধিক দুর্নীতিতে নাম জড়িয়েছে তাঁর নাম। কাঁথি পুরসভার শ্মশানে স্টল দুর্নীতি, সারদা কোম্পানি থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা নিয়ে দুর্নীতি, ত্রিপল চুরি মামলা, টেন্ডার দুর্নীতি, পথবাতি দুর্নীতি–সহ নানা মামলা দায়ের হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দায়ের করেছে কাঁথি থানার পুলিশ। একাধিকবার পুলিশি জেরার মুখোমুখি হন শুভেন্দু অধিকারীর ভাই সৌমেন্দু অধিকারী।
১৪. ডিএ মামলার প্যাঁচ
ডিএ নিয়ে রাজ্য-কেন্দ্র তরজা এবছর নতুন মাত্রা পায়। ২০১৬ সালে বকেয়া ডিএ-র দাবিতে স্টেট অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ট্রাইবুনালে মামলা হয়েছিল। যেখানে রাজ্য সরকারি কর্মচারিদের পক্ষে রায় দেয় ‘এসএটি’। যদিও এসএটি-র রায়ের বিরোধিতায় হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয় রাজ্য সরকার। যেখানে পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে উচ্চ হারে ডিএ দেওয়া যাচ্ছে না বলে যুক্তি দেয় রাজ্য। ২০১৮ সালের ৩১ অগাস্ট কলকাতা হাইকোর্ট রায় দেয়, DA সরকারি কর্মীদের অধিকার। ২০১৯’এর ২৬ জুলাই SAT নির্দেশ দেয়, ১ বছরের মধ্যে সরকারি কর্মীদের DA মেটাতে হবে। ২০১৯’এর ২৬ জুলাই SAT নির্দেশ দেয়, ১ বছরের মধ্যে সরকারি কর্মীদের DA মেটাতে হবে। রাজ্য সরকার রিভিউ পিটিশন দাখিল করলেও তা খারিজ করে SAT। তারপর রাজ্য সরকার হাইকোর্টে আবেদন জানায়। পঞ্চম বেতন কমিশন অনুযায়ী, কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের DA-র ফারাক ছিল ৩৪ শতাংশ। ষষ্ঠ বেতন কমিশন অনুযায়ী সেই ব্যবধান বেড়ে হয় ৩৫ শতাংশ। পঞ্চম বেতন কমিশন অনুযায়ী যে ৩৪ শতাংশ DA-র ফারাক ছিল, তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলায় গত ২০ মে হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ নির্দেশ দেয়, ৩ মাসের মধ্যে রাজ্য সরকারি কর্মীদের বকেয়া DA মেটাতে হবে। রাজ্য সরকার রায় পুনর্বিবেচনার আর্জি জানালেও ২২ সেপ্টেম্বর তা খারিজ করে দেয় আদালত। হাইকোর্টের সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়েই ৪ নভেম্বর, সুপ্রিম কোর্টে মামলা করে রাজ্য সরকার। অন্যদিকে, বকেয়া DA নিয়ে রাজ্য সরকার আদালতের নির্দেশ মানেনি, এই অভিযোগে রাজ্যের মুখ্যসচিবের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা দায়ের করা হয়। সুপ্রিম কোর্টে মামলায় চলছে।
১৫. কেন্দ্রীয় সংস্থার নজরে একাধিক ব্যবসায়ী, উদ্ধার টাকা
কোটি টাকা প্রতারণার দায়ে কলকাতার মোবাইল গেমিং ব্যবসায়ী আমির খানের বাড়িতে তল্লাশি চালায় ইডি। উদ্ধার হয় বিপুল পরিমাণ টাকা। অভিযুক্ত কলকাতার মোবাইল গেমিং ব্যবসায়ী আমির খানকে উত্তর প্রদেশের গাজিয়াবাদ থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। জারি তদন্ত। শুধু আমির খানই নয়, একের পর এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে হানা দিতে থাকেন তদন্তকারী আধিকারিকরা।
