Home » আদতে কে ছিলেন বীরবল? জেনে নিন বিস্তারিত তথ্য

আদতে কে ছিলেন বীরবল? জেনে নিন বিস্তারিত তথ্য

পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা,২৬ জানুয়ারি :

মৃত্যুই জীবনের অন্তিম এবং চূড়ান্ত পরিণতি। আর মৃত্যু অনেক ক্ষেত্রে মৃতের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য হয়ে ওঠে আলাদা ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে যে ইতিহাসখ্যাত এক ব্যক্তির আলোচনা আমরা করতে চলেছি তাঁর জীবনকাল এবং মৃত্যুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাস। ইতিহাসে এমন অনেক অধ্যায় রয়েছে যা মানুষের খুব বেশি জানা নেই।মহেশ দাসের মৃত্যুর অধ্যায়ও এরকমই এক অধ্যায়।অবশ্য মহেশ দাস বললে ইতিহাসেও যার খোঁজ মেলা ভার হয়ে ওঠে, সেই মানুষটিকে এককথায় খুঁজে পাওয়া যায় তাঁর উপাধি বীরবল নামে তাঁকে উল্লেখ করলেই। এই নামকরণ করেছিলেন স্বয়ং মোগল সম্রাট আকবর । বলা বাহুল্য, মহামতি আকবরের ইতিহাসের সঙ্গে জুড়ে আছে তাঁর সভাসদ বীরবলের ইতিহাস।

 

লোকগাঁথা মানলে আকবরের নামের অবিচ্ছেদ্যভাবে উঠে আসে কয়েকটি নাম। আর সভাসদ টোডরমল, সেনাপতি মানসিংহ প্রভৃতি নামের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বীরবলের মৃত্যুর ৪৩৭ বছর পরেও তাঁর নাম আজও লোকমুখে ফেরে । কত গল্পকথা তাঁর বুদ্ধিমত্তার! যদিও তাঁকে মানুষ সাধারণভাবে তাঁর হাস্যরসের জন্য জেনে এসেছে এবং একথা জানে যে,বীরবল ছিলেন আকবরের সভার একজন বুদ্ধিমান পরিহাসপ্ৰিয় সভাসদ মাত্র। যদিও একথাও কিছু ইতিহাসপ্রেমীর জানা যে, তিনি সাহিত্যজ্ঞান ও কাব্যগীতির জন্যই আকবরের সভাসদ হয়েছিলেন , দেদার রসবোধ থাকলেও তিনি কোনও অর্থেই চাটুকার বা ভাঁড় ছিলেন না। তথাপি তাঁর পরিচয় আরও বৃহৎ পরিসর জুড়ে। অগাধ প্রতিভার অধিকারী ছিলেন মহেশ দাস তথা বীরবল। আর বীরবলের মৃত্যুর ইতিহাস তুলে ধরলে প্রকাশ পাবে যে কাব্য,সঙ্গীত, হাস্যরসে দক্ষতা ছাড়াও যুদ্ধবিগ্রহের নীতি নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে ছিলেন তিনি অত্যন্ত পারদর্শী আর এই দক্ষতার জন্যই আকবর তাঁকে যুদ্ধে বিশেষ পরিচালনা ভার দিয়ে পাঠাতেন। যদিও সবিশেষ উল্লেখ্য,বীরবলের যুদ্ধসংক্রান্ত বিশেষ কোনও তালিম ছিল না। তথাপি তাঁর বুদ্ধিমত্তার কদর করতেন আকবর এবং ১৫৭২ সাল থেকে একাধিক সফল যুদ্ধে তাঁকে প্রেরণ করেছিলেন। ১৫৮৬ সালে বীরবলের জীবনপ্রদীপ নিভে যায় মোগল বাহিনীর আফগানিস্তান অভিযানে। বীরবল এই যুদ্ধে শুধু নিহত হন নি, তাঁর দেহ লোপাট হয়ে যায়।আকবরের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ আবুল ফজলের মতই আব্দুল কাদির বাদায়ুনি ছিলেন আকবরের সভার ইতিহাসবিদ।বাদায়ুনির সাথে বীরবলের বিশেষ সখ্যতা ছিল না। তবুও বাদায়ুনির বিবরণ থেকে জানা যায়,’ মহামতি আকবর সুহৃদ বীরবলের মৃত্যুর পর যে সম্মান দেখান আর কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির মৃত্যুর চেয়ে অনেক বেশি। তিনি বলেছিলেন,হায়! তারা ওর দেহটাও ফিরিয়ে আনতে পারল না তাহলে তা দাহ করা যেত। কিন্তু অবশেষে তিনি নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দেন যে বীরবল এখন সকল পার্থিব প্রতিবন্ধকতা হতে সম্পূর্ণ মুক্ত এবং স্বাধীন। এবং তার জন্য সূর্যরশ্মিই যথেষ্ট তাকে আগুনে পোড়াবার কোন প্রয়োজন নেই। ‘ বাদায়ুনির বিবরণী প্রমাণ করে আকবর কতটা তাঁর ঘনিষ্ঠ ছিলেন, কথিত আছে বীরবলের মৃত্যুতে আকবর দিনদুই আহারশয্যা ত্যাগ করেছিলেন। আকবরের সঙ্গে সম্পর্ক যে তাঁর ছিল ২৫ বছর বা তার বেশি সময় ধরে । রাজ্যভার গ্রহণের কিছুদিনের মধ্যেই তরুণ সম্রাট আকবর সাহচর্য পেয়েছিলেন বীরবলের- যে সম্পর্ক ১৫৮৬ সালে ইন্দু নদীর ধারে পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে যায়।ইউসুফজাই উপজাতিদের বিদ্রোহ দমনকরতে জইন খানকে পাঠানো হয়েছিল।তাঁকে সাহায্য করতে বিরাট মোগল বাহিনী সহ বীরবলকে প্রেরণ করা হয়। কিন্তু সোয়াত উপত্যকা সংলগ্ন স্থানে আফগান বিদ্রোহীদের হাতে মোগল সেনাবাহিনীর বিপর্যয়ের সময়ে ৮০০ সৈন্য ও বীরবল প্রাণ হারান।মৃত্যুর পরে খুঁজে পাওয়া যায় নি ৫৮ বছর বয়সী বীরবলের দেহ।