১৬. বছরভর গর্জেছেন শুভেন্দু অধিকারী, ডাহা ফেল ডিসেম্বর তত্ত্ব

বছরভর গর্জেই গিয়েছেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা। সেটা মুখ্যমন্ত্রীকে আক্রমণই হোক, কিংবা সাংবাদিক বৈঠক করে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তথ্যপ্রমাণ পেশ করাই হোক। কিন্তু বর্ষালেন কই? বছর শেষে শুভেন্দুর ‘ডিসেম্বর তত্ত্ব’ ডাহা ফেল। প্রশ্ন উঠছে তাঁর আত্মকেন্দ্রিক রাজনীতির ধরণ নিয়েও। দলবদল করে বিধানসভা ভোটে নন্দীগ্রাম থেকে জিতে আসলেও সম্প্রতি নন্দীগ্রামের এক সমবায় ভোটে পদ্মশিবিরে ঘাসফুল ফোটে। পুরভোটে ব্যর্থতার মুখ দেখেছে দল। দুর্বল দলের সংগঠন। দলের অন্দরে আদি-নব্য বিবাদ তো লেগেই রয়েছে। বছরভর চর্চায় থেকে পালাবদলের হুঁশিয়ারি দিলেও কাজে সেভাবে কিছুই করে দেখাতে পারেননি রাজ্যের বিরোধী দলনেতা। তার ‘ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ’ পলিসি সেভাবে হুল ফোঁটাতে পারেনি।
১৭. শুভেন্দুর বিরুদ্ধে এফআইআরে স্থগিতাদেশ: হাইকোর্টের নির্দেশে বল শুভেন্দুর কোর্টে
সম্প্রতি রাজ্যের বিরোধী দলনেতার বিরুদ্ধে যতগুলি এফআইআর হয়েছে, তার সবকটিতে স্থগিতাদেশ দেয় কলকাতা হাইকোর্ট। সেই সঙ্গে আদালতের নির্দেশে বলা হয়, শুভেন্দুর বিরুদ্ধে নতুন করে কোনও এফআইআর করা যাবে না। স্বাভাবিকভাবেই স্বস্তি পান শুভেন্দু অধিকারী। পাল্টা আদালতে যায় রাজ্যও।
১৮. মর্নিং ওয়াক দ্বন্দ্ব: শুভেন্দু-দিলীপ কথা !
বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি দিলীপ ঘোষ। দলের পুরনো কারিগর। ২০১৯-এর লোকসভা ভোটে বাংলায় দলকে জয়ের স্বাদ পাইয়ে দেওয়ার পিছনে প্রকৃত কারিগর ছিলেন এই দিলীপ ঘোষ। অথচ একুশের শেষের দিকেই বিজেপির রাজ্য সভাপতি পদ থেকে তাঁকে সরিয়ে দেয় কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। তার চাঁচাছোলা কথার ফলে দলের তরফে বিভিন্ন সময় ‘সেন্সর’ করা হয় দিলীপ ঘোষকে। দলের অবস্থা নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খোলায় কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের তরফে চিঠি দিয়ে চুপ করতে বলা হয়েছে তাঁকে। শুধু কি তাই ? বঙ্গ বিজেপি সূত্রে খবর, দলের অধিকাংশ কর্মসূচিতেই ডাকা পান না দিলীপ। বছরের শেষের দিকে অন্তর্দ্বন্দ্বের পর্দাফাস করে প্রকাশ্যে জনসভা থেকে বিজেপির প্রবীণ এই নেতাকে নিশানা করেছেন তৃণমূল থেকে বিজেপিতে আগত খোদ বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। শুভেন্দু অধিকারীর এই মর্নিং ওয়াক তত্ত্ব আরও একবার দলের অন্তর্কলহ নিয়ে চিন্তায় ফেলেছে দিল্লিকে।

১৯. আসানসোল কম্বলকাণ্ড: এবার আলোচনায় শুভেন্দুও !
১৪ ডিসেম্বর আসানসোলে শুভেন্দু অধিকারীর কম্বল বিতরণী অনুষ্ঠানে পদপিষ্ট হয়ে ৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ঘটনায় অনুষ্ঠানের আয়োজক জিতেন্দ্র জায়া চৈতালি তিওয়ারি সহ বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হয়। প্রথম দুবার জিজ্ঞাসাবাদ করতে গিয়ে ফিরে এলেও পরে হাইকোর্টের রক্ষাকবচ নিয়ে পরে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের সম্মুখীন হন চৈতালি তিওয়ারি। এফআইআর-এ নাম না থাকলেও শাসকদলের তীব্র আক্রমণের সম্মুখীন হন শুভেন্দু অধিকারী।
২০. কেন্দ্রীয় বঞ্চনা: রাজ্যের অভিযোগ
১০০ দিনের কাজের টাকা, বিভিন্ন জনমুখী প্রকল্পের টাকা দিচ্ছে না কেন্দ্র। এই অভিযোগ একদিনের না, বছরভর এই অভিযোগ শোনা গিয়েছে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, একাধিক মন্ত্রীর মুখে মুখে। টাকা আটকে রাখার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যর রয়েছে বলেও তোপ দেগেছে শাসকদল। যদিও, রাজ্য দুর্নীতির আখড়া, এই অভিযোগে কেন্দ্রকে বারবার রাজ্যের প্রাপ্য টাকা না দেওয়ার অনুরোধ করে গিয়েছেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী।
২১. জগদীপ ধনখড়ের গমন, বাংলায় নয়া রাজ্যপালের আগমন
বছরভর রাজ্যরাজনীতিতে রাজ্য-রাজ্যপাল সংঘাত শিরোনামে থেকেই গিয়েছে। তবে, শেষ পর্বে রাজ্য রাজনীতি থেকে সরাসরি সংসদীয় রাজনীতিতে ‘এন্ট্রি’ নিয়েছেন রাজ্যপাল জগদীপ ধনকড়। বাংলার রাজ্য়পাল থেকে দেশের উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। বাংলার নয়া রাজ্যপাল হিসেবে শপথ নেন সি ভি আনন্দ বোস। নিজেকে বাংলার দত্তকপুত্র হিসেবে দাবি করেছেন তিনি।
২২. যতকাণ্ড আবাসে !

পঞ্চায়েত ভোটের আগে আবাস যোজনায় ঘর পাইয়ের দেওয়ার বিষয়ে কোনও কারচুপির অভিযোগ মানতে নারাজ নবান্ন। স্বাভাবিকভাবেই ইন্সপেকশনেও ত্রিস্তরীয় বলয় সাজিয়েছে রাজ্য। তবুও, অভিযোগ যেন পিছুই ছাড়ছে না। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তেই আবাস যোজনায় ঘর থাকার সত্ত্বেও তালিকায় নাম থাকার অভিযোগে বিদ্ধ হচ্ছেন শাসকদলেরই নেতাকর্মীরা। জনরোষের ভয়ে কোনও পঞ্চায়েতে চলছে ইস্তফা, কোথাও নিজের নাম নিজেই কাটাচ্ছেন নেতারা।
নতুন বছর, নতুন উদ্যোগ। রাজ্যবাসীর জন্য একাধিক কল্যাণমুখী কাজের আশ্বাস। রাজনীতির রঙ্গমঞ্চেও নতুন নতুন উদ্যোগ। প্রাথমিক লক্ষ্য, পঞ্চায়েত ভোট। সবথেকে বড় লক্ষ্য, চব্বিশের লোকসভা নির্বাচন। কে হবেন চাণক্য, কে হারাবেন গদি, সেদিকে নজর থেকেই যাবে রাজ্যবাসীর।


More Stories
“মাথা উঁচু করে রাজনীতি “- মুখ্যমন্ত্রী সকাশে মমতাপন্থী বিধায়করা
হকার উচ্ছেদ, বুলডোজার রায়
সোনার ডিম পাড়ছেন সব্যসাচী!