১৫২৮ সালে মহেশ দাসের জন্ম মধ্যপ্রদেশে।  জানা যায়, শিহাওয়ালের ঘোগরার ব্রাক্ষণ পরিবারের সন্তান ছিলেন মহেশ দাস। মোটেই অবস্থাপন্ন ছিলেন না তাঁর পিতামাতা। তবে পারিবারিকভাবে শিক্ষার রেওয়াজ তো ছিলই,তার সাথে নিজের প্রতিভার যোগে বিদ্বান ও শিক্ষিত হয়ে ওঠেন মহেশ ।তিনি হিন্দি,সংস্কৃত ও ফারসি ভাষায় ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। মথুরা অঞ্চলের ব্রজ ভাষায় তিনি কবিতা রচনা করতেন।তাঁর ছন্দজ্ঞান ছিল প্রবল। সংগীতেও প্রতিভা ছিল তাঁর।মহেশ প্রথমে রেওয়ার রাজপুত দরবারের সভাকবি ছিলেন।তাঁর বিবাহ হয় ধনী ও সম্ভ্রান্ত পরিবারে।অন্যদিকে,১৫৫৬ সালে হুমায়ুনের মৃত্যুর পরে ১৪ বছর বয়সী আকবর রাজ্যপাটের ভার নেন। আকবরের শাসনকালের প্রথম ছয় বছরের মধ্যেই মহেশ দাসের সাক্ষাৎ হয়। আকবর তাঁর সাহিত্য-সংস্কৃতি-বুদ্ধিমত্তায় মুগ্ধ হন। কথিত আছে উইট (wit)বা সুক্ষ রসবোধে মোহিত করেন সম্রাটকে। এরকমও গল্পকথা আছে যে,সম্রাটের সাথে দেখা করতে গিয়ে দ্বাররক্ষককে প্রাপ্যর অর্ধেক দিতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। আকবর তাঁকে ইনাম দিতে চাইলে একশো চাবুকের ঘা প্রার্থনা করেন তাঁর সভাসদ করেন ও এবং পঞ্চাশ টি চাবুকের ঘা প্রাপ্য হিসেবে দ্বার রক্ষককে দিতে অনুরোধ ও আবেদন করেন। সম্পূর্ণ কাহিনী শুনে তাজ্জব হয়ে দ্বাররক্ষকের ওপরে ক্রোধ জন্মায় আকবরের,প্রীতি মুগ্ধতা জন্মায় বীরবলের ওপরে। কালক্রমে সম্রাট তাঁকে বীরবল নাম দেন। তাঁর সভায় রত্ন হিসেবেই দেখা দেন বীরবল।তাঁর পান্ডিত্য ও রসবোধ আকবরের নিকটজন করে তোলে। আকবর প্রচলিত সর্বধর্মসমন্বয় সাধক ধর্মমত দীন-ই-ইলাহীতে দীক্ষিত হন বীরবল। প্রথাগত সামরিক শিক্ষা না থাকলেও ১৫৭২ সালে এক আফগান গৃহযুদ্ধ দমনে ও আকবরের নির্দেশে আফগান কোয়ালি খানের সহায়তা করতে যান বীরবল। সেক্ষেত্রে তাঁর সফল সামরিক অবদান আকবরের মাথায় ছিল। ১৫৮৬ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে সেকথা মাথায় রেখেই ইউসুফজাইদের দমনে তাঁকে পাঠানো হয়। প্রাণে ফেরেন নি বীরবল।কাবুলের কারাকার পাসের কাছে যা বর্তমান পাকিস্তান সীমান্তে খাইবার পাখতুনখাওয়ার কাছে চিরতরে হারিয়ে যান বীরবল। রয়ে গিয়েছে আকবর ও বীরবলকে অজস্র লোকগাঁথা। রয়ে গিয়েছে বীরবলের প্রখর বুদ্ধিমত্তার হাজার হাজার কাহিনী। রয়ে গিয়েছে হাস্যরসের গল্পমালা। কোথাও যেন হারিয়ে গিয়েছে আকবরের অন্যতম প্রধান পরামর্শদাতা হিসেবে বীরবলের অবদান। ইতিহাস স্বীকৃতি দিলেও তাঁর সামরিক অবদানের আলোচনা উহ্য থেকে গেছে, এই পরিচয় হারিয়ে গিয়েছে লোকগাঁথা থেকেও। বীরবল যেন বেঁচে রয়েছেন  -আকবরের সভার এক কৌতুকপ্ৰিয় সভাসদ হিসেবেই।।

About Post Author